ড. বি এম শহীদুল ইসলাম
বিজয় মানে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ঘটনায় দুর্দান্তভাবে সফলতার একটি বিশেষ মুহূর্ত। তখন আনন্দের শিহরণে উচ্ছ্বসিত হয় মানুষের অন্তর্দেশ। এ বিজয় কখনো হতে পারে ব্যক্তিগত, সামষ্টিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে সফলতার বিজয়। হতে পারে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিজয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতির ইতিহাসে এমনই একটি গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ের অবিস্মরণীয় দিন। দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ চলার পর বাঙালির বিজয় অর্জিত হয় ১৬ ডিসেম্বর। বিজয় দিবস আমাদের নিকট অত্যন্ত গৌরব ও মর্যাদার।
আমাদের সব কর্ম ও উন্নয়ন চেতনার মূলে রয়েছে শহীদদের আত্মত্যাগ। তারাই আমাদের অহংকার, আমাদের গৌরব। ১৯৭১ সালের এ দিনটিতে বাংলার আকাশে উদিত হয়েছিল মুক্তির রক্তিম সূর্য। স্বজন হারানোর বেদনা ভুলে মানুষ সেদিন মুক্তির আনন্দে রাজপথে নেমেছিল আমাদের বিজয়কে আলিঙ্গন করতে। মুক্তির উল্লাসে মুখরিত ছিল বাংলার আকাশ-বাতাস, পশুপাখি ও প্রকৃতি। বিজয়ের এ দিনটি ছিল বাঙালির মহা উৎসবের দিন। এর চেয়ে আনন্দে উদ্বেলিত দিন বাঙালির জীবনে আর আসেনি। তবে যে উদ্দেশ্যে জাতি দেশ স্বাধীন করেছিল, সে উদ্দেশ্য দীর্ঘ ৫৪ বছরে জাতীয় জীবনে প্রতিফলিত হয়নি। তাছাড়া দীর্ঘ ষোল বছর একটি ফ্যাসিবাদী শাসকের অত্যাচার, জুলুম ও নির্যাতনের বিভৎস রূপ দেশবাসী সহ্য করতে না পেরে তারুণ্য দীপ্ত ছাত্র সমাজের নেতৃত্বে সর্বস্তরের জনগণ জাতির মুক্তির নেশায় কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুনরায় আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ে। সে আন্দোলন রূপ নেয় ফ্যাসিবাদ পতনের আন্দোলনে। অবশেষে সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়ে যায় এবং জাতি অত্যাচারী শাসকের হাত থেকে দ্বিতীয়বার মুক্তি লাভ করে। তাই চব্বিশের ৫ আগস্ট জাতীয় জীবনে অর্জিত হয় আর একটি নতুন বিজয়।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সূচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি আজও অর্জিত হয়নি। স্বাধীনতার পরে যেসব শাসক ক্ষমতার মসনদে বসে দেশকে শাসন করেছে, মূলত তারা কেউ সোনার বাংলা, কেউ নতুন বাংলা, কেউ সবুজ বাংলা গড়ার অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু বাঙালি জাতি স্বৈরাচারী, দুর্নীতিবাজ, ফ্যাসিবাদ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায়নি। ৭১-এর পর যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারা জনগণের ওপর শোষণ, অত্যাচার, জুলুম, নিপীড়ন, গণহত্যা আর দুর্নীতির মাধ্যমে দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তারা দেশে একদলীয় শাসন কায়েম করেছিল। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করে খাচ্ছেন, তাদের মনে রাখা উচিত যে, কোনো বিশেষ দল, গোষ্ঠী ও পরিবার এদেশকে স্বাধীন করেনি। এদেশ স্বাধীন করেছে সর্বস্তরের জনগণ। তাই বিজয় দিবস আমাদের সবার জীবনের সাথে ওতোপ্রোতো জড়িত। যারা চেতনার নামে জাতিকে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়, তারা দেশের সত্যিকার বন্ধু হতে পারে না। দেশের জনগণকে শোষণ করা এবং বিদেশে টাকা পাচার করে নিজেরা লাভবান হওয়ায় তাদের মূল উদ্দেশ্য। সুতরাং চেতনা বিক্রির দালালদেরকে প্রতিহত করে এদেশকে একটি সুন্দর ও শান্তিময় দুর্নীতিমুক্ত কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে-এটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
বিজয় দিবস একটি অমূল্য ঐতিহাসিক দিন, যা আমাদের মনে জাগ্রত করে স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব, সাহস এবং জনগণের ঐক্যবদ্ধ করার চেতনা। এ মহান দিনটিকে আমরা গর্বের সাথে স্মরণ করি কিভাবে আমাদের পূর্বপুরুষরা বিপ্লব, সংগ্রাম এবং বিজয়ের জন্য অসংখ্য জীবন বিপন্ন করেছিলেন। বিজয় দিবসের চেতনা আমাদের মনে জাগ্রত করে অত্যাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সাহসী মনোভাব। আমাদেরকে শিক্ষা দেয়, মানবিকতা ও অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রামে উজ্জীবিত করা। একইভাবে বিজয় দিবসের চেতনা ও অনুপ্রেরণা চব্বিশের জুলাই-আগস্ট জাতির জন্য নিয়ে আসে আরও একটি বিজয়ের চেতনা। দীর্ঘ ১৬ বছর স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা দেশের জনগণের বিরুদ্ধে অত্যাচার, নিপিড়ন, জুলুম, গুম, খুন, রাহাজানি, আয়নাঘরের আবিষ্কার ও দুর্নীতির মাধ্যমে দেশকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করে। অবশেষে ছাত্রদের কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন শুরু হয়, তা পরবর্তীতে জনগণের আন্দোলনে রূপ নেয় এবং ছাত্রসমাজ ও সাধারণ জনগণের যৌথ সংগ্রামের মাধ্যমে চার বছরের শিশু থেকে শুরু করে ছাত্র-ছাত্রীসহ সাধারণ মানুষের তাজা রক্তের বিনিময়ে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা চব্বিশের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। বিজয় অর্জিত হয় নতুনভাবে। দেশের সর্বত্র রক্ত দিয়ে লেখা হয় একটি নাম- “নতুন বাংলাদেশ”।
পরিশেষে বলতে চাই, জাতির এ বিজয়কে টেকসই করতে হলে, বিজয় দিবসের চেতনায় চব্বিশকে ধারণ করতে হলে জনগণকে নতুন করে শপথ নিতে হবে আগামী দিনের জন্য একটি দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত ও ফ্যাসিবাদমুক্ত সুশৃঙ্খল সৎ এবং যোগ্য রাজনৈতিক দলকে শাসন ক্ষমতায় পাঠানো। যারা সততা ও নিষ্ঠাবান তরুণদেরকে সাথে নিয়ে, ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিা করবে এবং জনগণের কল্যাণে কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক একটি আদর্শ কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে-এটিই হোক এবারের বিজয় দিবসের সত্যিকার বিপ্লবী চেতনা।
লেখক :
শিক্ষাবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট