জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাস ভাড়া বাড়ানোর আলোচনার মধ্যেই রাজধানীর অনেক গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ঘোষণা ছাড়া ভাড়া বাড়ানোর কারণে বাসে বাসে হচ্ছে তর্কবিতর্ক। হেলপার-চালকরা বলছেন, জ্বালানি তেল বাড়তি দামে কিনছেন, এ কারণেই ভাড়া বাড়িয়েছেন। তবে যাত্রীদের অভিযোগ, গণপরিবহনগুলো ঘোষণার আগেই নিজেদের মতো ভাড়া বাড়িয়েছেন। এদিকে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর রাজধানীর সড়কে গণপরিবহনের সংকট দেখা দিয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বাস পাচ্ছেন না যাত্রীরা। এতে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবীসহ সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
গতকাল সোমবার সকাল থেকে বিভিন্ন গন্তব্যের প্রত্যেক স্টপেজ হিসেবে সর্বনি¤œ ৫ টাকা বেশি ভাড়া আদায় করা হতে দেখা গেছে। এ হিসেবে দীর্ঘ যাত্রায় গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। তবে কিছু কিছু গণপরিবহন এখনো সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। তারা ভাড়াও নিচ্ছেন আগের মতোই। কাকরাইল থেকে শাহবাগ পর্যন্ত এতদিন ১৫ টাকা করে ভাড়া আদায় করত রমযান নামের বাস। কিন্তু সোমবার সকাল থেকেই এই পথের ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০ টাকা। দুপুরে মৎস ভবন মোড়ে ভাড়া আদায়ের সময় রমযান পরিবহনের যাত্রীদের সঙ্গে তর্কাতর্কিও হয়। কাকরাইল থেকে আসা একজন যাত্রীর কাছ থেকে মৎস ভবন পর্যন্ত ২০ টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে ওই তর্কাতর্কি হয়। কামাল হোসেন নামের এক যাত্রী বলেন, এতদিন ১৫ টাকা ভাড়া নিতো। এখন ২০ টাকা চাচ্ছে। তাও চেকিং নামে আমাদের পকেট কাটা হচ্ছে। মহসিন নামের আরেক যাত্রী বলেন, কাকরাইল থেকে মৎস ভবন ৫ টাকা ভাড়া হতে পারে। তারপরও সর্বনি¤œ ভাড়া হিসেবে ১০ টাকা নিতে পারে। কিন্তু চেকিংয়ের উসিলায় তারা ১৫ টাকা নিতো, আজ ২০ টাকা চাচ্ছে। এটা ডাকাতি ছাড়া কিছুই নয়। এদিকে, আজমেরি পরিবহন এতদিন মালিবাগ থেকে মহাখালী ভাড়া নিতো ১০/১৫ টাকা। কিন্তু এদিন সকাল থেকে ভাড়া নিচ্ছে ২০ টাকা। ৫ টাকা বাড়িয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে একই গন্তব্যের বলাকা পরিবহনও।
জানা গেছে, রাজধানীর অধিকাংশ গণপরিবহনই ঘোষণার আগেই ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। তবে কোনো কোনো গণপরিবহন আগের মতোই ভাড়া নিচ্ছে। এরমধ্য রয়েছে গুলিস্তান-শাহবাগ-উত্তরা রুটের এয়ারপোর্ট পরিবহন। গণপরিবহনটি শাহবাগ থেকে মহাখালী/বনানী ভাড়া ২০ টাকা আদায় করা হয়। সোমবারও গণপরিবহনটি একই ভাড়াই নিচ্ছে। এয়ারপোর্ট পরিবহনের হেলপার জুয়েল বলেন, আমরা ভাড়া বাড়াইনি। সরকারের ঘোষণার পর বাড়াবো। একই কথা জানিয়েছে মিরপুর রুটের শেকড় পরিবহনও। বিআরটিসির বাসগুলোও আগের ভাড়া আদায় করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সংকটে গত শনিবার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। ওইদিন রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণা করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এতে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা ও পেট্রলের দাম ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম গতকাল রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর তৎপরতা শুরু করে মালিকরা। দাম বাড়ার প্রথমদিনই রোববার রাতে পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে বসে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। বৈঠকে মালিকপক্ষের বাড়া বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা শেষে এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলে ওই সময় সরকারি সিদ্ধান্তে পরিবহন ভাড়াও বাড়ানো হয়। ওই সময় দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ২.২০ টাকা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২.৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এছাড়া সর্বনি¤œ ভাড়া বাসে ১০ টাকা এবং মিনিবাসে ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর নানা অজুহাতে পরিবহন মালিকরা বিভিন্ন সময় ভাড়া বাড়ানোর তৎপরতা চালিয়েছিল। কিন্ত আর ভাড়া বাড়ায়নি সরকার।
এদিকে গতকাল সোমবার সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। ফার্মগেট, শাহবাগ, গুলিস্তান, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী ও মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা যায় যাত্রীদের। অনেকেই সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেননি। গণপরিবহন না পেয়ে কেউ কেউ বাধ্য হয়ে রিকশা, সিএনজি বা রাইড শেয়ারিং সেবা ব্যবহার করছেন। এতে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে বাসের অপেক্ষায় থাকা নূর মোহাম্মদ বলেন, সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কোনো বাস পাইনি। সড়কে গণপরিবহন নেই বললেই চলে। সাভার যাব কীভাবে, তা বুঝতে পারছি না। সিএনজি গাবতলী পর্যন্ত যেতে চায়, ভাড়া চাচ্ছে ৩৫০ টাকা। গণপরিবহন না থাকায় অন্য যানবাহনগুলোও ইচ্ছামতো ভাড়া নিচ্ছে। ধানমন্ডি থেকে পল্টনগামী যাত্রী রিফাত হাবীবের অভিযোগ, বাসমালিকরা তেলের দাম বৃদ্ধির সুযোগে ভাড়া বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, সড়কে বাস কম, যেগুলো চলছে সেগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া হচ্ছে। অনেক বাস থামছে না, আবার কিছু বাস বেশি ভাড়া দাবি করছে। মোহাম্মদপুর-ধানমন্ডি রুটে চলাচলকারী একটি বাসের শ্রমিক ওবায়দুল বলেন, তেলের দাম বাড়ায় অনেক বাস রাস্তায় নামছে না। মালিকরা ভাড়া বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। খরচ সামাল দিতে আমরা ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি নিচ্ছি।
গুলিস্তান-সাভার রুটের এক পরিবহন শ্রমিক তুরুজ মিয়া বলেন, তেলের দাম বাড়ার কারণে খরচ ওঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। মালিকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভাড়া কিছুটা বাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পরিবহনমালিক বলেন, তেলের দাম বৃদ্ধির পর মালিকদের বৈঠকে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। কেউ ভাড়া না বাড়ালে ওই রুটে বাস চালাতে না দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।