ড. এম এ সবুর

আধুনিক বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ। আর বিশ্বসংস্কৃতিতে ‘বাঙালি জাতি ও সংস্কৃতি’ স্বতন্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠিত জাতিসত্তা। অথচ প্রাক-মুসলিম যুগে তথা খ্র্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতকের আগে বাংলাদেশ নামে বিশেষ অঞ্চলের বা বাঙালি জাতির কোন অস্তিত্ব ছিল না। তখন ছিল খন্ড খন্ড কতগুলো জনপদ। এ সব খন্ডিত জনপদগুলোর নাম ছিল বঙ্গ, রাঢ়, গৌড়, বরেন্দ্র, সমতট ও হরিকেল। আর এসব জনপদে বসবাস করতো বহু কৌম বা নরগোষ্ঠীর লোকজন। তারা নিজ নিজ জনপদের নামেই পরিচিত হত। তাদের মধ্যে কোন আঞ্চলিক সংহতি ছিল না। তারা অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, তিব্বতি, চীনা ভাষাভাষী বহু কৌম বা নরগোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। এসব নরগোষ্ঠীর সাথে এবং তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে সংঘাত-সংমিশ্রণ ঘটেছিল ইন্দো-আর্যভাষী জনগোষ্ঠীর। বাংলা বা বঙালি জনগোষ্ঠী নামে তখনও কোন অঞ্চল অভিহিত ছিল না। তৎকালে ‘বঙ্গ’ অভিহিত হতো ঢাকা-ফরিদপুর অঞ্চল এবং সম্ভবত খুলনা-বরিশাল অঞ্চলসহ। অন্যদিকে ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীর মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, বীরভূম, বাকুড়া, হুগলি, হাওড়া ও মেদনিপুরের কিছু অংশসহ দক্ষিণে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ভূ-ভাগ তথা বর্তমানের পশ্চিম বঙ্গ ছিল বৃহৎ ‘রাঢ়’ দেশ। প্রাচীন যুগের বিশেষ উল্লেখযোগ্য জনপদ ছিল ‘বরেন্দ্র বা পুন্ড্র’। এর ব্যপ্তি ছিল পশ্চিমে কুশী গঙ্গা বা কৌশিক নদী দক্ষিণে গঙ্গা নদী এবং পূর্বে করতোয়া নদীর মধ্যবর্তী ভূ-ভাগ। এ জনপদ পুন্ড-বরেন্দ্র উভয় নামে পরিচিত। গৌড় জনপদ বলতে বর্তমানের মালদহ, মেদেনিপুর, মুর্শিদাবাদ ও বীরভূম অঞ্চলকেই বুঝাত। সমতট নামে অভিহিত অঞ্চল ছিল মেঘনা নদীর পূর্বাঞ্চল ও সামান্য পশ্চিমাঞ্চল অর্থাৎ সিলেটের দক্ষিণাঞ্চল, কুমিল্লা-ত্রিপুরা ও নোয়াখালী জেলা। ‘হরিকেল’ বলতে বুঝানো হতো চট্রগ্রাম সন্নিহিত সমুদ্র উপকুল এলাকা। প্রাচীন বৈদিক সাহিত্য ঋগে¦দে ‘বঙ্গ’ বা বঙ্গদেশ সম্পর্কে কোন কিছু উল্লেখ নাই। তবে ঋগে¦দের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ঐতরেয় (১৪০০-১০০০ খ্রি: পূর্ব ) এর একটি পদে ‘বঙ্গ’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারত উপমহাদেশে আর্যকরণ শুরু হয় প্রায় ১৫০০ খ্রিঃ পূর্বাব্দ থেকে। ইউরোপ থেকে আগত আর্যরা দীর্ঘকাল পর্যন্ত পারস্য পেরিয়ে ভারতে আগমন করে। তৎকালীন দ্রাবিড় অধ্যুষিত সিন্ধু-পাঞ্জাব ও উত্তর ভারত আর্যদের দখলভূক্ত হওয়ার পর আর্যরা পূর্ব ভারতের দিক অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু স্বাধীন মনোভাবসম্পন্ন ও নিজ কৃষ্টি গর্বে গর্বিত বঙ্গবাসীরা আর্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রবলভাবে বাধা সৃষ্টি করে। বঙ্গ-দ্রাবিড়দের প্রতিরোধের ফলে খ্রিষ্টপূর্ব চার শতক পর্যন্ত এ অঞ্চলে আর্যকরণ সম্ভব হয় নাই। সামরিকভাবে অভিযান ব্যর্থ হওয়াতে তারা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নেয়। মৌর্য বংশ (খ্রিঃপূর্ব ৪ শতক) শাসন ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হলে রাজনৈতিকভাবে ও সাংস্কৃতিকভাবে আর্যকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর খ্রিষ্টীয় চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দীতে গুপ্ত রাজবংশের শাসনামলে ‘বঙ্গ’ অঞ্চলে আর্যকরণ প্রায় সম্পন্ন হয়। গুপ্ত আমলে বঙ্গ অঞ্চলে আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদীদের প্রচন্ড প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এ সময় জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম-সংস্কৃতি বঙ্গ, রাঢ় ও গৌড় অঞ্চলের জনগণের আত্মরক্ষার সংগ্রামে শক্তির নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। তবে খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকের শুরুর দিকে গুপ্ত রাজাদের মহাসামন্ত ব্রাহ্মণ্য শৈবধর্মের অনুসারী রাজা শশাংকের শাসনামলে এ অঞ্চলে অধিক সংখ্যক পশ্চিম ভারতীয় আর্যদের অনুপ্রবেশ ঘটে। শিবপূজারী রাজা শশাংক বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি নির্মূলের নিষ্ঠুর অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি গয়ায় বৌদ্ধধর্মের তীর্থ গাছ ‘বোধিবৃক্ষ’ ছেদন করেন। এছাড়া সেতুবন্ধ (মুর্শিদাবাদের ভাটির অঞ্চল) থেকে হিমালয় পর্যন্ত তিনি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদৈর হত্যা করার নির্দেশ জারী করেন। রাজা শশাংকের পরে খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকের শেষার্ধ থেকে অষ্টম শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত ‘মাৎসন্যায়’ যুগে বৌদ্ধধর্মের সাংস্কৃতিক আদর্শের উপর আর্যসংস্কৃতির প্রভাব বেড়ে যায়। তবে খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের মধ্যভাগে ‘মাৎসান্যায়’ যুগের অবসান ঘটিয়ে গৌড়-বঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মাবালম্বী পাল শাসনের সূচনা হয়। ফলে এ অঞ্চলের অধিবাসীরা নিজস্ব সং¯কৃতিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পায়। এ সময় বিভিন্ন ‘বৌদ্ধবিহার’ ‘সংঘারাম’ শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এ যুগে বিক্রমপুরে বিশ্ববিশ্রুত জ্ঞান সাধক অতীশ দীপংকরের (৯৮০-১০৩৫) আবির্ভাব হয়। এ যুগেই বাংলাভাষার আদি সৃহ্যমানকাল হিসেবে আখ্যাত করা হয়। পাল বংশের শাসনামল প্রায় ৪০০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ ছিল। এ সময় বৌদ্ধধর্ম গৌড়-বঙ্গ পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও বিস্তৃতি লাভ করে। পাল রাজাদের উদারতার ফলে বৈদিক ধর্ম-সংস্কৃতির সাথে বৌদ্ধধর্ম-সংস্কৃতির সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তথাকথিত এ সমন্বেেয়র কারণে বৈদিক ধর্ম-সংস্কৃতসেবী ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধধর্ম-সংস্কৃতি দূর করার সুযোগ পায়। এ কারণে পরবর্তীতে বঙ্গ-গৌড় থেকে বৌদ্ধধর্ম প্রায় নির্বাসনে যায় এবং বৈদিক ধর্ম-সংস্কৃতি প্রাধান্য পায়।

পাল বংশের শেষ রাজা রামপালের মৃত্যুর পর পালরাজ্যে বিশৃংখলা দেখা দেয়। এ সুযেগে দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকদেশীয় ‘চন্দ্র’ বংশের হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেন বঙ্গ-গৌড়ের অধিপতি হন। তারা নিজেদেরকে ‘গৌড়েশ্বর’ নামে পরিচিত করতেন। জনপদ হিসেবে ‘বঙ্গ’ দীর্ঘদিন যাবৎ স্বতন্ত্র সত্তা রক্ষা করলেও পাল ও সেন আমলে ‘বঙ্গ’ যেন ‘গৌড়দেশ’ নামের ভিন্ন সত্তায় বিলীন হতে যাচ্ছিল। এমন সময় খ্রিস্টীয় এয়োদশ শতকে মুসলিম বিজেতাদের আগমনে ‘বঙ্গ’ জনপদের ভাগ্যের দরজা খুলে যায়। স্বাধীন সত্তা নিয়ে ‘বঙ্গ’ জনপদ আবার উঠে দাঁড়ায়। শুধু তাই নয় কালের পরিক্রমায় এবং মুসলিম নৃপতিদের আন্তরিকতায় গৌড়, রাঢ়, পৌন্ড্রসহ প্রতিবেশী অন্যান্য জনপদগুলোও ‘বঙ্গ’ জনপদের সাথে বিলীন হয়ে ‘বাঙালাহ্’ হয়ে যায়।

১২০৩ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির ‘গৌড় বিজয়’ এর মাধ্যমে মুসলমানদের ‘বঙ্গ বিজয়’ শুরু হয়। লাখনৌতিকে কেন্দ্রে করে বাংলার নব প্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাজ্যের সীমানা ছিল উত্তরে পশ্চিমবঙ্গের পূর্ণিয়া শহর, দেবকোট থেকে রংপুর শহর। পশ্চিমে কুশী নদীর নিম্নাঞ্চল থেকে গঙ্গার তীরবর্তী রাজমহল পাহাড়। দক্ষিণে গঙ্গার মূল ধারা (পদ্মা) এবং পূর্বে তিস্তা ও করতোয়া নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। পরবর্তী একশ বছরের মধ্যে বাংলার প্রায় অর্ধেক অঞ্চলে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। আর চৌদ্দ শতকের মধ্যে সমগ্র বাংলা মুসলিম শাসনাধীনে আসে। ১২০৩ খ্রি. থেকে ১৩৩৮ খ্রি. পর্যন্ত ১৩৫ বছরে কমপক্ষে ২৩ জন মুসলিম শাসনকর্তা ‘বঙ্গ’ অঞ্চল শাসন করেন। এ সময়ে দিল্লীর মুসলিম সালতানাতের প্রতি বাংলার মুসলিম শাসকদের আনুগত্য ছিল নামেমাত্র। ১৩৩৮ খ্রি. ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ্ সোনারগাঁয়ের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার পর থেকে সেই নামেমাত্র আনুগত্যের বন্ধনও ছিন্ন করে নিজেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ্রে রাজত্বকালে (১৩৪২-১৩৫৮) ‘লাখনৌতি’ ও ‘বঙ্গদেশ’কে একত্রিত করা হয়। সুলতান এই যুক্ত অঞ্চলকে নাম দেন ‘বাঙালাহ্’ এবং এর অধিবাসীদের নাম দেন ‘বাঙালি’। আর তিনি নিজে ‘শাহ-ই-বাঙালাহ্’ উপাধি ধারণ করেন। সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের শামনামলেই বাংলা ভাষাভাষি অঞ্চল সর্বপ্রথম ‘বাঙালাহ্’ এবং এর অধিবাসীরা ‘বাঙালি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এর আগে বাংলা ভাষাভাষি অঞ্চল অব্দ, রাঢ়, বরেন্দ্র, গৌড়, লাখনৌতি, পুন্ড্রবর্ধন, সমতট, পাট্টিকেরা প্রভূতি নামে বিভক্ত ছিল। তাই ভাষাগত ঐক্য স্থাপন এবং বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে জাতিগত স্বতন্ত্র জাতিসত্তায় পরিচিতি করায় বাঙালি জাতির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে হাজী শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ্কে আখ্যাত করা যায়।

বাঙালাহ ও বাঙালি জাতিসত্তাকে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত করার পর সুলতান দিল্লীর আনুগত্য পরিহার করে স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। ইতিহাসে ১৩৩৮ থেকে ১৫৩৮ খ্রি. পর্যন্ত দুইশত বছর বাংলার স্বাধীন সুলতানী আমল হিসেবে পরিচিত। শেরশাহের শাসনামল (১৫৪০-১৫৪৫খ্রিঃ) কয়েক বছর বাংলাদেশ দিল্লীর সাথে যুক্ত ছিল। ১৫৭৬ খ্রি. রাজমহালের যুদ্ধে নিহত হবার আগ পর্যন্ত দাউদ খান করারানী স্বাধীন সুলতান রূপেই বাংলাদেশ শাসন করেছেন। বাংলায় আফগান শাসনের পর প্রায় তিন যুগ (১৫৭৬-১৬০৮ খ্রি.) পর্যন্ত বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল মুঘল কর্তৃত্বের বাইরে স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়। এ সময় বার ভূঁইয়াদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে সুবাদার ইসলাম খাঁ ১৬০৮ খ্রি. বাংলায় মুঘল কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং তা প্রায় একশত বছর অব্যাহত থাকে। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর সুবেদার মুরশিদ কুলি খান থেকে শুরু করে নবাব সিরাজউদ্দৌলাহ্ (১৭৫৬-৫৭ খ্রি.) পর্যন্ত নবাবগণ নামেমাত্র মুঘল সম্রাটদের অধীনে থেকে স্বাধীনভাবে বাংলাদেশ শাসন পরিচালনা করেন।

