সব পেশারই ভালো-মন্দ দিক আছে। সাংবাদিকতার পেশাও এর চাইতে আলাদা কিছু নয়। আচরণের কারণে এই পেশায়ও তারতম্য ঘটে থাকে। এই কারণে সাংবাদিকতার পেশাও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই পেশার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, ‘স্টাব্লিশমেন্টের’ তথা সরকারের সমালোচনা করা। গণতান্ত্রিক সরকার বিষয়টি বোঝে, তাই সাংবাদিক তথা গণমাধ্যমের সমালোচনা থেকে উপকৃত হওয়ার চেষ্টার করে। কিন্তু যারা ক্ষমতার রাজনীতি করেন, ফ্যাসিবাদকে পছন্দ করেন, তাদের আচরণ আলাদা এবং সেখানে নানা মাত্রা লক্ষ্য করা যায়। স্বাধীন সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম তাদের পছন্দ নয়। নানাভাবে তারা গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন চালান। স্বৈরাচারী সরকার বিজ্ঞাপন ও সুযোগ-সুবিধায় হস্তক্ষেপ করেন। আর জেল-জুলুমের হুমকি তো আছেই। ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে এই বিষয়গুলো লক্ষ্য করা গেছে। তার আমলে বাড়াবাড়ির কারণে কিছু গণমাধ্যম এবং সাংবাদিক হাসির পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। ফলে বিশ^াসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছিলেন তারা। এমন চিত্র দেশ, দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষের কাম্য নয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে সৃষ্ট হয় এক নতুন আবহ। সবাই তখন সংস্কার, ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আকাক্সক্ষা তুলে ধরেন। সংস্কার ও বিচারের বিষয়টি কাক্সিক্ষত পর্যায়ে লক্ষ্য করা না গেলেও নির্বাচন হয়েছে। জাতির আশা, নির্বাচিত সরকার সংস্কার ও বিচারের গণআকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন। সরকারের তাল-লয় এবং দৃষ্টিভঙ্গি পছন্দ নয় বিরোধী জোটের। ফলে সংসদের ভিতরে ও বাইরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে প্রতিবাদ। গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধীদলের প্রতিবাদ খুবই স্বাভাবিক বিষয়। সরকারের দায়িত্ব কথা ও কাজের মাধ্যমে সমালোচনার সঙ্গত জবাব দেওয়া। সরকারের মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকের বক্তব্যেও গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রতিধ্বনি শোনা যায়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন কেন? ২৬ আগস্ট সাংবাদিকদের মারধরের খবর মুদ্রিত হয়েছে একটি জাতীয় দৈনিকে। শরীয়তপুরে তিন সাংবাদিককে মারধর করার অভিযোগ উঠেছে জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোল্লার বিরুদ্ধে। এই বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে আরেক সাংবাদিককে হুমিক দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘তোমরা লিখবা, আমরা পিডামু’। গত মঙ্গলবার সকালে ডেইলি স্টার-এর সাংবাদিক জাহিদ হাসান, নিউজ টুয়েন্টি ফোর টেলিভিশন ও জাগো নিউজ প্রতিনিধি বিধান মজুমদার ও মানবকণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি বরকত মোল্লা জেলা প্রশাসক কার্যালয় প্রাঙ্গণে গেলে তাদের মারধর করা হয়। শরীয়তপুরের বিএনপি নেতারা তখন সেখানে একটি বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করছিলেন। ওই সাংবাদিকদের মারধর করার কারণ ফোনে জানতে চাইলে জাজিরা উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি পলাশ খানকে বিএনপি নেতা আরিফুজ্জামান মোল্লা বলেন, ‘আরও তো মারুম, শুধু এহন না, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে পারে। অনেকেই লিস্টে আছে। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহর রহমতে সন্ধ্যার মধ্যে আরও খবর পাইয়া যাইবা। তুমি নিজেও তৈরি থাক।’ এই যে পিটানোর আস্ফালন, আরও মারার হুমিক; এটা শুধু শরীয়তপুরেই সীমাবদ্ধ নয়, ঢাকার দোহারেও এমন ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। মাঠপর্যায়ে সাংবাদিক পেটানোর এই যে দাপট, তা সরকার কিংবা সরকারী দলের কোনো উপকারে আসবে কী? বরং তা ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের কুকীর্তির কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যার পরিণতি পতন। সরকার ও সরকারি দলের কার্যক্রম কিংবা পার্টি পরিচানায় কোনো ত্রুটি নেই তো? থাকলে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা ও সংশোধন।