স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুরঃ
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় স্ত্রী, তিন কন্যাসন্তান ও শ্যালককে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় নতুন নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। পাঁচ খুনের এ ঘটনায় অবশেষে হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। মামলায় গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোপীনাথপুর এলাকার আতিয়ার রহমান মোল্লার ছেলে পলাতক ফোরকান মোল্লাকে প্রধান আসামি এবং অজ্ঞাত আরও ৩/৪ জনকে আসামি করা হয়েছে।
রোববার দিবাগত রাতে নিহত শারমিন খানমের পিতা গোপালগঞ্জের পাইককান্দি এলাকার শাহাদাৎ মোল্লা বাদী হয়ে কাপাসিয়া থানায় মামলাটি দায়ের করেন। কাপাসিয়া থানার মামলা নং-১৭, জিআর নং-১৪৩, তারিখ ০৯ মে ২০২৬, ধারা ৩২৮/৩০২/৩৪ পেনাল কোডে মামলাটি রুজু করা হয়েছে।
এজাহারে উঠে এলো পরিকল্পিত হত্যার ভয়াবহ বর্ণনা-
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ফোরকান মোল্লা প্রায় ছয় মাস ধরে কাপাসিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাউৎকোনা পূর্বপাড়া গ্রামের প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়ির নিচতলায় স্ত্রী শারমিন খানম (৩৫), বড় মেয়ে মীম (১৬), মেজ মেয়ে মারিয়া (৮), ছোট মেয়ে ফারিয়া (২) ও পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকতেন।
বাদীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ফোরকান তার স্ত্রী শারমিনকে মারধর ও নির্যাতন করতেন। গত ৮ মে চাকরি দেওয়ার কথা বলে শ্যালক রসুল মোল্লা (২২) কে বাসায় ডেকে আনেন তিনি। পরে রাত ৮টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে কোনো এক সময়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালককে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে অচেতন করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যার পর ফোরকান পালিয়ে যায়।
রক্তাক্ত ঘর, লাশের পাশেই রহস্যঘেরা চিরকুটঃ
শনিবার সকালে ঘরের দরজা না খোলায় সন্দেহ হয় প্রতিবেশীদের। জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে রক্তাক্ত দৃশ্য দেখে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করে।
সরেজমিনে দেখা যায়, দুই কক্ষের ছোট বাসাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে রক্তের দাগ। তিন শিশুর লাশ মেঝেতে পাশাপাশি পড়ে ছিল। শ্যালক রসুল মোল্লার লাশ খাটের ওপর এবং মা শারমিন খানমের হাত-মুখ বাঁধা লাশ জানালার গ্রিলের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের গভীর জখমের চিহ্ন ছিল, গায়ে নতুন শাড়ি ও গলায় লম্বা গহনা পড়া ছিল।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ফোরকানের স্বাক্ষরবিহীন কম্পিউটার টাইপ করা অভিযোগপত্র, রহস্যঘেরা চিরকুট, মদের বোতল ও মাদকসেবনের বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করে। অভিযোগপত্রে স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা আত্মসাত এবং পারিবারিক বিরোধের কথা উল্লেখ করা হয়।
হত্যার পর স্বজনকে ফোন: ‘লাশ নিয়ে যাও’--
স্থানীয় সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর পালিয়ে যাওয়ার সময় ফোরকান তার এক চাচাতো ভাই আবু মুসাকে মোবাইল ফোনে হত্যার কথা জানিয়ে লাশ নিয়ে যেতে বলে। খবর পেয়ে স্বজনরা ঘটনাস্থলে এসে রক্তাক্ত লাশ দেখতে পান।
ফোরকানের ভায়রা ভাই শামীম জানান, 'শুক্রবার চাকরি দেওয়ার কথা বলে রসুলকে কাপাসিয়ায় ডেকে আনে ফোরকান। পরে তাকেও হত্যা করা হয়। পুরো ঘটনাটি পরিকল্পিত।'
দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন করতঃ
নিহত শারমিনের বাবা শাহাদাৎ মোল্লা বলেন, 'ফোরকান দীর্ঘদিন ধরে আমার মেয়েকে যৌতুক ও টাকার জন্য নির্যাতন করত। আমরা কখনো ভাবিনি সে নিজের সন্তানদেরও এভাবে হত্যা করতে পারে।'
