মোঃ কায়সার হামিদ (জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার)
স্পেনের জাতীয় ফুটবল দলের জার্সিতে শোভা পাবে দুটি তারকা। ২০১০ সালের পর স্প্যানিশরা দ্বিতীয়বার ফুটবলের বিশ্বজয় করলো। অভিনন্দন স্পেন। নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি মেট লাফ স্টেডিয়ামে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্র্যান্ড ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১২০ মিনিটের লড়াইয়ের পর স্পেন হারিয়েছে ১-০ গোলে। ফলাফল দেখে মনে হবে খুব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচ ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। পুরো ম্যাচে একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার করে খেলেছে স্পেন। বলের দখল রেখেছে ৬৮ শতাংশ। অন টার্গেট শট ১১টি। আর্জেন্টিনা গোটা ম্যাচে প্রতিপক্ষের পোস্ট লক্ষ্য করে তিনটি শট নিয়েছে। লক্ষ্যে রাখতে পারে নি একটিও। স্পেনের দুটি গোল বাতিল হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে স্পেন বিশ্বজয়ের উল্লাসে ভেসেছে।
ফাইনাল ম্যাচ বিশ্লেষণ করলে স্পেনের জয়ের ন্যায্যতা নিয়ে কোন প্রশ্ন থাকার কথা না কারো। বরং আর্জেন্টিনা জিতলেই হতো অঘটন। ম্যাচের শুরু থেকে বল দখলে রেখে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের হতাশায় ডুবিয়েছে স্পেন। কুকুরেয়া বোতলবন্দী করে রেখেছিলেন মেসিকে। ঠিক যেমন সেমিতে নড়তে দেননি দেম্বেলেকে। স্টপার পাউ কুবার্সি তো টুর্নামেন্টের সেরা উদীয়মান তারকার পুরস্কার জিতে নিয়েছেন। রদ্রি, ওলমো আর রুইজদের হাতে ছিল মাঝমাঠের পুরো নিয়ন্ত্রণ । টিকিটাকা ফুটবলের অনুপম প্রদর্শনী ফের একবার দুনিয়াকে দেখিয়েছে স্পেন। যা হতাশা বাড়িয়েছে আর্জেন্টিনা শিবিরের। ফাউলের আশ্রয় নিয়েও শেষ রক্ষা হয় নি। এঞ্জো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখেছেন । কোচ স্কালোনি আর আর্জেন্টিনার ৫জন খেলোয়াড় হলুদ কার্ড পেয়েছেন। খেলার পরেও আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের চড়াও হতে দেখা গেছে স্পেনের খেলোয়াড়দের ওপর। এটা বাজে উদাহরণ হয়ে রইলো। এছাড়া টুর্নামেন্টে শতাধিক ফাউল করা একমাত্র দল আর্জেন্টিনা। কোচ স্কালোনির সামনে ইতালির ভিত্তরিও পুজ্জোর পর দ্বিতীয় কোচ হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ ছিল। পারলেন না।
পুরো টুর্নামেন্টে সবচেয়ে সুশৃঙ্খল দল হিসেবে শিরোপা জিতেছে স্পেন। ৮ খেলায় গোল হজম করেছে মাত্র ১টি। উনাই সিমন স্বাভাবিকভাবেই সেরা গোলরক্ষকের ‘গোল্ডেন গ্লোভ’ জিতেছেন। ২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ী রদ্রি পেয়েছেন ‘গোল্ডেন বল’। ফ্রান্স বিশ্বকাপে চতুর্থ হয়েছে। কিন্তু কিলিয়ান এমবাপ্পে ইতিহাস গড়েছেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম টানা দ্বিতীয় ‘গোল্ডেন-বুট’ জিতেছেন। সেই সাথে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ ২২ গোল তার নামের পাশেই রয়ে গেল।
আর্জেন্টিনার মহানায়ক মেসির কথাতে আসি। ফাইনালে খুঁজে পাওয়া যায় নি এলএম-টেনকে। তবু ৮ গোল করা মেসি টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সেরা খেলোয়াড় আর সেরা গোলদাতা। তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। এই রেকর্ড আর কারো নেই। স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালেই সম্ভবত মেসি ক্যারিয়ারের বিশ্বকাপ ম্যাচ খেললেন। ২০৩০ সালে তার বয়স হবে ৪৩। মনে হয় না দেখা যাবে তাকে পরবর্তী বিশ্বকাপে। ছয়টি বিশ্বকাপ খেলা মেসি ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। আন্তর্জাতিক , ক্লাব কিংবা ব্যক্তিগত পর্যায়ে মেসির পাওয়ার কিছু বাকী নেই।
৪৮ দলের বিশ্বকাপে ছোট দলগুলোর কেপ ভার্দের মতো ছোট দলের উত্থান চোখে পড়েছে । আবার এশিয়ার ব্যর্থতায় মন খারাপ হয়েছে। আফ্রিকাও খুব সুবিধা করতে পারে নি। মরক্কো কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গেছে। মিশর বিতর্কিতভাবে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিলেও মন কেড়েছে সবার। আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠে ল্যাটিনের মান রেখেছে। কিন্তু এটা স্পষ্ট , ফুটবল ধীরে ধীরে ইউরোপের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ছয়টি ইউরোপিয়ান দেশের উপস্থিতি সে কথাই প্রমাণ করে।
২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল প্রতিষ্ঠিত তারকাদের। লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হাল্যান্ড , হ্যারি কেইন, জুড বেলিংহ্যাম, উসমান দেম্বেলে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো তারকা খেলোয়াড়রা ব্যক্তিগতভাবে জ্বলে উঠেছিলেন। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও তিন গোল পেয়েছেন। চ্যাম্পিয়ন তো আর সবাই হয় না। তাই ব্যর্থ হলেও বড় দলের প্রতিষ্ঠিত তারকারা সফল হয়েছেন এটা দেখে ভালো লেগেছে। আবার পাউ কুবার্সি, পেড্রো পোরো, লামিনে ইয়ামাল, আর্দা গুলার, ইয়ান ডিওমান্ডে, গিলবার্তো মোরা, আয়্যুব বুয়াদ্দি আর নিকো পাজদের মতো তরুণদের পারফর্মেন্স আশা জাগিয়েছে।
চলতি বিশ্বকাপে ৩০৮টি গোল হয়েছে। ইতোপূর্বে কখনও ২০০ ছুঁতে দেখেনি বিশ্বকাপের কোন আসর। এবার দল আর খেলার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় গোলের নতুন রেকর্ড হবে জানা হবে। ২০৩০ সালে ৬৪টি দেশের বিশ্বকাপের কথা শোনা যাচ্ছে। তখন এই রেকর্ড কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, কে জানে !
লেখা বড় করছি না। দীর্ঘ চল্লিশ দিন এই কলামের মাধ্যমে ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এর পাঠকদের সাথে ছিলাম। ভবিষ্যতে কখনও সুযোগ পেলে আবার হাজির হবো। পরিশেষে ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এর সকল পাঠক আর কর্মকর্তা-কর্মীদের জানাই আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। যারা এই পথচলায় আমাকে প্রতিনিয়ত সহায়তা করেছেন। ভালোবাসা দিয়েছেন।