ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ
জন্মগতভাবেই মানুষ স্বাধীনতাপ্রিয়। বাঁচতে চায় বিজয়ের বেশে। স্বাধীনভাবে বাঁচার জন্যই মানুষ সংগ্রাম করে; প্রতিনিয়ত জীবনের প্রতিটি পর্বে স্বাধীন কর্মক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করে। পৃথিবীর ইতিহাসে নমরুদ, ফেরাউন কিংবা এরকম জালিম শাসকেরা প্রকান্তরে ফ্যাসিবাদী নীতিকেই প্রতিষ্ঠিত করে নিজেদেরকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছেন। জনগণ থেকেছে আজ্ঞাবহ দাসের মতোন। সেই ধারাবহিকতায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলে ইন্দোনেশীয় ডাচরা ফ্যাসিবাদের ঐতিহাসিক অভিযাত্রায় শাসন করেছে। সর্বভারতীয় অঞ্চলে ইংরেজ ও ব্রিটিশরা প্রতিষ্ঠিত করেছিলো ইনটেলেকচুয়াল ফ্যাসিবাদ। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী দ্বিচোখা নীতি অবলম্বনের মাধ্যমে আধুনিক ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছিলো। সবশেষে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের মুজিবীয় আমলে প্রতিষ্ঠিত হয় বাকশালীয় ফ্যাসিবাদ এবং শেখ হাসিনার শাসনামলে অগ্রসরমান ও ডিজিটালাইজড ফ্যাসিবাদের কবলে পড়তে হয় দেশবাসীকে। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব মূলত এই ফ্যাসিবাদের অন্ধকার প্রতিরোধকল্পেই সংগঠিত হয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের রক্তাক্ত পথচলা
ইংরেজ ও ব্রিটিশ গোলামী থেকে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভ করে পূর্ব পাকিস্তান। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক নীতির কারণে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ছাত্র, পেশাজীবী, শ্রমজীবী, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী নির্বিশেষে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক চেতনার বাংলাদেশ পাওয়ার একটি প্রত্যাশার জায়গা তৈরি হয়। স্বাধীনতার পরপরই মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগ বাকশালের মাধ্যমে হয়ে ওঠে ফ্যাসিবাদের প্রতীক। আর স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার দোহাই দিয়ে অন্যায্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের বিনিময়ে বাংলাদেশ নানা দিক থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। ফলে সেনা অভ্যুত্থানে ভয়াবহ নির্মমতার মধ্যদিয়ে বাকশালীয় ফ্যাসিবাদের পতন ঘটে।
ফ্যাসিবাদের পরবর্তী প্রজন্মের পুনরুত্থানে বাংলাদেশ যেন আবারও পথ হারায়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ফ্যাসিবাদী আচরণের পদধ্বনি শোনা যায়। ২০০৮ সালের সাজানো নির্বাচনের মধ্য দিয়েই মূলত ফ্যাসিবাদের পেশীবাদের চেহারা উন্মুক্ত হয়ে ওঠে। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালের রাতের ভোটের নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের একদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাকে কুক্ষীগত করার অপপ্রয়াস চালায় আওয়ামীলীগ। সেই সময় থেকে বিগত সাড়ে পনের বছর জগদ্দল পাথরের মতো এদেশের জনগণের উপর চেপে বসেছিল ভারতীয় আধিপত্যবাদের এদেশীয় দোসর হিসেবে কট্টর ফ্যাসিবাদী চরিত্র নিয়ে। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, আইন অঙ্গনসহ সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানকে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়।
ক্ষমতাকে টেকসই করতে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে কেবলমাত্র দলীয় লোক নিয়োগের হাতিয়ারে পরিণত করা হয় কোটাব্যবস্থাকে। মেধাবীদেরকে পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে বাদ দিয়ে মেধাহীন আওয়ামী রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টা চলতে থাকে। এই কোটার বিরুদ্ধে অবস্থান থেকেই আন্দোলনের সূচনা। পরবর্তীতে সেই কোটা বিরোধী আন্দোলন ‘বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন’ হিসেবে প্রকাশিত হয়ে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
