• মিয়ানমার ও ভারত অনুসন্ধান চালিয়ে সফল
  • দেশে ‘রোড শো’ করবে জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা
  • ১ জুন থেকে দরপত্র বিক্রি শুরু

মিয়ানমারের সাথে ২০১২ সালে এবং ভারতে সাথে ২০১৪ সালে সমুদ্রবিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ সমুদ্রসম্পদ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়। জ¦ালানির তীব্র সংকট থাকা সত্ত্বেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকার নানা ধরনের ছলছুতায় সমুদ্রে তেল গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম চালু করতে পারেনি।

অথচ সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর মিয়ানমার ২০১৩ সালে তাদের সমুদ্রসীমায় গ্যাস উত্তোলন শুরু করে। বাংলাদেশের পানিসীমার একেবারে নিকটবর্তী তাদের ‘মিয়া’ ও ‘শোয়ে’ গ্যাসকূপ থেকে তারা এরই মধ্যে কয়েক ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করেছে। এই গ্যাস উত্তোলনের পর স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে চীনেও রপ্তানি করা হচ্ছে। ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের রায়ের পর, ভারত তাদের অংশে তেল-গ্যাসের বড় মজুত আবিষ্কারে সাফল্য পেয়েছে।

তবে এবার বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার প্রথমবারের মতো সাগরের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে। কাল রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে দরপত্র আহ্বান করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেনপেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব । এছাড়া এবিষয়ে গণমাধ্যমকে জানাতে রোববার দুপুরে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকেছে জ¦ালানি মন্ত্রণালয়।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ৭ মে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৬’ নীতিমালার খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেয় অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। ক্রমবর্ধমান এলএনজি আমদানি ব্যয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্ব দিয়ে সরকার সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে এ নতুন কাঠামো গ্রহণ করে বলে জানান পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা।

নতুন পিএসসি অনুযায়ী, গভীর সমুদ্রের গ্যাস উৎপাদনে তিন মাসের গড় ব্রেন্ট মূল্যের ১১ শতাংশ দেওয়া হবে (ফ্লোর মূল্য ৭০ ডলার, সর্বোচ্চ ১০০ ডলার), অগভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে ১০.৫ শতাংশ, স্থলভাগে উৎপাদিত গ্যাসের ক্ষেত্রে অবস্থানভেদে ৮-৮.৫ শতাংশ।

জানা গেছে, ঢাকঢোল পিটিয়ে বিগত আওয়ামী সরকার সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে (অফশোর) তৈরি করেছিল উৎপাদন অংশীদার চুক্তি (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট-পিএসসি)। তখন ঢালাওভাবে বলা হয়েছিল, প্রায় ১৭টি বড় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোম্পানি কিনেছে পিএসসি। এর ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর আহ্বান করা হয় দরপত্র। কিন্তু ওই পিএসসির আওতায় কোনো বিদেশি কোম্পানিই আগ্রহ দেখায়নি অনুসন্ধান কার্যক্রমে। দরপত্র জমা দেয়নি একটি কোম্পানিও। বলা যায়, এতদিন কার্যত স্থবির ছিল সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের পুরো প্রক্রিয়া। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার ৩ মাসের মাথায় দ্বার খুলছে সমুদ্রে তেল-গ্যাসে অনুসন্ধানের।

জানা গেছে, পেট্রোবাংলা অতীতের ভুলত্রুটি বিবেচনা করেছে এবারের দরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে। বিদেশিদের আকৃষ্ট করতে একগুচ্ছ সুবিধা নিশ্চিত করেছে। এখানে সরকার ও বিনিয়োগকারীর স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রেখে যোগ্য ও অভিজ্ঞ কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

সূত্রমতে, পেট্রোবাংলা দেশের সমুদ্র এলাকায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর (আইওসি) কাছে দরপত্র আহ্বানের জন্য যে ডকুমেন্ট তৈরি করেছে, তাতে ২৬টি অফশোর ব্লক অনুসন্ধানের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে এসএস ১ থেকে এসএস ১১ পর্যন্ত ১১টি অগভীর সমুদ্র ব্লক। অন্যদিকে ডিএস ৮ থেকে ডিএস ২২ পর্যন্ত মোট ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক রয়েছে। দরপ্রস্তাব আহ্বান করা হবে এসব ব্লকগুলোতে।

এবারের দরপত্রে বিদেশি কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (এমপিএসসি) ২০২৬’-এ বেশ কিছু সংশোধন আনা হয়েছে। ইতোমধ্যে এ মডেলের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

সূত্র বলছে, দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এককভাবে অথবা যৌথ উদ্যোগে এক বা একাধিক ব্লকের জন্য আবেদন করতে পারবে। নির্বাচিত কোম্পানির সঙ্গে অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট (এমপিএসসি) ২০২৬ অনুযায়ী চুক্তি সই করা হবে।

