কাঁঠাল পাকার মৌসুমে গাজীপুরের শ্রীপুরে বাড়ে ফলটির সরবরাহ। বাগান থেকে শুরু করে স্থানীয় বাজার-সবখানেই তখন কাঁঠালের উপস্থিতি। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের এই মৌসুম শেষ হলেই কমে আসে ফলটির বাজার। দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল প্রতিবছরই অপচয় হয়। দীর্ঘদিনের এই সমস্যার মধ্যেই কাঁঠালকে সংরক্ষণযোগ্য ও বাজারজাতযোগ্য খাদ্যপণ্যে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন শ্রীপুরের এক উদ্যোক্তা।

শ্রীপুর পৌরসভার বৈরাগীরচালা গ্রামের আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া তাঁর প্রতিষ্ঠান মেহমান ফুড-এ পাকা কাঁঠাল ব্যবহার করে তৈরি করছেন বিস্কুট। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁঠাল দিয়ে তৈরি এ পণ্য ইতোমধ্যে অনলাইন ক্রেতাদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসছে অর্ডার। উদ্যোক্তার আশা, উদ্যোগটি বড় পরিসরে নেওয়া গেলে একদিকে কাঁঠালের অপচয় কমবে, অন্যদিকে কৃষিপণ্যের নতুন বাজার তৈরি হবে।

কাঁঠালের কোষ থেকে বিস্কুট

মেহমান ফুডের কারখানায় পাকা কাঁঠালের কোষ প্রক্রিয়াজাত করে বিস্কুট তৈরির কাজ চলছে। কারখানার প্রধান কারিগর মানিক মিয়া জানান, প্রথমে কাঁঠালের কোষ আলাদা করে ব্লেন্ড করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট পরিমাণ ঘি, বাটার, দুধ, ময়দাসহ অন্যান্য উপকরণ যোগ করে তৈরি করা হয় মণ্ড।

পরবর্তী ধাপে মণ্ড ডাইসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট আকৃতি দেওয়া হয়। তারপর তা ওভেনে বেক করা হয়। প্রস্তুত বিস্কুট ঠান্ডা হওয়ার পর প্যাকেটজাত করে পাঠানো হয় ক্রেতার কাছে। বর্তমানে প্রতিটি বক্সে ৮৫০ গ্রাম করে বিস্কুট সরবরাহ করা হচ্ছে।

উদ্যোক্তার দাবি, পণ্য তৈরির সময় কৃত্রিম ফ্লেভার বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে না। কাঁঠালের স্বাভাবিক স্বাদ ও ঘ্রাণ যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অনলাইনেই তৈরি হচ্ছে বাজার

শুরুতে স্থানীয়ভাবে পরিচিতি পেলেও এখন অনলাইনভিত্তিক অর্ডারই এ পণ্যের প্রধান বাজার হয়ে উঠছে। কুরিয়ারকর্মী রাকিব জানান, গত দুই মাস ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত কাঁঠালের বিস্কুট পাঠানো হচ্ছে।

তাঁর ভাষ্য, নতুন ক্রেতাদের পাশাপাশি এমন অনেক ক্রেতা রয়েছেন, যারা একবার পণ্য নেওয়ার পর পুনরায় অর্ডার করছেন। ফলে ধীরে ধীরে বাড়ছে অর্ডারের সংখ্যা।

উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া জানান, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ কেজি কাঁঠালের বিস্কুট বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকলেও ক্রেতাদের আগ্রহ তাঁকে আশাবাদী করে তুলেছে।

বিদেশের অভিজ্ঞতা থেকে ভাবনার শুরু

আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়ার উদ্যোগের পেছনে রয়েছে বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন দেশে স্থানীয় ফল, শস্য ও কৃষিপণ্য ব্যবহার করে কীভাবে নতুন খাদ্যপণ্য তৈরি করা হচ্ছে, তা দেখে তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে চীনসহ কয়েকটি দেশে কাঁঠালভিত্তিক বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তাঁর নজর কাড়ে।