১৭৫৭ সালে পলাশী ষড়যন্ত্রের পর বাংলাদেশ ইংরেজদের শাসনাধীনে চলে আসে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোস্তের মাধ্যমে জমিদার ও দালাল শ্রেণী তৈরি করে বাঙালি জাতিকে বিভক্ত করে। আর ইংরেজ শাসকরা প্রশাসনিক সুবিধার্থে ১৯০৫ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’ এর মাধ্যমে বিশাল বাংলাকে বিভক্ত করে। তবে কলকাতা কেন্দ্রিক হিন্দু নেতৃবৃন্দের প্রবল বিরোধিতা এবং তাদের সহিংস আন্দোলনের কারণে ইংরেজ শাসকরা ১৯১১ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’ রদ করে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতেই বঙ্গদেশ পুনরায় বিভক্ত হয়েছে! এবং পূর্ববঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হিসেবে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম ধারণ করে। অন্যদিকে পশ্চিম অংশ ‘পশ্চিম বঙ্গ’ নাম ধারণ করে ভারতের অংশ হয়েছে। এতে প্রায় সাত শত বছরের মুসলিম শাসনামলে বাংলার জনগণের যৌথ কর্মজীবন পরম্পরায় গড়ে ওঠা জাতিসত্তা ও জাতীয়তাবোধ দুই শতকের ইংরেজ শাসনে ছেদ ঘটে।

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে বঙ্গদেশ বিভক্ত হলেও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীরা পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলিমদের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে চায়নি। তারা মুসলিম উদারতা না দেখিয়ে সেন শাসকদের মতো বাঙালি ভাষা-সংস্কৃতির উপর আঘাত করেছেন। এতে বাঙালি মুসলিম সমাজে নবচেতনার জাগরণ ঘটে। অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম ও ‘৫২ এর আত্মত্যাগের মাধ্যমে ১৯৫৬ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এরপর দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম শেষে ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। এভাবে দীর্ঘ পথ পরিক্রমার পর বর্তমানে বাংলাদেশে বাঙালি জাতিসত্তা-সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের ইতোমধ্যেই ৫৪ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এ সময়ে অনেক জাতি ব্যাপক উন্নতি-সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। তাই আমাদেরও প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশের প্রয়োজন আছে। এতে দেখা যাবে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির বেদনা বেশি আছে। স্বাধীনোত্তোর বাংলাদেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্যখাতে উন্নতি হয়েছে, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। তথ্য-যোগাযোগ ও প্রযুক্তির অনেক উন্নয়ন ঘটেছে। মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। আমাদের তরুণরা ইতোমধ্যে ক্রিকেটে বিশ্বকে বিস্মিত করেছে। খেলাধুলায় ছেলেদের সাথে মেয়েরাও এগিয়ে চলছে। তরুণদের নেতৃত্বের গণআন্দোলনে ফ্যাসিস্ট-স্বৈরাচারের পতন হয়েছে। এসবের সাথে অপ্রাপ্তিরও দীর্ঘ তালিকা আছে। এখনও অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও চাহিদা অপূর্ণই থাকছে। বেকারত্ব, যানজট, পরিবেশ দুুষণ, নদী-খাল দখলের প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে কৃষি জমি কমছে। দুর্নীতি দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য গণতন্ত্র স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরেও অস্ফুটই রয়েছে। আর রাজনৈতিক দলগুলো জনস্বার্থের চেয়ে দলীয় ও ব্যক্তি স্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে সামাজিক অসহিষ্ণুতা ও নৈতিক অবক্ষয় বেড়েই চলছে। এসবের সাথে জলবাযুর বৈশ্বিক সমস্যা এবং আধিপত্যবাদীদের লোলুপ দৃষ্টি আমাদের আতঙ্কিত করছে।

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের ভৌগলিক স্বাধীনতা অর্জিত হলেও মানুষের মুক্তি মেলেনি। দেশ এগিয়ে চললেও এখনও কাঙ্খিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। তবে স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হলে সব বিভেদ ভুলে আইনের শাসন, বৈষম্য নিরসন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও মানাবিধকার প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। আর এ ঐক্যের ভিত্তিতে জাতীয় সমস্যা-সমাধানের পথ নির্ণয় করা যাবে। অধিকন্তু সংঘাত-সংঘর্ষ পরিহার করে রাজনৈতিক দলগুলোকে জনকল্যাণে নিয়োজিত হতে হবে। মহান বিজয়ের মাসে জাতি এসব প্রত্যাশাই করে।

লেখক :

আহ্বায়ক, ডক্টরস এসোসিয়েশন অব নন-গবর্নমেন্ট টিচার্স (ড্যাঙ্গট)