হন্ত এবং দন্ত

আবদুল হাই শিকদার

পড়ে থাকা রক্তাক্ত তরবারিগুলোর মধ্যে

একটি ছিল আমার আঙুল,

পাতিলেবু কাটতে গিয়ে হারিয়েছিলাম ছুরি।

ঝোপের জোনাকির তত্ত্ব তালাসের ভূগোল,

তারপর জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদল,

বাহুল্যের অবকাঠামো ঘুরে বেড়ায় সন্ধ্যার লোকাল ট্রেনে।

পরিক্রমার ইঞ্চি ও ফুট ফিতা হাতে কোন দর্জী মেপে রেখেছে।

আমাকে বললো হারিয়ে যাওয়া কয়েকটি বাতাস,

কিছু একটা ওসিলা পেলেই ভজঘট,

শুকনো কাঠের উপর র‌্যাদা চালায় র‌্যাদাÑ

হাতি যে এতবড় একটা প্রাণী তারপরও তো

তাকে দাঁতে মাজন লাগাতে দেখেনি কেউ,

সেজন্য হন্ত দন্ত কথাটি এখানে খাটে না।

পাশের গ্রামের একরত্তি বিলের ঘুম পালালো রাতে,

নিরিবিলি কই, পুরো আকাশ সে ধরে রাখে বুকে।

হলফ করে বললো পানকৌড়ি,

এ রামগাধা জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটা পাতাও পড়েনি!

হন্ত দন্ত যেখানে সত্য নয়

সেইখানে বয়ে যায় দুধকুমার,

উত্তরের একলা নদী,

আমি তাকে তিনবার গালি দিয়ে

অবশেষে চুমু খেয়েছিলাম।

আমি বিজয় খুঁজি

নূরুন্নাহার নীরু

-অহঙ্কার কাকে বলে?

-কখনো ওকে আমি দেখিওনি।

যখন ভাবছিলাম দেখতে কেমন?

অহঙ্কার বের হয়ে বলল, “আল্লাহর চাদর নিয়ে যারা টানাটানি করে

দেখবে সেথায় আমার উপস্থিতি।

তাদের মাঝেই আমি আছি।”

আমি বললাম: তুমি তাহলে কার ভাই?

সে বলল: “কেন হিংসাকে দেখনি?

যে ইলুয়ার মত মধু খেয়ে ফেলে? সেই তো আমার ছোট ভাই।”

আমি দেখিনি। কখনো দেখিনি।

-হ্যাঁ তুমি দেখবে কি করে!

আমার যখন প্রচণ্ড রোষাবেগ কাজ করে

তখনই ও এসে আমার পাশে দাঁড়ায়।

-তাহলে ঘৃণা কে?

“ও আমার ছোট বোন- আমার সহোদরা।

আমরা তো একই আত্মজা! বিদ্বেষ ও আমাদেরই অনুজ।

ওদের রোষাণলে পুড়ে ছারখার হতে পারে যে কোন অট্রালিকা ॥

না, না, আমি তোমাদের কাউকে চাই না। দেখতে হবে না!

চিনতে হবে না আমার।

আমি চাই ভালোবাসা, সম্প্রীতি, স্নেহ -মমতা- বিজয়ের প্রান্তর।

-ও! ও! ওরা তো আমাদের বৈমাত্রীয় ভাই বোন!

ওদেরই যদি চাও তবে ছেড়ে যাও আমাদের আলয়।

ত্রি-সীমানায় এসো না কিন্তু!

আমি বেরিয়ে পড়তে লাগলাম অন্ধকার কুঠুরী থেকে।

নিষিদ্ধ আলয় থেকে- ক্রমশ বের হতে থাকলাম- শুধুই থাকলাম৷

সামনে এগিয়ে আসতে থাকলো বিজয়ের অবস্যম্ভাবী প্রান্তর।

অহঙ্কার, হিংসা, ঘৃণা, বিদ্বেষ মাড়িয়ে আমি বিজয় খুঁজি।

আমি বিজয় খুঁজি!

