একই শরীরে দুটি জীবন। বুক থেকে পেট পর্যন্ত জোড়া লাগানো যমজ কন্যাশিশু জয়নব ও উম্মে কুলসুমের প্রতিটি নিশ্বাস, প্রতিটি নড়াচড়া একে অপরের সঙ্গে বাঁধা। একজন কাঁদলে অন্যজনও কেঁদে ওঠে, একজন নড়লে অন্যজনও ব্যথায় কুঁকড়ে যায়। কোলে নিতে হলেও দুজনকে একই সঙ্গে নিতে হয়। ৩ মাসের এমন দুটি জোড়া লাগানো যমজ সন্তান নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে পরিবার।
আধুনিক চিকিৎসা বলছে, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের আলাদা করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনার পথে এখন সবচেয়ে বড় বাধা দারিদ্র্য। দারিদ্র্যের কাছে হার মানছে সেই চিকিৎসা, চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে তাদের ভবিষ্যৎ।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের বিলগাথুয়া মধ্যপাড়া গ্রামের নাহিদ হাসান (২৬) ও সানজিদা ইয়াছমিন মুক্তা (২২) দম্পতির ঘরে গত ৪ মে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেয় বিরল এই জোড়া লাগানো যমজ কন্যাশিশু।
সন্তান জন্মের আনন্দ অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ওই সময় চিকিৎসকেরা জানালেন, দুটি ফুটফুটে সুন্দর বাচ্চা হয়েছে, কিন্তু তারা একসাথে জোড়া লাগানো।
শিশু দুটিকে আলাদা করতে একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিয়মিত চিকিৎসা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান প্রয়োজন। জন্মের তিন মাস পূর্ণ হলে আবার ঢাকায় নিয়ে আসতে বলা হলেও চরম আর্থিক সংকটের কারণে নির্ধারিত সময়ে তাদের হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। দারিদ্র্যের কারণে থমকে আছে চিকিৎসা।
পরিবার জানায়, প্রায় চার বছর আগে নাহিদ ও মুক্তার বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনের দুই বছর পর তাদের ঘরে জন্ম নেয় ছেলে নোমান। দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের সময় আল্ট্রাসনোগ্রামে ধরা পড়ে, গর্ভের যমজ সন্তান দুটি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয়ভাবে সিজারিয়ান সম্ভব না হওয়ায় প্রথমে কুষ্টিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় বিএসএমএমইউতে স্থানান্তর করা হলে সেখানেই জন্ম হয় দুই শিশুর।
একসময় রাজধানীর একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন শিশুদের বাবা নাহিদ হাসান। বর্তমানে তিনি স্থানীয় একটি দোকানে কর্মচারী। মাসে মাত্র ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা আয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে। এর মধ্যেই শিশুদের দুধ, ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঋণের বোঝা বেড়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাহিদ বলেন, “চিকিৎসকেরা বলেছেন, আমার মেয়েদের আলাদা করা সম্ভব। কিন্তু সেই চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্য নেই। এখন দুধ কেনার টাকাই জোগাড় করতে কষ্ট হচ্ছে। নিয়মিত ঢাকায় যেতে হবে, নানা পরীক্ষা করাতে হবে; কিন্তু যাতায়াতের খরচও জোগাড় করতে পারছি না।”
শিশুদের দাদি নার্গিছ পারভীন বলেন, “দুই শিশুর জন্য প্রতিদিন দেড় থেকে দুই প্যাকেট তরল দুধ লাগে। সেই দুধ কেনার টাকাও আমাদের হাতে থাকে না। সিজারিয়ানের জন্য অনেক ঋণ করেছি। এমতাবস্থায় কীভাবে চিকিৎসা করাব? সরকার, সমাজের বিত্তবান মানুষ ও মানবিক সংগঠনগুলো এগিয়ে এলে হয়তো আমার নাতনিরা নতুন জীবন পাবে।”
স্থানীয় চিকিৎসকদের মতে, জোড়া লাগানো যমজ শিশু জন্ম নেওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা। তবে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের আলাদা করার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, উন্নত চিকিৎসা সুবিধা এবং অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের তত্ত্বাবধান প্রয়োজন।
দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করা এই পরিবারের এখন একটাই স্বপ্ন— জয়নব ও উম্মে কুলসুম একদিন আলাদা দুটি স্বাভাবিক জীবন পাবে। কিন্তু অর্থাভাবে সেই স্বপ্ন আজ অনিশ্চয়তার মুখে। সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে ক্ষীণ হয়ে যেতে পারে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা। তাই সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, মানবিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতা হতে পারে দুই শিশুর নতুন জীবনের সবচেয়ে বড় আশার আলো।
বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দুটি জীবন বাঁচাতে সরকার ও বিত্তবান সমাজসেবীরা এগিয়ে আসবেন— এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।