কুষ্টিয়ায় কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। স্বাস্থ্য বিভাগের দুর্বল নজরদারি এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় এসব প্রতিষ্ঠানে ভুল চিকিৎসায় একের পর এক জীবনহানি ঘটছে। গত পাঁচ মাসে জেলার বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসায় অন্তত ১১ জন রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলায় দুই শতাধিক এমন প্রতিষ্ঠান থাকলেও বৈধ কাগজপত্র রয়েছে মাত্র ১৪টির।

​জানা যায়, চিকিৎসা সেবার নামে কুষ্টিয়া জেলার ৬ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে প্রায় ২ শতাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এসব প্রতিষ্ঠানের কোন বৈধ কাগজপত্র নেই। যার ফলে তারা সরকারি সকল নিয়মনীতি উপেক্ষা করে রমরমা ব্যবসা করে যাচ্ছে। এসব অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একের পর এক দূর্ঘটনা। গত ৫ মাসে এসব সেন্টারে চিকিৎসা নিতে আসা ১১ রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

তথ্যসূত্রে জানা গেছে, কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গা ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে লোটাস হাসপাতাল, লোটাস চক্ষু হাসপাতাল ও লোটাস ডায়াগনস্টিক সেন্টার। প্রতিষ্ঠানটির ভবনের সিঁড়ি অত্যন্ত অপ্রশস্ত এবং লিফটে রোগীর ট্রলি পর্যন্ত ঢোকে না। ফলে অস্ত্রোপচারের মতো স্পর্শকাতর প্রক্রিয়ার পর রোগীদের হুইল চেয়ারে করে ওঠানো-নামানো হয়। সার্বক্ষণিক তিনজন চিকিৎসক থাকার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে একজনও থাকেন না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। গত ৭ আগস্ট এই হাসপাতালেই ডাক্তারের অভাবে পিত্তথলির অস্ত্রোপচার করা এক রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। মৃত রোগীর ছেলের ভাষ্যমতে, শুক্রবার সকালে ভর্তির পর তড়িঘড়ি করে ওইদিন বিকালেই তাঁর মায়ের অপারেশন করা হয়।

পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে দ্রুত কুষ্টিয়া সদরে নেওয়ার পরামর্শ দেয়, কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। এছাড়া কুষ্টিয়ার আরেকটি চক্ষু হাসপাতালেও সম্প্রতি অপারেশন করতে গিয়ে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

​অভিযোগ রয়েছে, লোটাস হাসপাতাল মালিকপক্ষের ছোট ভাই প্রসেনজিৎ বিশ্বাস স্বাস্থ্য বিভাগের একজন কর্মী। কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর এই সখ্যের সুবাদেই অবৈধ কারবার নির্বিঘ্নে চলছে। তবে প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী বিশ্বজিৎ বিশ্বাস এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তাঁরা নিয়ম মেনেই হাসপাতাল চালাচ্ছেন এবং লাইসেন্স নবায়নের জন্য টাকা জমা দিয়ে আবেদন করা আছে। রোগীর মৃত্যুর বিষয়ে তাঁর দাবি, ওই রোগী হাসপাতালে বমি করে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়েছিল এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, তাঁর ভাই প্রসেনজিৎ বিশ্বাস দাবি করেন, শ্বাসকষ্টের ওই রোগী দুই সপ্তাহ ধরে ভর্তি ছিলেন, যা নিছকই দুর্ঘটনা।

​জেলার অন্যান্য ক্লিনিকের অবস্থাও একই রকম। কুমারখালী চক্ষু হাসপাতাল পৌরসভা থেকে শুধুমাত্র একটি ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। বাইরে রেজিস্ট্রেশন নম্বরের সাইনবোর্ড ঝোলানো থাকলেও মালিক আলিমুজ্জামান বদর বৈধ কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।

তিনি জানান, লাইসেন্সের আবেদন করা হয়েছে এবং বর্তমানে মোসাব্বির নামের এক চিকিৎসক সাধারণ রোগীদের দেখছেন। তবে ওই চিকিৎসকের ডিগ্রি বা শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি, যা জনমনে আরও সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।

​এসব তুঘলকি কাণ্ড ও অনিয়মের বিষয়ে স্থানীয় সচেতন মহল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কুমারখালী দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সদস্য হাবিব চৌহান জানান, লাইসেন্স ও উপযুক্ত পরিবেশ ছাড়াই সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে এসব ব্যবসা চলছে, ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কোনো আপস করা উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, এসব হাসপাতালে অনেক সময় গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচার করানো হয়, যা সরাসরি মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার শামিল।

এদিকে, ২৮ এপ্রিল কুষ্টিয়ায় একতা ক্লিনিকে শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কুষ্টিয়া শহরের মোল্লাতেঘরিয়া এলাকায় অবস্থিত একটি বেসরকারি ক্লিনিক—একতা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ওই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, সামান্য শারীরিক সমস্যার চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে ক্লিনিকে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসকরা অপারেশনের পরামর্শ দেন। তবে অপারেশন থিয়েটারে পর্যাপ্ত এনেস্থিসিয়া সুবিধা ছিল না—এমন অভিযোগ তুলেছেন স্বজনরা। তাদের দাবি, যথাযথ প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ছাড়াই অজ্ঞান করার পর শিশুটির শারীরিক জটিলতা শুরু হয়। এরপর শিশুটি মারা যায়।

সে সময় একতা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে এক ডাক্তারকে আটক করা হয়। সিলগালা করা হয় ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, এ ধরনের ঘটনায় বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর চিকিৎসা মান, লাইসেন্সিং ও তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা আবারও সামনে এসেছে। তারা রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত পরিদর্শনের দাবি জানিয়েছেন।

​সার্বিক বিষয়ে কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. এস এম কামাল জেলার বেহাল বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার কথা স্বীকার করেছেন।

তিনি জানান, জেলায় দুই শতাধিক বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল থাকলেও বৈধ কাগজপত্র রয়েছে মাত্র ১৪টির। অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে প্রায়শই রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশ ও চাপে তাঁদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। অতি সম্প্রতি স্থানীয় এক শীর্ষ নেতা সুপারিশ নিয়ে তাঁর অফিসেও এসেছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও নিয়মিত তদারকি ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে সিভিল সার্জন দাবি করেন।

 

​এত অনিয়ম ও প্রাণহানির পরও এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠান কীভাবে টিকে আছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে যেন এমন দুর্ভোগ পোহাতে না হয়, সেজন্য অবিলম্বে এসব ক্লিনিকের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।