আজাদুর রহমান আজাদ, মৌলভীবাজার

মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি শিল্প নানা কারণে এখন বিলুপ্তির পথে। বর্তমানে এ পাটি তৈরিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন কারুশিল্পীরা। সঠিকভাবে বাজারজাত, মূলধন না থাকা, মুর্তা বেত কমে যাওয়া এবং সরকারি পৃষ্টপোষকতার অভাবে বিলুপ্তির পথে এই শিল্প। গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ ‘মুর্তা’ থেকে তৈরি হয় শীতল পাটি। কয়েক যুগ ধরে এ পাটি তৈরি করে আসছেন রাজনগর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়ন, পাঁচগাঁও ইউনিয়ন, রাজনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের নারী পুরুষ।

কিন্তু ইদানিং এই শিল্পের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেকেই। পাঁচগাঁও ইউনিয়নের ৮০ বছরের বৃদ্ধ দীগেন্দ্র দাশ বলেন, পাটি শিল্পে তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য রয়েছে। দাদা রামচরণ দাশ ও বাবা দীনেশ কুমার দাশ এ পেশায় ছিলেন। তাদের দেখে এ পেশায় জড়ান তিনি। তিনি বলেন, একটি পাটি তৈরি করতে দুই থেকে আড়াই মাস সময় লাগে।

নকশা ছাড়া একটি পাটি চার থেকে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। তবে অর্ডার দিয়ে মসজিদ, মন্দির, মিনার কিংবা ব্যক্তির নাম দিয়ে তৈরি করলে দাম পড়ে ২৫ হাজার টাকা। তিনি আরও বলেন, সরকার থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতাও পাই না। যার কারণে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে।

একই ইউনিয়নের তুলাপুর গ্রামের গীতেশ চন্দ্র দাশ বলেন, বিভিন্ন রঙের নামের পাটির মধ্যে রয়েছে সাদা পাটি, গুছি রঙ্গা পাটি, আসমান তারা, চৌদ্দ ফুল, কমল গুশ পাটিসহ হরেক রকম পাটি। এছাড়াও এখন মুর্তার বেত দিয়ে তৈরি করছেন কলমধানি, ভ্যানিটিব্যাগ, কোর্ট ফাইল, মানিব্যাগ, ওয়ালম্যাট ও জায়নামাজ। তিনি আরও বলেন, সরকার থেকে কোনো সুযোগ সুবিধা পাননি। শুধু ইউনেস্কোর সম্মেলনে যেতে খরচ দিয়েছিল।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপে ‘ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ (আইসিএইচ) ইউনেস্কোর ১২তম অধিবেশনে বিশ্বের নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (দি ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি) হিসেবে রাজনগরের শীতল পাটিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

গত সেপ্টেম্বরে উপজেলা পরিষদের আয়োজনে ১০ দিনের একটি প্রশিক্ষণেও অংশ নেন সত্যরঞ্জন। রাজনগর উপজেলায় শীতলপাটি শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা শীর্ষক কর্মশালা ও নকশা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে গত সোমবার। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপুল সিকদার। সভাপতিত্ব করেন মো: নাসিব ইসলাম অভি কনজারভেশন অফিসার, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। সূচনা বক্তব্য রাখেন মো: মনিরুজ্জামান উপস্থাপক ও গাইড লেকচারার, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। বক্তব্য রাখেন রাজনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এনামুল হক চৌধুরী, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্বাস আলী, প্রেসক্লাব সভাপতি আউয়াল কালাম বেগ ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান সোহেল। রেজাউল ইসলাম সিমান্তিকের জেলা টিম লিডার শীতলপাটি শিল্পী রমা দাস ও কারুশিল্পী প্রমেস দাস প্রমুখ।

দিনব্যাপী কর্মশালায় বক্তারা বলেন, শীতলপাটি বাংলাদেশের একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প, যা মূলত মুর্তা বেত দিয়ে তৈরি হয়। ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেলেও কাঁচামালের সংকট, পুঁজির অভাব, প্লাস্টিকের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং ন্যায্যমূল্যের অভাবে এ শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। এই শীতলপাটি শিল্পকে পুনরুদ্ধার করতে পরিবেশবান্ধব এ পণ্যের বিশ্বজোড়া চাহিদা ও এর নান্দনিক ব্যবহারের মাধ্যমে একে লাভজনক রপ্তানি পণ্য হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এছাড়া কারুশিল্পীদের মাসিক প্রণোদনা বা ভাতার ব্যবস্থা করা, মুর্তা বেতের উৎপাদন বৃদ্ধি, নার্সারিতে মুর্তা বেতের চারা বিতরণ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি এবং নতুন প্রজন্মকে শীতলপাটি বুননে উদ্বুদ্ধ করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়।