• অর্ধশতকের সংকট, পাহাড় কেটে পাকা ঘর নির্মাণ ও পরিবেশ ঝুঁকি বাড়ছে
  • গত ১০ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে এসেছেন ২ ডজন বিশ্বনেতা তারপরও সমাধান হয়নি

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সামরিক জান্তার নির্মম গণহত্যার মুখে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা। পূর্বের অনুপ্রবেশকারীসহ বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ ও নোয়াখালীর ভাসানচরে অবস্থানরত নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা জনসংখ্যা সাড়ে ১১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। তারওপরে প্রতিবছর ক্যাম্পে ৩০ হাজার নতুন শিশু জন্ম গ্রহণ করছে। গত ৯ বছরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহু আলোচনা, নিরাপত্তা পরিষদের উচ্চবাচ্য এবং চীনের মধ্যস্থতায় একাধিক ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হলেও বাস্তবে আজ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও নিজ ভিটামাটিতে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। বর্তমানে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সামরিক জান্তা সরকারের রাখাইনে প্রায় কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। বাংলাদেশের সঙ্গে প্রায় সম্পূর্ণ সীমান্তসহ রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা এখন সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি-র নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই অবস্থায় প্রত্যাবাসন আদো হয় কিনা তা নিয়ে কূটনৈতিক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের সন্দেহ রয়েছে। কারণ রোহিঙ্গাদের মূল দাবি; তাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব, ভিটা-মাটির মালিকানা এবং আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মিয়ানমার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট লিখিত বা আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি দেওয়া হয়নি। যদিও গত বছরগুলোতে চীন ও জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে যাচাই-বাছাই করে ‘পাইলট প্রজেক্ট’-এর আওতায় ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের সুনির্দিষ্ট আশ্বাস না থাকায় রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় যেতে রাজি হয়নি। গত ১০ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে এসেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তায়্যিপ এরদোয়ান ও স্ত্রী আমিনে এরদোয়ান, যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বোরিস জনসন, ব্রিটেনের রাজকুমারী সোফিসহ প্রায় ২ ডজন বিশ্ব নেতৃবৃন্দ। তারপরও রোহিঙ্গা সমস্যার কোনো সমাধান আসেনি। কিন্তু ইতিহাস ও বাস্তবতার নির্মম সত্য হলো, দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছরের ব্যবধানে এই অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরগুলোই এখন বাস্তবে স্থায়ী বসতিতে পরিণত হতে চলেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এইসব তথ্য জানাযায়।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, জাতিসংঘ ও মানবিক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক অনুদান অব্যাহতভাবে হ্রাস পাওয়া, মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ তীব্র হওয়া এবং রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ বদলে যাওয়ার মধ্যে এই সংকট এখন এক চরম জটিল মোড়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাহীনতা ও স্থায়ী আবাসন তৈরির অভিযোগ, অন্যদিকে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নতুন নীতিগত সিদ্ধান্তÍসব মিলিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। এদিকে দীর্ঘদিনের এই প্রশাসনিক ও ভূরাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকার একটি বড় নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, গত ১২ জুলাই উচ্চপর্যায়ের একটি ১১ সদস্যের ‘রোহিঙ্গাবিষয়ক জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়েছে।

সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গা সংকট তীব্র হওয়ার পর থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি (আগস্ট) সময় পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিভিন্ন দাতা দেশের কাছ থেকে মোট প্রায় ৫.৪২ বিলিয়ন (৫৪২ কোটি) মার্কিন ডলার অনুদান হিসেবে এসেছে। ১ ডলার = ১২০ টাকা ধরে হিসাব করলে এই অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬৫,০০০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বড় একক দাতা রাষ্ট্র হলো যুক্তরাষ্ট্র (মোট তহবিলের অর্ধেকেরও বেশি বা ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি যোগান দিয়েছে)। এছাড়া যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন মূল অবদান রাখছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা’র সাধারণ সম্পাদক আলমগীর করিব বলেন, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ঘেরা সীমান্ত এলাকাগুলোতে দূর থেকে তাকালে বাঁশ, ত্রিপল আর প্লাস্টিকের এক বিশাল শহর চোখে পড়ে। কিন্তু এই অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোর ভেতরের দৃশ্যপট এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এক সময়ের জরুরি আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে এখন ইট, সিমেন্ট আর লোহা দিয়ে স্থায়ী ও আধা-স্থায়ী কাঠামো নির্মাণের গুরুতর অভিযোগ সামনে আসছে। পাহাড় কেটে বনাঞ্চল ধ্বংসের পাশাপাশি এই ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ স্থানীয় পরিবেশ এবং জাতীয় নিরাপত্তায় নতুন করে বড় ধরনের উদ্বেগ ও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চাপ এই জেলা নিতে পারবে কিনা সেটা নিয়ে পরিবেশ কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কক্সবাজারের পরিবেশ, বন, পাহাড় রক্ষায় সরকারের সংশ্লিষ্টদের কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সম্প্রতি সরেজমিনে ও সীমান্ত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। নিরাপত্তার খাতিরে এবং প্রত্যাবাসনের পথ সুগম রাখতে বাংলাদেশ সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে; ক্যাম্পগুলোতে কেবল বাঁশ, ত্রিপল বা সাময়িক ব্যবহারের সামগ্রী দিয়ে অস্থায়ী ঘর তৈরি করা যাবে। কোনো ধরনের ইট, লোহা বা রড-সিমেন্ট ব্যবহার করে স্থায়ী বা আধা-স্থায়ী কাঠামো তৈরি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। স্থানীয় বাংলাদেশি অধিবাসীদের মধ্যে এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, কারণ এটি কেবল স্থানীয় পরিবেশ ও জনমিতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং কক্সবাজারের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাকে এক চরম ঝুঁকিতে ফেলছে।

