॥ মোহাম্মদ রূহুল আমিন ॥
কবি নজরুলের সাহিত্য জীবনের স্থায়িত্ব মাত্র ২২/২৩ বছর। এ স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, শিশু সাহিত্য, চিটিপত্র, অভিভাষণ রচনা করেন।
কবি শুধু সুন্দরের হাতে বীনা, পায়ে পদ্মফুল দেখেননি তার চোখে চোখ ভরা জলও দেখেছেন। শ্মশানের পথে গোরস্থানে তাঁকে ক্ষুধার্থ মুষ্টিতে ব্যথিত পায়ে চলে যেতে দেখেছেন। যুদ্ধ ভূমিতে তাকে দেখেছেন। কারাগারের অন্ধকূপে তাকে দেখেছেন। ফাঁসির মঞ্চে তাকে দেখেছেন। তিনি বলে উঠেছেন-কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট।
কবি নজরুলের গানে স্তুতি ছিল, সেই সুন্দরকে রূপে রূপে অপরূপ করে তুলেছেন। তিনি বলেছেন, সূর আমার সুন্দরের জন্যে আর তরবারি সুন্দরের অবমাননা করে যে সেই অসুন্দরের জন্যে। কবি বলেছেন, আমি গো-ধুলিবেলার রাখাল ছেলের সাথে বাঁশি বাজাই, ফজরের মুয়াজ্বিনের সুরে সুরে মিলিয়ে আযান দেই। আবার দীপ্ত মধ্যাহ্নের খর তরবারি নিয়ে রণভূমিতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। তখন আমার খেলার বাঁশি হয়ে ওঠে যুদ্ধের বিষাণ রণ সিঙ্গা।
বিশ্বের নব অভ্যুত্থানের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো হিন্দু-মুসলমানের প্রতিহিংসা ও অশ্রদ্ধা। তিনি হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক ও গালাগালিকে গলা-গলিতে পরিণত করার চেষ্টা করে ছিলেন।
কবি নজরুল অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা, কাহিনী বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে বাঙ্গালি হিন্দু-মুসলিমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। নতুন জাতি নতুন মানুষ সৃষ্টির কল্পনা ছিল তার ধমনীতে। তাঁর প্রেরণায় সম্মিলিত ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন হয়। সেই আন্দোলন দমাতে ব্রিটিশ সরকার ৯২ হাজার হিন্দু-মুসলিমকে ভারতের রাস্তার পাশের গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেয়। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত কবি নজরুলের কাব্যগ্রন্থ-“বিশের বাঁশী ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করে। সাম্রাজ্যবাদি ইংরেজদের নিষ্ঠুরতা-অত্যাচার তাঁর কবিতাকে করে তুলে বিদ্রোহাত্মক, ভাষাকে করে বীর্যবান, প্রকাশ ভঙ্গিকে করে দীপ্ত। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে রচিত হয়েছে তাঁর- অগ্নিবীণা, বিশের বাঁশী, শিকল ভাঙার গান, প্রলয়শিখা প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ।
তিনি ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিরোধ ও দাঙ্গার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। তিনি তাঁর শক্তিশালী কলমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। এ সময়ে তিনি পথের দিশা, হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ, কবিতা, মন্দির ও মসজিদ প্রবন্ধ ইত্যাদি লেখেন। সমাজ সংস্কারে তার অবদান প্রাক্ স্মরণীয়, তারুণ্যের উন্মাদনায় কবি জরাগ্রস্ত পুরোনো সমাজ ভেঙে ফেলার সংকল্পের কথা বলেছেন, তাঁর বিদ্রোহী কবিতায়।
কবি নজরুল জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত, দুঃখ-শোকে কেটেছে শেষ জীবন। সুচিকিৎসার অভাবে শিশুপুত্র বুলবুলের মৃত্যু প্রিয়তমা স্ত্রী প্রমীলা দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত, নিজের ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে মস্তিষ্ক বিকল হয়ে যায়। ৩৫ বছর ভোগার পর ৭৭ বছর বয়সে প্রেমহীন পৃথিবীর মায়া ছেড়ে ইন্তিকাল করেন। কবি কাজী নজরুল যদি আর কিছু না লিখেও কেবলমাত্র “বিদ্রোহী” কবিতাটাই লিখতেন তাহলেও তিনি সুবিখ্যাত হতে পারতেন।
লেখক : সাংবাদিক, চরফ্যাসন প্রেসক্লাব, ভোলা।