কোটা সংস্কারের প্রথম দাবি উত্থাপিত হয় ১৯৯৭ সালে। আওয়ামী লীগ সরকার এতে কর্ণপাত না করে উল্টো আন্দোলনকারীদের উপর নির্যাতন শুরু করে। পরবর্তীতে ২০০৭ ও ২০১২ সালে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আবারো কোটা সংস্কারের দাবি ওঠে। এ সময়ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলনকারী নেতাকর্মীরা নির্যাতনের শিকার হন। কোটা সংস্কার আন্দোলন বড় আকারে রূপ নেয় ২০১৮ সালে। ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদ’ এর ব্যানারে এই আন্দোলন সর্বব্যাপী রূপ লাভ করে। আন্দোলনের মুখে ১১ এপ্রিল সংসদে দাঁড়িয়ে সব ধরনের কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে তা পরিপত্রের মাধ্যমে কার্যকর হয়। ২০২১ সালে এই পরিপত্রের বিরুদ্ধে এক রিট সাজানো হয়। ২০২৪ সালের ৫ জুন সেই রিটের রায়ে পরিপত্রটি অবৈধ ঘোষণা করে কোটা পুনর্বহালের আদেশ আসে। এ ঘটনায় ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং কোটা বাতিলের দাবি জানায়। পাশাপাশি দাবি বাস্তবায়নের জন্য ৩০ জুন পর্যন্ত আল্টিমেটাম দেয়। কোটা সংস্কারের লক্ষ্যে চার দফা দাবিতে ১ জুলাই থেকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করে। এ আন্দোলনে যেন এক নতুন প্রজন্মের দেখা মেলে। বারবার মূলা ঝুলিয়ে ছাত্রদের দাবি অবাস্তবায়িত রাখার ক্ষেত্রে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার অপকৌশল শিক্ষার্থীদের এবার আর ফাঁকি দিতে পারেনি। অবশেষে গণঅভ্যুত্থান সফল হয় ৫ আগস্ট ২০২৪ দুপুরে শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ায় মধ্য দিয়ে। বিদায় নেয় জোরপূর্বক ক্ষমতা আঁকড়ে ধরা রাখা ঘষেটী বেগমের উত্তরসূরী। আগস্ট মাসে গণঅভ্যুত্থান সফল হলেও আন্দোলনকারী চৌকস শিক্ষার্থীরা ঐ তারিখকে ‘৩৬ জুলাই’ ঘোষণা দিয়ে ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এই বিপ্লবের নামকরণ করে ‘জুলাই বিপ্লব’।
শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগের পর ছাত্র-জনতার রোষানলে পড়ে ফ্যাসিবাদের দোসর ও সুবিধাভোগীরা। এমতাবস্থায় সরকারের মন্ত্রী, এমপি, দলীয় নেতাকর্মী ও সুবিধাভোগী পুলিশ প্রশাসন ছাত্র-জনতার ক্ষোভ থেকে বাঁচতে গা ঢাকা দেয়। গণঅভ্যুত্থানে একটি দেশে একযোগে সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, এমপি, দলীয় নেতাকর্মী এবং ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রাখতে তৎপর বিভিন্ন গোষ্ঠী যেমন: সাংবাদিক, পুলিশ, সেনা কর্মকর্তা, আমলা পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা বিশ্বে বিরল। নির্মম গণহত্যা পরিচালনার নির্দেশদাতা শেখ হাসিনার উপর জনরোষ এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যে, ৫ ও ৬ আগস্ট সারাদেশে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও তার পরিবার সম্পর্কিত স্থাপত্য, ভাষ্কর্য ও প্রতিকৃতি সমূলে উৎপাটন ও নাম পরিবর্তন করে ছাত্র-জনতা। সূচিত হয় নতুন এক অধ্যায়ের।
অভূতপূর্ব এক অভ্যুত্থানের আলোয় উদ্ভাসিত বাংলাদেশ। মাত্র এক মাসে ছাত্র-জনতার উদ্বেলিত উৎসাহে রক্ত-কালি দিয়ে ঢাকা এবং সারা দেশের রাজপথে যে ইতিহাস লেখা হলো, তা বিশ্বের ইতিহাসেই বিরল। অপ্রতিরোধ্য, ‘আনচ্যালেঞ্জড’, আমৃত্যু ক্ষমতা ধরে রাখার প্রায়-প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা- সব কেমন অসহায় আত্মসমর্পণ করে ফেললো গণজাগরণের সম্মিলিত শক্তির কাছে! এই গণজাগরণ এবং তার অনিবার্য ফলাফল বাংলাদেশের ইতিহাসই শুধু পাল্টায়নি; পাল্টে দিয়েছে আমাদের কথা বলার ধরন, চিন্তাশক্তি, সত্য প্রকাশের প্রক্রিয়া, কর্মপরিধি এবং সর্বোপরি জীবনযাপনের পদ্ধতি। এটি দ্বিধাহীনভাবেই বলা যায়, ২০২৪-এর ৫ আগস্টে জন্ম নেয়া বাংলাদেশ এমনকি ৪ঠা আগস্টের বাংলাদেশ থেকেও ভিন্ন। ছাত্র-জনতার অনুরোধে ৭ আগস্ট দেশে আসেন ড. মুহাম্মদ ইউনুস। ৮ আগস্ট দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন অংশীজনের উপস্থিতিতে বঙ্গভবনে উপদেষ্টা পরিষদের শপথ অনুষ্ঠিত হয় এবং ৯ আগস্ট দপ্তর বণ্টন করা হয়। এ এক নতুন বাংলাদেশকে দেখলো বিশ্ববাসী।
ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলন ও জুলাই বিপ্লব
দেশের এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতে সারাদেশের ট্রাফিক ও পুলিশ সদস্যরা কাজে যোগদান থেকে বিরত থাকে। যানজট নিরসনে ১১ আগস্ট পর্যন্ত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে ছাত্রসমাজ। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঠিক রাখতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উপাসনালয়, বাড়িঘর ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান পাহারার দায়িত্ব নেয় জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের পাশাপাশি বিভিন্ন মাদরাসার ছাত্ররা। এছাড়া বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবিপ্লবের আশঙ্কা তৈরি হলে সেগুলোও নস্যাৎ করে দেয় ছাত্র-জনতা। দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংকটের মাঝে ভারত সীমান্তের ডুম্বুর বাধ খুলে দেওয়া এবং একাধারে বৃষ্টি হওয়ায় স্মরণকালের ভয়াবহতম বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগের অধিকাংশ এলাকা ডুবে যায়। এই সংকট মোকাবেলায় সকল ধর্ম-বর্ণ-দল, শ্রেণি-পেশার মানুষ একসাথ হয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর যে নজির স্থাপন করে, তাতে নতুন বাংলাদেশ গড়ার এক প্রত্যয় সকলের চোখে মুখে সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।
ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবকে গণ-অভ্যুত্থান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান ও বিপ্লব প্রত্যয়গুলো একই রকম মনে হলেও এদের মধ্যে বেশকিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন বিদ্রোহ বলতে বোঝায় সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের অসন্তোষ; এবং অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এর ফলে সরকার পরিবর্তন হয় না, নামমাত্র প্রশাসনিক সংস্কার হয়। এদিকে অভ্যুত্থানের ধারণা বিদ্রোহ থেকে ব্যাপকতর। জনগণ যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে নিজেদের হাতে ক্ষমতা নিয়ে আসে এবং সেখানে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেয়, তখনই একে গণ-অভ্যুত্থান বলে। যেখানে সমাজ বা রাষ্ট্রের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করা হয় এবং পরিবর্তনের জন্য রাজপথে নেমে পড়ে। গণ-অভ্যুত্থান হঠাৎ করে ঘটে। তাই সরকারের নীতি বা শাসন এখানে গুরুত্ব পায় না; ক্ষমতা লাভই এখানে সর্বাধিক প্রাধান্য পায়। অন্যদিকে বিপ্লব কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা বলে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কোনো স্বৈরাচারী নীতির বিরুদ্ধে অথবা ঘুণে ধরা আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের সমগ্র অংশের বিক্ষোভের নাম বিপ্লব। এটা কোনো একটা দেশ বা কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এক দেশ থেকে উত্থান হয়ে নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বহুদিন পর্যন্ত এর অস্তিত্ব বজায় থাকে।
শিক্ষার্থীদের বিদ্রোহ গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছে। কারণ প্রথমত, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হয় তাদের অভিভাবক ও শ্রমিক শ্রেণিসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। দ্বিতীয়ত, ঢাকা কেন্দ্রিক না থেকে এ আন্দোলন সারা দেশের জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, এ আন্দোলনের মাধ্যমে কোটার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ থেকে সরকার পরিবর্তনের এক দফায় পরিণত হয়েছে। তবে এ গণ-অভ্যুত্থানের নির্দিষ্ট একটা পক্ষ কিংবা রাজনৈতিক চরিত্র ছিলো না।
সত্যিকার অর্থে, এখনো বিপ্লব হয়নি। বিপ্লব বলা যাবে তখন, যখন কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হলে একে বিপ্লব বলা যেতে পারে। উদারনৈতিক গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশের যাত্রা নিয়ে শঙ্কা রয়েই গেছে। টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় সংস্কার না করতে পারলে আবারো নতুন করে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে পারে। কেননা ১৯৭২ সাল থেকে যে শ্রেণিগত শাসন চলে আসছে, সেখানে প্রত্যেকটি শাসন ব্যবস্থা ছিল ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাতান্ত্রিক। ১৯৭৫ সালের আগে শেখ মুজিবের আওয়ামী-বাকশালী ব্যবস্থা কায়েম ছিল। বাংলাদেশের জনগণ একের পর এক ফ্যাসিস্ট সরকার শাসন দেখেছে।
ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার জন্য অসংখ্য উপাদান আমাদের সংবিধান, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিদ্যমান। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে কোনো ভারসাম্য নেই। প্রধানমন্ত্রীই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, রাষ্ট্রপতি পদ আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দলীয় প্রধান, সরকারপ্রধান এবং জাতীয় সংসদ নেতা।
ছাত্রবিদ্রোহ থেকে সৃষ্ট এ গণ-অভ্যুত্থানের পূর্ণ সুফল পেতে এবং সম্ভাব্য ফ্যাসিবাদকে রুখতে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সংস্কার অতীব জরুরি। করপোরেট গ্রুপ, ধনিক শ্রেণি, বহুজাতিক গোষ্ঠী, স্বৈরাচারের দোসরদের হাত থেকে রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে আনতে হলে পুরো গণতান্ত্রিক রূপান্তর দরকার। মনে হতে পারে অনেক কাজ; কিন্তু না। রাষ্ট্রের সব উদ্যোগের কেন্দ্রে জনগণকে রাখলেই সংক্রিয়ভাবে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এতদিন কেন্দ্রে ছিল বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলারা। এ তিন গোষ্ঠীর কারণে রাষ্ট্রে অগণতান্ত্রিক, নিপীড়নমূলক ও জবাবদিহিহীন ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। এদের দাপট কমাতে পারলে গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব। এক্ষেত্রে সংবিধান, আইন-কানুন, শিক্ষা, চিকিৎসা, রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক, অর্থনৈতিক নীতিমালা, পরিকল্পনাসহ সব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের দলীয়করণের মাত্রা পূর্বের যেকোন সময়কে ছাড়িয়ে যায়। বেসামরিক প্রশাসন, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ, সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত ও আধা স্বায়ত্বশাসিত সকল প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ছিল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হাতে, উপরন্তু কর্মকর্তারাই আওয়ামীলীগের কর্মীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ফলত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর প্রতিবিপ্লবের আশঙ্কা প্রকট আকার ধারণ করে। কিন্তু সাহসী ছাত্র-জনতার ঐকান্তিক প্রয়াসে সকল ষড়যন্ত্র নস্যাত হয়ে যায়।
২০২৪ এর এই গণঅভ্যুত্থানে পূর্ব ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সমগ্র জাতিকে এক মোহনায় মিলিত করে। বিশেষ করে ১৯৭১-কে পুঁজি করে স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষ বিতর্কের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের বিভক্তির রেখা মুছে যায় ‘২৪ এর বিপ্লবী চেতনার মাধ্যমে। কিছু রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের প্রপাগান্ডা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের গণমাধ্যমগুলো একপ্রকার গুজব সেল হিসেবে কাজ করে। কিন্তু দেশের সকল রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন পক্ষ একসাথে হিন্দুদের উপাসনালয়, ঘরবাড়ি ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান পাহারা ও সংরক্ষণের কর্মসূচি দেশের মানুষের মধ্যকার বিভেদকে ঘুচিয়ে দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ আগস্ট শাহবাগে সম্প্রীতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রায় সকল জাতীয় ছাত্রসংগঠন, বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষ সাম্য ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার করেন। মূলত এর মধ্য দিয়ে দেশে সম্প্রীতি গড়ে ওঠার একটি পরিবেশ ত্বরান্বিত হয়।
পরিশেষে বলা যায়, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করেছি আমরা। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ ফ্যাসিবাদের চরম শিখরে উঠে পড়ে। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গীকে জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গী হিসেবে বিবেচনা করতে থাকে। বঞ্চিত করতে থাকে জনগণকে। ফলে ফুসে ওঠে দেশের সাধারণ মানুষ। দেশের সংস্কারের জন্য গণঅভ্যুত্থানকে জুলাই বিপ্লবে পরিণত করতে হবে। এক্ষেত্রে ছাত্রজনতার আকাক্সক্ষার আলোকে বৈষম্যমুক্ত ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়া এখন সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জনতার প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংবিধান পুনর্লিখন ও রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে দেশবাসী। এই নতুন সভ্যতা বির্নিমাণে সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রমিক নাগরিক তৈরির বিকল্প নেই। ছাত্রজনতার অজস্র ত্যাগের এই গণঅভ্যুত্থানকে বিপ্লবে পরিণত করতে রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরে প্রয়োজনের আলোকে সংস্কার জরুির। অন্তর্বর্তী সরকারকে কিছু মৌলিক বিষয়ে সবার আগে গুরুত্বারোপ করা দরকার, তা হলো- ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার সুষ্টু পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, আধুনিক ও নৈতিকতাসমৃদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ সৃষ্টি, ধর্মীয় ও আর্দশিক সাংস্কৃতিক চর্চার বিকাশ, কর্মক্ষম যুবকদের কর্মসংস্থান ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিতকরণ। সেইসাথে শ্রমিক মালিক বৈষম্য দূরিকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।এছাড়া আন্দোলনে আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী ব্যক্তিদের সুচিকিৎসা ও পুর্নবাসন, শহীদ পরিবারে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান, ছাত্ররাজনীতির সময়োপয়োগী সংস্কার করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধতা এখন সময়ের দাবি। দেশবিরোধী সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণ করতে সকলকে একসাথ হয়ে প্রতিটি সেক্টর পূনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে। এক্ষেত্রে গোষ্ঠীবদ্ধ প্রচেষ্টার পাশাপাশি সকল নাগরিক এবং শিক্ষার্থী নিজ নিজ জায়গা থেকে তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পরিমার্জনের মধ্য দিয়ে একতা ও সম্প্রীতির এক নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে এখন গণঅভ্যুত্থানকে জুলাই বিপ্লবে পরিণত করতে হবে। তাহলেই মহান বিজয় দিবস সার্থকতা পাবে।
লেখক
কবি ও গবেষক; প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়