জার্মানির বন আন্তর্জাতিক সংঘাত গবেষণা কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ গবেষক ডক্টর বেঞ্জামিন এটজল্ড এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডক্টর আনাস আনসার তাঁদের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন; ‘রোহিঙ্গা সংকটের জন্য কেন একটি নতুন রাজনৈতিক কল্পনার প্রয়োজন’-এ সংকটটির গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর বিশ্লেষণ করেছেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের প্রথম গণপলায়নের পর কক্সবাজার জেলায় অত্যন্ত সীমিত পরিসরে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিক শরণার্থী শিবিরগুলো নির্মিত হয়। আর ২০১৭ সালের আগস্টের অভূতপূর্ব মানবিক বিপর্যয়ের পর এই শিবিরগুলো দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে বিশ্বে একক কোনো স্থানে গড়ে ওঠা সবচেয়ে বড় শরণার্থী এলাকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পর্যায়ক্রমে ক্যাম্পগুলোর ভেতরে রাস্তাঘাট, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্থায়ী বাজার এবং বিস্তৃত পরিষেবা নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ফলে ক্যাম্পগুলো একটি জটিল ও পূর্ণাঙ্গ নগর পরিসরে রূপান্তরিত হয়েছে, যা কক্সবাজারের স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান মতে, মিয়ানমার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই জনগোষ্ঠীকে তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে চায় না এবং ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় নিয়ে তাদের কূটনৈতিক অজুহাত রয়েছে। বাংলাদেশের উচিত ছিল আইনি ও আন্তর্জাতিক নথিতে এই জনগোষ্ঠীকে স্পষ্টত ‘মিয়ানমারের শরণার্থী’ বা ‘মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত নাগরিক’ বলে চিহ্নিত করা।” শরণার্থী সমস্যা নিঃসন্দেহে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু নিরাপত্তা কেবল এর একটি অংশ। এর মূল ভিত্তি হলো দ্বি-পাক্ষিক কূটনীতি এবং বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক।

অস্থায়ী শিবিরে স্থায়ী আবাসন; রাখাইনের নতুন বাস্তবতায় কত দূর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন? এই বিষয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল ইসলাম বলেন, অস্থায়ী শিবিরগুলো যেন স্থায়ী আশ্রয়ে পরিণত হয়ে বাংলাদেশের ভৌগোলিক, সামাজিক ও পরিবেশগত কাঠামোর জন্য চিরস্থায়ী সমস্যা তৈরি না করে; তা সুনিশ্চিত করার এখনই উপযুক্ত সময়। জাতীয় নিরাপত্তার কঠোর বলয় রক্ষা করে, আন্তর্জাতিক আইনের ওপর ভিত্তি করে এবং আঞ্চলিক নতুন শক্তিগুলোর সঙ্গে বাস্তবসম্মত ও বুদ্ধিদীপ্ত কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমেই বাংলাদেশ কেবল এই অর্ধশতকের ভারী বোঝা থেকে নিজের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। এবং রোহিঙ্গাদের নিজদেশে প্রত্যাবাসনই স্থায়ী সমাধান। এই বিষয়ে সরকারের আরও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের আলোকেই বাংলাদেশকে তার পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করতে হবে। কেবল একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে না দেখে বিশ্বমঞ্চে এই মানবিক সংকটকে পুনরায় নতুন শক্তিতে তুলে ধরতে হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই ও স্থায়ী সমাধান হলো তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সম্মানজনক, নিরাপদ ও স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন। সাময়িক সহায়তা দিয়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘকাল ধরে রাখাকে বাংলাদেশ নীতিগতভাবে সমর্থন করে না। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সংকট ও নানা ভৌগোলিক সংঘাতের কারণে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার আন্তর্জাতিক ফান্ড আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দায় এড়ানোর সুযোগ না দিয়ে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার ওপরই মূল জোর দিতে হবে।