বিপ্লবীরা ঘুমায় না কখনো

মোশাররফ হোসেন খান

আমাদের দামাল ছেলেরা

রক্ত, ঘাম, জীবনের বিনিময়ে ভোর আনে।

উসুম কুসুম প্রশান্ত ভোর,

হিম, শীতল, আদি খান্দানি ভোর।

চতুর জুয়াড়িরা সেই ভোরগুলো শেষ করে জুয়ার আসরে।

কপট রাজনীতিবিদরা সেগুলো বিক্রি করে

ডলার রিয়াল দিনার বা সামান্য কিছুর বিনিময়ে।

ভোরগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে নর্দমায় ফেলে দেয় চাঁদাবাজ মাস্তান।

অজস্র তমসিত রাতে পাহাড় কেটে কেটে

যখন ভোর আনে আমাদের ছেলেরা,

তখন খলবল করে ওঠে কুয়ার গভীরে ঘুমিয়ে থাকা বুদ্ধিজীবীরা।

কে কিভাবে ভোরগুলো বিক্রি করবে---

তারই মজমা বসে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে।

ভোর আনতে আনতে

আমাদের ছেলেদের অনেকেই ফিরতে পারে না ঘরে।

যারা ফিরে আসে, তাদের অনেকেরই

হাত নেই, পা নেই, চোখ নেই।

পঙ্গুত্বকে বরণ করে তারা ভোর আনে আমাদের জন্য।

তারা ক্লান্ত, শ্রান্ত।

আহ্! কতদিন ঘুম হয় না।

অবসাদ শরীর নিয়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে চোখ বন্ধ করে।

কিছুক্ষণ।

কী এক শঙ্কায় ধড়ফড় করে ওঠে তাদের বুক।

চোখ খুলে তাকাতেই দেখেÑ

রক্ত, ঘাম, জীবনের বিনিময়ে আনা ভোরগুলো

ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে!

রুদ্ধশ্বাসে কাঁদতে থাকে

বাংলাদেশের নদীগুলো।

স্বার্থান্বেষীদের কেউ বুঝলোই নাÑ

অভাগা এই দেশের জন্য

আমাদের ছেলেদের আনা ভোরগুলো

কত দরকার ছিল।

সহসা হুঙ্কার দিয়ে ওঠে লাল চব্বিশের যোদ্ধারা,

না!

ছিনতাই হতে দেব না ছত্রিশে জুলাই।

আমরা ঘুমাইনি। জেগে আছি।

জেগে আছি ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলব্যাপী।

বিপ্লবীরা ঘুমায় না কখনো।

স্যালুট হে বীর সেনানী

সৌরভ দুর্জয়

রাতের নিকষ প্রহর ছেঁকে

উঠেছিল যেই স্বাধীন সূর্য,

ভাইয়ের রক্ত মেখে

বোনের সম্ভ্রমের তরবারি হাতে।

তাকে কলুষিত করেছে বারে বারে

কিছু দাঁতাল শুয়োরের দল।

বুড়িগঙ্গা ধলেশ্বরীর বুকে বয়েছে রুধির স্রোত,

শব্দ করে কলকল, চক্ষু করে ছলছল।

মায়ের চোখে নেমেছে শোকের বৃষ্টি

ঘটাতে বীরত্বের পরাগায়ন।

ফুটেছে রাউফুন বসুনিয়া, জিহাদ, সেলিম,

দেলোয়ার, হাফিজার মোল্যা, নূর হোসেন, ডা. মিলন,

আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধদের মতো নীল অপরাজিতা ফুল।

যাঁদের ঘ্রাণের বিদ্রোহে, প্রাণের ত্যাগে

পুড়েছে স্বৈরাচারের সিংহাসন।

স্যালুট! হে বীর সেনানী

বাংলা মায়ের দামাল সন্তান,

তোমরা রক্ষা করেছ আমাদের স্বাধীনতা

আমাদের পতাকার মান।

দেশমাতৃকার প্রয়োজনে বহমান থাকুক

তোমাদের ত্যাগের স্রোত।

আমাদের অহঙ্কারের সূর্য থাকুক অম্লান।

বিজয়ের গ্রাফিতি

হাসান আলীম

৭১ এর অরক্ষিত বিজয়ের গ্রাফিতি নতুন চেহারায়

ঝলসে উঠেছে রাজধানী ঢাকা এবং

সমগ্র বাংলাদেশের অদম্য দেয়ালে, কার্নিশে,

ফুটওভার ব্রিজের বুকে পিঠে -

‘বল বীর! চির উন্নত মম শির’ ‘গাহি সাম্যের গান’

শ্লোগান বজ্র নির্ঘোষে চমকে উঠেছে,

বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে রক্তলেখা অক্ষরে

বারুদমাখা গণঅভ্যুত্থানে চব্বিশের বিজয় ছিনিয়ে

এনেছে প্রকৃত বিজয়, আমাদের মাতৃভূমি স্বাধীনতা।

গণতন্ত্র, সাম্য, ইনসাফ, শান্তি,

আমাদের নতুন সংবিধান, আমাদের যূথবদ্ধ অঙ্গীকার।

পঞ্চাশ বছর পর আমাদের সোনার ছেলেরা,

আমাদের অগ্নিকন্যারা, দীপ্ত জনতা রাজনৈতিক নেতারা

রাক্ষসী স্বৈরশাসকের ছোবল থেকে ছিনিয়ে এনেছে

সোনার স্বদেশ, বিজয়ের লাল সবুজের প্রদীপ্ত পতাকা।

বিজয়ের গ্রাফিতি অঙ্কিত হয়ে গেছে অবিনাশী দেয়ালের বুকে

পিঠে, অন্তরের অন্তস্থলে বিশ্বমঞ্চে।

যে দেশ আমার ভেতরে থাকে

কামাল হোসাইন

আমার দেশের একটা অংশ থাকে বইয়ের পাতায়Ñ

উনিশ শ বায়ান্ন, উনিশ শ একাত্তর, দু হাজার চব্বিশ

যেখানে যেখানে তারিখের খাতায় রক্ত দিয়ে চিহ্ন আঁকা।

কিন্তু আমার দেশের আরেকটা অংশ থাকে রিকশাওয়ালার চোখেÑ

যে রোজ গাইতে গাইতে ফেরেÑ

‘দেশটা তোমার বাপের নাকি...’

আমার দেশের ভাষা কেবল বাংলা নয়Ñ

এ ভাষা গ্রাম্য বউয়ের লাজরাঙা ঠোঁটে হেসে ফেলা,

বৃদ্ধ বাবার অপার দীর্ঘশ্বাস,

কিশোরের রাতজেগে লেখা কবিতাÑ

সেসবও তো এই দেশেরই ভাষা।

শহরে যখন লোডশেডিং হয়,

তখন আমি আকাশের তারা দেখি

আর ভাবিÑ

এই তারাগুলোর নিচে কবে কাঁদতে কাঁদতে

একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন জুলাইযোদ্ধা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন?