সূত্র জানায়, এবার একটি টেন্ডার শিডিউল কিনেই একাধিক ব্লকে অংশগ্রহণ করার সুযোগ থাকছে। তবে প্রতিটি অগভীর সমুদ্র ব্লক এবং প্রতিটি গভীর সমুদ্র ব্লকের জন্য আলাদা আবেদন জমা দিতে হবে। এ ছাড়া পরস্পরসংলগ্ন দুটি গভীর সমুদ্র ব্লকের জন্য একটি একক চুক্তির আওতায় আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

নীতিমালার খসড়া অনুযায়ী জানা যায়, ঠিকাদার কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফা সম্পূর্ণভাবে দেশে নিতে পারবে। এ ছাড়া কোনো ধরনের সিগনেচার বোনাস বা রয়্যালটি দিতে হবে না। গ্যাসের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। তবে এ ক্ষেত্রে গত পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গড় ব্রেন্ট মূল্যের ভিত্তিতে একটি ফ্লোর ও সিলিং মূল্য নির্ধারণ করা হবে। তেলের মূল্য দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রচলিত ন্যায্য বাজারমূল্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। এ ছাড়া অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উৎপাদন পর্যায়ে আমদানি করা যন্ত্রপাতি ও মেশিনারির ওপর শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হবে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের করপোরেট আয়কর পরিশোধ করবে পেট্রোবাংলা।

দরপত্রে অংশগ্রহণের যোগ্যতা হিসেবে বলা হয়েছে, আগ্রহী কোম্পানিকে অন্তত একটি অফশোর ব্লকের অপারেটর হতে হবে এবং প্রতিদিন ন্যূনতম ১০ হাজার ব্যারেল তেল বা ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস উৎপাদনের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

চুক্তিতে স্বার্থ হস্তান্তর ও শেয়ার ট্রান্সফারের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি অগভীর ও গভীর সমুদ্রÑ উভয় ব্লকের জন্য শতভাগ কস্ট রিকভারি সুবিধা থাকবে, যদিও বছরে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কস্ট রিকভারি করা যাবে।

বাধ্যতামূলক কর্মসূচি হিসেবে শুধু টু-ডি সিসমিক জরিপ সীমিত রাখা হয়েছে। তবে দরদাতাদের অতিরিক্ত কাজের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। এ ছাড়া কোনো ব্লকের জন্য বিদ্যমান টু-ডি মাল্টিক্লায়েন্ট সিসমিক ডাটা কিনলে বাধ্যতামূলক কাজের পরিমাণ আনুপাতিক হারে কমানোর সুযোগ থাকবে।

প্রথম অনুসন্ধান কূপ শুকনো বা বাণিজ্যিকভাবে অকার্যকর হলে দ্বিতীয় বা পরবর্তী কূপে ঠিকাদার কোম্পানিকে বেশি মুনাফার ভাগ দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ন্যূনতম অনুসন্ধান কর্মসূচি বাস্তবায়নে চুক্তি স্বাক্ষরের পর নির্ধারিত ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দিতে হবে। এ ছাড়া পেট্রোবাংলার ‘রাইট অব ফার্স্ট রিফিউজাল’ বজায় রেখে ঠিকাদার কোম্পানি তাদের গ্যাসের অংশ তৃতীয় পক্ষের কাছে দেশীয় বাজারে বিক্রি করতে পারবে। একই শর্তে গ্যাস রপ্তানির সুযোগও রাখা হয়েছে। অগভীর সমুদ্র ব্লকের ক্ষেত্রে বাপেক্সকে ১০ শতাংশ ‘ক্যারিড ইন্টারেস্ট’ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। তবে সরকার প্রয়োজন হলে কোনো সফল দরদাতাকে সীমিতসংখ্যক ব্লক বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষমতা সংরক্ষণ করবে।

জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তুতি শেষ। দরপত্র আহ্বানের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। দেশি-বিদেশি পত্রিকায় এ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর দেশে ‘রোড শো’ করবে জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, এবারের দরপত্র আগের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় করা হয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসের ট্যারিফ, পাইপলাইন নির্মাণব্যয়, তথ্য-উপাত্তের দাম কমানো, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে অংশগ্রহণ বিষয়ে সংশোধন আনা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক দরপত্রে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আকৃষ্ট করা। এবার দরপত্র আহ্বানের পাশাপাশি রোড শো, বিদেশি দূতাবাসগুলোকে চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করি পিএসসিতে যেসব সংশোধন আনা হয়েছে, তাতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ভালো ফলাফল মিলবে। জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ১ জুন থেকে প্রমোশনাল প্যাকেজ বিক্রি শুরু হবে। এ দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা থাকবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত।