টিকা-ই হাম প্রতিরোধে নিরাপদ ও কার্যকর --- বলছে ইউনিসেফ

হাম ও হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশে আরও সাত শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে এক শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল। হামের উপসর্গ ছিল ছয় শিশুর। এ সময়ে সারা দেশে আরও ১ হাজার ৩৬৩ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। হাম শনাক্ত হয়ে শিশুটি ঢাকায় মারা গেছে। আর হামের উপসর্গে ঢাকায় চার, চট্টগ্রামে এক ও ময়মনসিংহে এক শিশু মারা গেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম বিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ৩৬৯ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৭০ শিশু। মোট ৪৩৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৫৪ হাজার ৪১৯ শিশুর। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৯ হাজার ১৬০ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে ৩৪ হাজার ৯৬৮ শিশু। গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে ৭ হাজার ৩০৫ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে হাম ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় শিশুরা বড় ঝুঁকির মুখে পড়ছে। অত্যন্ত সংক্রামক এই ভাইরাস ছোট শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের টিকা নিরাপদ ও কার্যকর। শিশুদের এই রোগ থেকে রক্ষা এবং সংক্রমণ ছড়ানো ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। অনেক শিশু হাম থেকে বেঁচে গেলেও তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য জটিলতা বা স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি হতে পারে।

গুরুতর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া, অন্ধত্ব এবং মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস দেখা দিতে পারে। এছাড়া হাম শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়, ফলে পরে অন্য সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ইমিউনিটি অ্যামনেশিয়া বলা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপুষ্টিতে ভোগা এবং পাঁচ বছরের নিচে টিকা না পাওয়া শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। হাম একটি বায়ুবাহিত ভাইরাস। আক্রান্ত ব্যক্তি শ্বাস নেওয়া, কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে সহজেই এটি ছড়াতে পারে। ভাইরাস বাতাস ও বিভিন্ন পৃষ্ঠে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্ত ব্যক্তি শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার চার দিন আগেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারেন। আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে এলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকা প্রায় ৯০ শতাংশ আক্রান্ত হতে পারেন।

ইউনিসেফ বলছে, হাম প্রতিরোধে টিকার বিকল্প নেই। হামের টিকার দুই ডোজ আজীবনের জন্য প্রায় ৯৯ শতাংশ সুরক্ষা দেয়। ১৯৭৪ সাল থেকে হামের টিকা প্রায় ৯ কোটি ৪০ লাখ মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এটি সবচেয়ে বেশি জীবন রক্ষা করা টিকাগুলোর একটি। তবে এখনও বিশ্বের বহু শিশু টিকার বাইরে রয়ে গেছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিশুরাই সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম এত দ্রুত ছড়ায় যে এটি ঠেকাতে কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ শিশুর দুই ডোজ টিকা নিশ্চিত করতে হয়।

কিন্তু বর্তমানে বিশ্বে প্রথম ডোজ টিকা গ্রহণের হার ৮৪ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের হার মাত্র ৭৬ শতাংশ। ফলে বড় সংখ্যক শিশু এখনও সুরক্ষার বাইরে রয়েছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ও গণটিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।