দেশে ফিরে নিজের এলাকার কাঁঠাল নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করেন তিনি। এরপর শুরু হয় নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। একপর্যায়ে কাঁঠাল থেকে বিস্কুট তৈরির পদ্ধতি নিয়ে কাজ শুরু করেন।

আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া বলেন, “বিদেশে দেখেছি, স্থানীয় কৃষিপণ্যকে শুধু কাঁচা অবস্থায় বিক্রি না করে প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের এলাকায় প্রচুর কাঁঠাল উৎপাদন হয়। কিন্তু সংরক্ষণের সুযোগ কম থাকায় মৌসুমে অনেক ফল নষ্ট হয়ে যায়। এ সমস্যা থেকেই কাঁঠালকে অন্যভাবে ব্যবহার করার চিন্তা করি।”

তিনি বলেন, আপাতত সীমিত পরিসরে উৎপাদন চলছে। ভবিষ্যতে কাঁঠালের বিস্কুটের পাশাপাশি ড্রাই কেক, চিপসসহ আরও কয়েক ধরনের পণ্য বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

কৃষকের জন্য তৈরি হতে পারে নতুন বাজার

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীপুর উপজেলায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে কাঁঠালের আবাদ হয়। এখানকার উঁচু লাল মাটি কাঁঠাল চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় শ্রীপুরের কাঁঠালের আলাদা সুনাম রয়েছে।

তবে মৌসুমে একই সময়ে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল বাজারে আসায় অনেক সময় কৃষক কাঙ্ক্ষিত দাম পান না। দ্রুত বিক্রি করা সম্ভব না হলে ফল নষ্ট হয়ে যায়।

স্থানীয় কাঁঠালচাষি নজরুল ইসলাম বলেন, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা বাড়লে কৃষকদের উৎপাদিত কাঁঠাল বিক্রির নতুন সুযোগ তৈরি হবে। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কাঁঠাল কেনা হলে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।

বিশেষজ্ঞদের চোখে মূল্য সংযোজনের সুযোগ

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, দেশে উৎপাদিত কাঁঠালের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিবছর অপচয় হয়। এই অপচয় কমাতে কাঁঠালকে বিভিন্ন মূল্যসংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করা গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, কাঁঠালের বীজ, কাঁচা ও পাকা অংশ বিভিন্নভাবে প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব। কাঁঠাল থেকে পাউডার তৈরি করে বিস্কুট, কেক, কুকিজ, ক্যান্ডিসসহ নানা ধরনের খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা যায়। এতে কৃষক ও উদ্যোক্তার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও লাভবান হতে পারে। একই সঙ্গে সৃষ্টি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।

মৌসুমি ফল থেকে সারা বছরের পণ্য

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণের বড় সুবিধা হলো-মৌসুমি ফলকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বাজারযোগ্য পণ্যে রূপ দেওয়া। এতে মৌসুমে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে যে চাপ তৈরি হয়, তা কমানোর সুযোগ রয়েছে।

শ্রীপুরের উদ্যোক্তার উদ্যোগটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে অনলাইন বাজারে ক্রেতাদের সাড়া এবং পুনরায় অর্ডারের প্রবণতা তাঁকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহ দিচ্ছে।

কৃষকের মাঠে উৎপাদিত কাঁঠাল যদি নিয়মিতভাবে স্থানীয় কারখানায় গিয়ে বিস্কুট, কেক, চিপস কিংবা অন্য কোনো পণ্যে রূপ নেয়, তাহলে বদলে যেতে পারে কাঁঠালের প্রচলিত বাজারব্যবস্থা। তখন মৌসুম শেষ হলেও কাঁঠালের স্বাদ থেকে যাবে বাজারে-ফলের ঝুড়িতে নয়, নানা প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের প্যাকেটে।

শ্রীপুরের এই উদ্যোগ তাই কেবল একটি নতুন খাদ্যপণ্যের গল্প নয়; এর মধ্যে রয়েছে কৃষিপণ্যের অপচয় রোধ, কৃষকের বাজার সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় কাঁচামালকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা।