বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বহুমাত্রিক খাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পৃক্ততা আরও জোরদার করতে পার্টনারশিপ অ্যান্ড কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (পিসিএ) স্বাক্ষর করেছে। এরমধ্যদিয়ে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সম্পর্ক উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে রাজনৈতিক অংশীদারত্বে উত্তরণ ঘটতে যাচ্ছে। অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি (পিসিএ) প্রাথমিক স্বাক্ষরের (ইনিশিয়াল সাইনিং) মধ্য দিয়ে এই উত্তরণের পথে এক ধাপ এগিয়ে যাবে দুই পক্ষ। এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে ইইউর পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতি-বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি এবং ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট কায়া কাল্লাসের বৈঠক করেন। বৈঠকের পর চুক্তির প্রাথমিক স্বাক্ষর হয়। ব্রাসেলসের একটি কূটনৈতিক সূত্র এই প্রতিবেদককে জানিয়েছে, ইংরেজিতে পিসিএ প্রাথমিক স্বাক্ষরের পর তা ইউরোপের ২৪টি ভাষায় অনূদিত হবে। এরপর ইইউর ২৭টি দেশ চুক্তিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে। অনুমোদনের পর চূড়ান্তভাবে সই হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চুক্তিটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের মাধ্যমে তা সইয়ের জন্য চূড়ান্ত হবে। ঢাকার কূটনৈতিক সূত্র বলছে, আশা করা হচ্ছে, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে সইয়ের পর তার বাস্তবায়ন শুরু হবে।
গতকাল সোমবার ব্রাসেলসে ইইউ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব ও পশ্চিম) ড. মো. নজরুল ইসলাম এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিষয়ক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পওলা পামপালোনি নিজ নিজ পক্ষ থেকে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং ইউরোপীয় কমিশনের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি ও ভাইস-প্রেসিডেন্ট কায়া কালাস উপস্থিত ছিলেন। এই পিসিএ বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য একটি কাঠামোবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঢাকা ও ব্রাসেলসের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, এক বছরের বেশি সময় ধরে পাঁচ দফা আলোচনা শেষে দুই পক্ষ ৮৩টি ধারাসংবলিত পিসিএর খসড়া চূড়ান্ত করে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশই এ চুক্তিতে সই করে।
পিসিএ কী? : ২০০১ সালে ইইউর সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি সই করে বাংলাদেশ। চুক্তিটি ছিল মূলত উন্নয়ন সহযোগিতাকেন্দ্রিক। চুক্তিটিতে অর্থনীতি, উন্নয়ন, সুশাসন ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখন ইইউর সঙ্গে পিসিএ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ইইউর ওয়েবসাইটে প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, পিসিএ হলো আইনগত বাধ্যতামূলক চুক্তি। এ চুক্তি ইইউ ও অংশীদার দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি রূপরেখা প্রতিষ্ঠা করে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ইইউর প্রস্তাবিত পিসিএর আওতায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার, সংযুক্তি, প্রতিরক্ষা, ইন্টারনেট নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি, মৎস্য, দক্ষ অভিবাসন, কৃষিসহ প্রায় ৩৫টি খাত রয়েছে। অর্থাৎ এই সহযোগিতার পরিধিতে রয়েছে গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সমর্থন করা। একটি শক্তিশালী মুক্তবাজার অর্থনীতিসহ ব্যবসা ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সহায়ক পরিবেশের বিকাশ নিশ্চিত করা। নানা ক্ষেত্রে বাণিজ্য সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদার করা। পিসিএ সই হলে ইইউর সঙ্গে বাংলাদেশের যে সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে, তা আর কার্যকর থাকবে না। ভবিষ্যতে এই চুক্তির আলোকেই রাজনৈতিক অংশীদারত্ব এগিয়ে যাবে। এই অংশীদারত্বের সুফল নিশ্চিত করতে হলে বাংলাদেশকে প্রতিটি খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করে সমন্বিত প্রক্রিয়ায় চুক্তি বাস্তবায়নে সচেষ্ট হতে হবে।
রাজনৈতিক উত্তরণের অভিপ্রায়: বাংলাদেশ-ইইউর মধ্যে সম্পর্কের পরিসর বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবরে দুই পক্ষের মধ্যে পিসিএর বিষয়ে আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির প্রথম দফার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে বাংলাদেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় তখন পিসিএ নিয়ে আলোচনা স্থগিত করে ইইউ। পরবর্তী সময়ে ইইউ অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে পিসিএ সইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ঢাকায় অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছিল। এখন বিএনপির নতুন সরকারের সময় পিসিএ স্বাক্ষর হলো। ঢাকা ও ব্রাসেলসের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, চুক্তিটি হলে বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্ক উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে রাজনৈতিক অংশীদারত্বে উত্তরণের পথে এক ধাপ অগ্রগতি হবে।
পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পিসিএ সই বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে বলে মনে করেন সাবেক কূটনৈতিকরা। তারা বলেন, ভবিষ্যতে এই চুক্তির আলোকেই রাজনৈতিক অংশীদারত্ব এগিয়ে যাবে। এই অংশীদারত্বের সুফল নিশ্চিত করতে হলে বাংলাদেশকে প্রতিটি খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করে সমন্বিত প্রক্রিয়ায় চুক্তি বাস্তবায়নে সচেষ্ট হতে হবে।