সিরিজ শুরুর আগে অবশ্য ছন্দ ছিল না নাজমুল হোনেস শান্তুর ব্যাটে। গত বছর বিতর্কিতভাবে তাকে ওয়ানডে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া র পর থেকে রানও যেন হারিয়ে গিয়েছিল। টানা ১২ ইনিংসে ফিফটি ছিল না। এই সিরিজের প্রথম ম্যাচে বিদায় নেন শূন্য রানে। বাংলাদেশ দলে যথেষ্ট বিকল্প নেই বলে তার জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উচ্চকিত হয়নি। কিন্তু ফর্ম তো দৃশ্যমানই ছিল! অবশেষে ১৩ ইনিংসের খরা কাটালেন সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে। ৫ চার ও ২ ছক্কায় ৫০ রানের ইনিংসটি পুরোপুরি পূর্ণতা পেল না ক্র্যাম্প নিয়ে মাঠ ছাড়ায়। শেষ ম্যাচে দলের যা অবস্থা ছিল, তাতে শান্তর ব্যাট স্রেফ ফিফটিই যথেষ্ট ছিল না। ৩২ রানে প্রথম ৩ ব্যাটারকে হারায় দল। রিশাদ হোসেন ও তাসকিন আহমেদ একাদশে না থাকায় এই ম্যাচে দলের ব্যাটিংয়ের লেজ অনেক লম্বা। সাত নম্বরের পর ব্যাটসম্যানই নেই বলতে গেলে। শান্তর ব্যাটে একটি বড় ইনিংস তাই জরুরি ছিল। প্রয়োজন ছিল কেজন সঙ্গীরও। সেখান হাত বাড়িয়ে দিলেন লিটন। দুজনে মিলে এগিয়ে নিলেন দলকে। শান্ত যে এ দিন ভালো করতে পারেন, আভাসটা মিলেছিল শুরুতেই। ক্রিজে যাওয়ার পরপরই দারুণ এক অন ড্রাইভে চার মারেন তিনি ন্যাথান স্মিথকে। সাধারণত ইনিংসের শুরুর দিকে যখন তিনি এরকম অন ড্রাইভ বা স্ট্রেট ড্রাইভ খেলেন, ধরে নেয়াযায় তিনি ভালো অনুভব করছেন। সময়ের সঙ্গে সেটিই প্রমাণ হতে থাকে। টানা দ্বিতীয় ফিফটিতে পা রাখেন তিনি ৭০ বলে। অপরপ্রান্তে ঠা-া মাথার ব্যাটিংয়ে ১৯ ইনিংসের খরা কাটিয়ে লিটন ফিফটি করেন ৭১ বলে। দুজনের জুটি শতরান ছাড়িয়ে একসময় পেরিয়ে যায় দেড়শও। ৯১ বলে ৭৬ রান করে লিটন বোল্ড হন লেনক্সের বলে। জুটি থামে ১৬০ রানে, নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে চতুর্থ উইকেটে যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ। শান্ত তখন খেলছেন ৯২ রানে। সঙ্গীকে হারালেও তিনি মনোবল হারাননি। একটু পরই পৌঁছে যান শতরানে। ফিফটি থেকে সেঞ্চুরি পর্যন্ত যেতে বল লাগে ৪৪টি। তার চতুর্থ ওয়ানডে সেঞ্চুরি এটি। শান্তু প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরির স্বাদ পেয়েছিলেন তিনি ২০২০ সালের ১ মার্চ। সেদিন থেকে এ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশের হয়ে ৪টি সেঞ্চুরিই সর্বোচ্চ। শান্তর পাশাপাশি যা করেছেন লিটনও। শতরানের একটু পর ছক্কার চেষ্টায় সীমানায় ধরা পড়ে শেষ হয় তার ইনিংস। ১৮৬ মিনিটের নায়োকোচিত লড়াই শেষে তিনি মাঠ ছাড়েন মাথা উঁচু করে। শুরুর সেই অস্বস্তি কাটিয়ে দল তখন স্বস্তির ঠিকানায়। নিউজিল্যান্ডের বোলারদের সঙ্গে বৈশাখের প্রচন্ড দাবদাহও ছিল অন্যতম প্রতিপক্ষ। শান্ত অবশ্য গরমকে হার মানিয়েছেন, লিটনকে সঙ্গী করে গড়েছেন ম্যারাথন জুটি। দুজনে মিলে বাংলাদেশকে শুধু বিপর্যয় থেকেই রক্ষা করলেন এমনটা নয়, এনে দেন লড়াইয়ের মতো পুঁজিও। লিটন না পারলেও শান্ত ছুঁয়েছেন তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগার। দুজনের লম্বা ইনিংস খেলা দলকে শুধু বিপদ থেকেই বাঁচালো না, মিডল অর্ডার নিয়ে সব চিন্তার পরিমাণটাও কিছুটা কমে। চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস হেরে আগে ব্যাটিং করে ২৬৫ রান করে বাংলাদেশ। যেখানে শান্তর ব্যাট থেকে আসে ১১৯ বলে ১০৫ রান আর লিটন করেন ৯১ বলে ৭৬। চতুর্থ উইকেটে দুজন মিলে গড়েন ১৬৫ রানের জুটি। যা কিনা বাংলাদেশের মোট দলীয় রানের ৬২.২৬ শতাংশ। চট্টগ্রামের এই স্টেডিয়াম সাগর থেকে মাত্র ৫-৭ কিলোমিটার দূরে। ফলে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ সবসময়ই বেশি। তার ওপর বৈশাখের প্রচ- দাবদাহ, তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি বা কখনো তারও বেশি। এই তাপমাত্রায় ব্যাটিং করা কতটা কঠিন সেটা অবশ্য শান্তর সেঞ্চুরি উদপাপনেও দেখা গেছে। এমনিতে আগের সব সেঞ্চুরিতে দেখা গেছে শূন্যে লাফিয়ে উদযাপন করেন তিনি।

তবে এদিন কেবল ব্যাট আর হেলমেট উঁচু করলেন, এরপর আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে দিলেন সেজদাহ। ওয়ানডেতে এই বাঁহাতি ব্যাটারের সর্বশেষ সেঞ্চুরি ছিল ২০২৪ সালে। চট্টগ্রামের এই মাঠেই ২০২৪ সালের মার্চে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১২২ রানের ইনিংস খেলেন শান্ত। ওয়ানডেতে শান্তর চার সেঞ্চুরির মধ্যে প্রথম দুটি বিদেশের মাটিতে। পরের দুটি দেশের মাটিতে। চট্টগ্রামে প্রচন্ড গরম। প্রায় ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সমুদ্রের কোল ঘেঁষে মাঠ তাই বাতাসও প্রচুর। কিন্তু তপ্ত সেই বাতাস শরীরে বাড়তি তাপ ধরিয়ে দেয়। ২২ গজে তাই টিকে থাকা কঠিন হয়ে যায়। নিউজিল্যান্ডের সাঁরাশি আক্রমণের সঙ্গে বৈশাখের দহনের লড়াইয়ে জিতে যান শান্ত।