আমার দেশে আছে

একদিকে রাজপথে হাঁটতে থাকা প্রতিবাদ,

অন্যদিকে ছেঁড়া জুতো পায়ে হেঁটে যাওয়া

একজন অসহায় মাÑ

তারপরও তিনি গর্ব নিয়ে বলেন,

এই দেশ আমার, কারো দয়াদাক্ষিণ্যে পাওয়া হয়নি।

আমার দেশ শুধুই একটা মানচিত্র নয়,

আমার দেশ আমার ভেতর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকেÑ

আমার ঘামে, আমার প্রেমে, আমার কবিতায়,

আর আমার প্রতিদিনের জেগে ওঠায়।

প্রিয় স্বাধীনতা

মুহাম্মদ রফিক ইসলাম

পৃথিবী হেলে পড়লে রাত্রির গহীন

শুকতারা নেমে যায় প্যাচার চোখে

ঘুম ঘুম দৃষ্টি এসে পড়ে নিঝুম নিঃশ্বাসে

জানালার কার্নিশে ঝুলে থাকা নিঃশ্বাসে

লুটিয়ে পড়ে ডাহুকের নিঃসঙ্গ বিচরণ

জোনাকির চোখে শব্দহীন দৃষ্টির জ্যোতিতে

টের পাই তোমার নৈঃশব্দ্য আগমন অশরীরী ঘ্রাণ

শুকনো পাতার ঠোঁটে ভাঙে বিরহের শীতঘুম

তীর্থযাপনে ক্ষান্ত বৈরাগী ঝিঁঝি

তৃষ্ণার রং মুছে ফেলে যে চাতক

জলের নৈসর্গিক মৌনতায় গড়িয়ে যায়

তোমার মৌন সে সম্মতি উষ্ণ চুমু

অস্তিত্বের গাঢ় গহীন নিবিড়তম গভীরে

তোমার কাব্যিক উপস্থিতি ছান্দসিক মনন

পূর্ণতার শহর যেন নাগরিক সংবর্ধনার প্লেকার্ড

প্রিয় থেকে প্রিয়তম তুমি প্রিয় স্বাধীনতা।

এ বিষণ্ন মৃত্তিকায়

সায়ীদ আবুবকর

দাঁড়াও, বৎস, শোনো! মাতাল অশ্বের মতো বলো

চলেছো কোথায় ছুটে? যত দূর যাও, এখানেই

আসতে হবে ফিরে, এই মৃত্তিকায়। অশ্রু ছলো ছলো

চোখে দেখবে সবাই তোমার দুর্গতি। কেউ নেই

পৃথিবীতে, করতে পারে অতিক্রম মৃত্যুকে; মৃত্যুর

নিষ্ঠুর নিগড়ে জানি বাঁধা পড়বে খেল-তামাশায়

মত্ত সব ব্রাত্যজন। থেমে যাবে মত্ত করা সুর

জীবনের; থাকতে হবে পড়ে এ বিষণ্ন মৃত্তিকায়।

এ মৃত্তিকা থেকে ফের জেগে উঠবে উদ্ভিদের মতো;

দাঁড়াবে আসামী হয়ে হাশরের মহাআদালতে;

সেদিন সমস্ত মাথা ভয়ে-ত্রাসে হয়ে যাবে নত;

সুন্দর আমল যার, বেঁচে যাবে জাহান্নাম হতে।

অমূল্য জীবন যেন হেসে-খেলে যায় না বৃথায়;

কাটাও জিকিরে, বাছা, পর-হিতে আর সিজদায়।

ঘাটশালা ১৭ নম্বর বর্ডারলাইনে

রেশম লতা

ঘাটশালা ১৭ নম্বর বর্ডারলাইনে

আইজ কুয়াশা ভিজা শিকারির দল ঘুইরা বেড়ায়,

তহন ভোরের লাল ফালি-

ধানক্ষেতে লতাপাতার গায়ে সেঁটে থাকা গুলির গন্ধ।

দৌলতপুর, কালীগঞ্জ, শালন্দা, বুড়িরচর

আরেক মাথায় কৈলাশপুর ক্যাম্পে

জ্যোৎস্না মন্ডল-

নজরবন্দি সিভিল-নার্স,

ওর হাতের কাঁচির ডগায় শুকায় দুই দিনের না খাওয়া রক্ত--

চৌকি নম্বর চৌত্রিশে

গোলন্দাজ বুট জোড়া ঘষে উঠে দাঁড়ায়,

একটুকু ফিসফাসেই

ডিপো-পারের বন্দুকের গ্রিল খুলে যায়;

পাঁচ মিনিটে বদলি হয় অভিযানের মানচিত্র।

মুজিবনগরের গলি, কালিবাড়ির বাঁক—

সবখানে টের পাই,

মাটির নিচে থরথর করছে সাবান-গন্ধে মোড়ানো দুঃস্বপ্ন।

ঝপাং ঝাং ৯০ক্ক শকওয়েভ,

য্যান কুছুমদ্দির আহত রাইতের নিঃশ্বাস।

গামছা, ডেগচি, বালতি, টিনের ঝাঁপি-

সব দুমড়ে চিনচিনে রোদ্দুরে কেঁদে ওঠে।

বর্ডারগার্ডদের সাকরেদরা---

পূর্বের নিরিবিলি মাঠটা মাপজোখ কইরা দেখে,

মিনিটে মিনিটে তোলে নতুন খসড়া লিস্ট-

কার ঘর পুইড়া গেছে, কার আত্মা বেচারা

পথিমধ্যে ফসকাইছে।

খোঁজ লয়, গোঁজা অইয়া। ত্রাণের বারোটা বাজার আগেই কাইট্টা পড়ে।

বিজয়ের গল্প শোনাতে

পঞ্চানন মল্লিক

ঘাসফড়িং-এর মতো স্বপ্নরা বাতাসে লাফাচ্ছে আমার

পুরো-ডিসেম্বরে বন্ধু কবির হাতে উড়ছে ম্যাগাজিন;

উপুড় হয়ে শব্দ খুঁজি-আমার নির্মিত কবিতায়।

দিনজুড়ে প্রেস, রাত জেগে পত্রিকা অফিসে;

কখনো এটা, কখনো ওটায় অথবা একসাথে অনেকগুলোতে।

আমি যাই- আমি চলে যাই। কখনো-একাকি ভ্রমণে।

পশ্চিমে যাই- উত্তরে যাই-যাই শীতগন্ধ কুয়াশার ঘোরে,

বিলের ঘাসমঞ্চে শিশিরের নূপুর শুনতে।

আজ নীল বিরহের দিন ভুলে-বিজয়ের ক্ষণে

চাঁদ আসলে কুয়াশার চাদর পরাবো গায়,

আর চুপিচুপি যাব-হীমনিশিতে বিজয়ের গল্প শোনাতে।