দেশের অন্যতম শিল্পনগরী গাজীপুরকে পর্যায়ক্রমে শব্দদূষণমুক্ত, স্বাস্থ্যসম্মত ও বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তুলতে যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার বন্ধ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘নো হর্ন’ কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। আগামী ১২ সপ্তাহের মধ্যে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগে শব্দদূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এএ লক্ষ্যে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভাওয়াল সম্মেলন কক্ষে দপ্তর প্রধানদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া।
সভায় জেলা প্রশাসক বলেন, শব্দদূষণ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এই উদ্যোগ হাতে নেয়া হয়েছে। প্রশাসনের একক উদ্যোগ নয়, বরং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে গাজীপুরকে শব্দদূষণমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মতবিনিময় সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১২ সপ্তাহে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে-সরকারি যানবাহনে ‘নো হর্ন’ কার্যক্রম চালু করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃষ্টান্ত স্থাপন, সব সরকারি যানবাহনে ‘সাইলেন্ট ড্রাইভিং’ স্টিকার সংযুক্ত করা, সরকারি দপ্তরের চালকদের অঙ্গীকারনামা গ্রহণ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যানবাহনে অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার বন্ধ করা এবং হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকাকে ‘সাইলেন্ট জোন’ হিসেবে কার্যকর করা।
এছাড়া শিল্পাঞ্চলের পোশাক কারখানা, টেক্সটাইল মিল, ওষুধ শিল্পসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ও ভাড়াকৃত যানবাহনে অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা, মোটরসাইকেল চালকদের নিয়ে ‘স্মার্ট রাইডার’ সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা, গণপরিবহন চালক ও মালিকদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা, সিএনজি ও অটোরিকশা থেকে উচ্চশব্দের হর্ন অপসারণ এবং প্রধান সড়কগুলোতে চালকদের প্রতিশ্রুতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কর্মপরিকল্পনায় আরও রয়েছে হাইড্রোলিক ও অবৈধ উচ্চশব্দের হর্ন অপসারণে বিশেষ অভিযান, নীরব এলাকায় নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, শব্দদূষণবিরোধী গণসচেতনতা বৃদ্ধি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রচারণা এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
সভায় জানানো হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী দীর্ঘ সময় ৭০ ডেসিবেলের বেশি শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তির জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত শব্দ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, অনিদ্রা, মানসিক চাপ এবং শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ কারণে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে জেলা প্রশাসন।
সভায় গাজীপুর জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিবৃন্দ, পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তাবৃন্দ, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং সুধীজন উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ১২ সপ্তাহের কর্মপরিকল্পনার প্রতিটি সিদ্ধান্ত ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে গাজীপুরকে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে দেশের একটি অনুসরণযোগ্য জেলায় পরিণত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।