শারমিনের চাচি ইভা রহমান বলেন, 'এ হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত। পারিবারিক কলহ দীর্ঘদিনের ছিল। বিভিন্ন সময় সালিসও হয়েছে। আমরা আগেও শারমিনকে নির্যাতনের বিষয়ে শুনেছি।'
বাড়ির মালিকের স্ত্রী লুৎফুন নাহার জানান, 'গত জানুয়ারি মাসে তারা আমাদের বাসায় ওঠে। সবসময় দরজা-জানালা বন্ধ রাখত। রাতে কোনো চিৎকার শুনিনি। সকালে পরে ভয়াবহ ঘটনাটি জানতে পারি।'
পুলিশ সুপারের আশ্বাস: খুব দ্রুত রহস্য উদঘাটন হবেঃ
গাজীপুরের পুলিশ সুপার, মোঃ শরিফ উদ্দীন বলেন, 'একই পরিবারের পাঁচজনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, যা অত্যন্ত মর্মান্তিক। ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। জেলা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি, সিআইডি, পিবিআইসহ বিভিন্ন ইউনিট সমন্বিতভাবে কাজ করছে। হত্যাকারী সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই মূল রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।'
গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কাপাসিয়া-কালীগঞ্জ সার্কেল), মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, 'এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড। পলাতক ফোরকানকে গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান চালাচ্ছে।'
কাপাসিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ, শাহীনুর আলম বলেন, 'প্রাথমিকভাবে পারিবারিক কলহকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া কাগজপত্র ও অন্যান্য আলামত গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা হচ্ছে,। পুলিশের কয়েকটি ইউনিট আসামিকে ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।'
জেলা প্রশাসনের মানবিক উদ্যোগ, ফ্রিজিং গাড়িতে পাঠানো হলো পাঁচ লাশঃ
মর্মান্তিক এ হত্যাকাণ্ডের পর নিহতদের লাশ দ্রুত ও সম্মানের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দিতে মানবিক উদ্যোগ নেয় গাজীপুর জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক, গাজীপুর মোঃ নূরুল করিম ভূঁইয়ার নির্দেশে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ডাঃ তামান্না তাসনীম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ নাহিদুল হক এবং জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
জানা গেছে, সাধারণত দুপুরের পর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত কার্যক্রম সীমিত হয়ে যায়। কিন্তু নিহতদের শরীরে গুরুতর জখম এবং গোপালগঞ্জে লাশ পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সঙ্গে সমন্বয় করে একই দিনেই পাঁচজনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করান।
পরে বৃষ্টি ও গরমে লাশ দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দুইটি ফ্রিজিং গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়। ওই গাড়িতে করেই নিহত পাঁচজনের লাশ গোপালগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়। জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে প্রশংসিত হয়েছে।
তদন্তে একযোগে কাজ করছে একাধিক সংস্থাঃ
ঘটনার পর থেকেই পুলিশ, ডিবি, সিআইডি, পিবিআই, এনএসআইসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত শুরু করেছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক কলহ, অর্থ লেনদেন, মাদকাসক্তি ও অন্য কোনো কারণ রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে এ হত্যাকাণ্ডে গভীর শোক ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ। গাজীপুর জেলা জামায়াতের আমির ড. জাহাঙ্গীর আলম এক বিবৃতিতে বলেন, “একই পরিবারের শিশু সন্তানসহ পাঁচজনকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা মানবতা ও সভ্যতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।'
বর্তমানে পুরো রাউৎকোনা গ্রামজুড়ে শোক, আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের ভাষায়, 'এমন ভয়ংকর ও হৃদয়বিদারক ঘটনা কাপাসিয়ায় আগে কখনও ঘটেনি।'