প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ আইনের খসড়ায় মানবাধিকার কমিশনের পরিবর্তে তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের হাতে ন্যস্ত করায় এবং মতামতের জন্য মাত্র একদিন সময় দেওয়ায় সরকারের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা।

আগের অধ্যাদেশে গুম তদন্তের ক্ষমতা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হলেও, নতুন খসড়া আইনে তা এককভাবে পুলিশের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। অতীতে গুমের ঘটনায় পুলিশের একাংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকায় পুলিশের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আইনের খসড়ার ওপর মতামত জানাতে মাত্র এক দিন সময় নির্ধারণকে 'প্রহসনমূলক' বলে আখ্যায়িত করেছে টিআইবি।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুমের ভয়াবহতা ও নির্মমতার চিত্র উঠে এসেছে ভুক্তভোগীদের নানা সময়ের বর্ণনায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ভুক্তভোগী ও স্বজনদের ডেকে শুনেছেন করুণ আর্তনাদ। বাংলাদেশ সরকার গঠিত গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের তথ্য বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনা ঘটেছে।

বছরের পর বছর গুম করে রাখা হয়েছে ভিন্ন মতাদর্শের মানুষদের, যার মধ্যে ৯৬ শতাংশই রাজনৈতিক ভিকটিম। জুলাই-পরবর্তী সময়ে গুম প্রতিরোধে অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এই অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন আইনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে সরকার।

খসড়ায় প্রচলিত ফৌজদারি মামলার মতো পুলিশকে দিয়ে গুমের মামলার তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সরকারের এমন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে মানবাধিকার কর্মী ও গুম কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেন, ‘গুমের ঘটনাটা কীভাবে ঘটে? অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোই এসব ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকে। পুলিশের নিজস্ব সদস্য, অন্য কোনো গোয়েন্দা সংস্থা বা সেনাবাহিনীর সদস্য—যারা এসব ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাদের বিরুদ্ধে অন্য বাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় তদন্ত করার কোনো নজিরও আমরা দেখিনি, আর তা সম্ভবও নয়।’

পুলিশকে দিয়ে গুমের মামলার তদন্তের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে অধিকারের পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিন এলান বলেন, ‘হাসিনার শাসনামলে গুমের ঘটনায় সেনাবাহিনীর অনেক বড় বড় কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে যদি এ ধরনের ঘটনা আবার ঘটে এবং বড় বড় সেনা কর্মকর্তারা এতে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে পুলিশের ওই কর্মকর্তার কি তাদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া বা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করার ক্ষমতা থাকবে?’

গুমের আলামত নষ্ট করলে তার শাস্তি আগে ৭ বছর থাকলেও বর্তমান আইনে তা ৫ বছর করা হয়েছে। তাই গুম প্রতিরোধে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নূর খান লিটন আরও বলেন, ‘আইন অনুযায়ী পুলিশই চার্জশিট দেওয়ার এবং তদন্ত করার অধিকারী। আইনটি যদি একটু এক্সটেন্ড করেন, অর্থাৎ মানবাধিকার কমিশন বা অন্য কোনো সংস্থাকে ক্ষমতা দিয়ে দেন, তাহলে সেটিও কাজ করতে পারে। আর পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার সংস্কৃতি থেকে আমরা সরে এসেছি—এ কথা বলারও সুযোগ নেই।’

সরকারের সদিচ্ছাকে প্রশ্ন করে এ এস এম নাসির উদ্দিন এলান বলেন, ‘গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের যে অভিজ্ঞতা, সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই অন্তর্বর্তী সরকার গুম প্রতিরোধ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি (অর্ডিন্যান্স) তৈরি করেছে। সরকারের সদিচ্ছার তো অভাবই। সদিচ্ছার অভাব না থাকলে তারা ওই অধ্যাদেশটিই করল কেন?’

অধস্তন কোনো পুলিশ কর্মকর্তার পক্ষে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী মহলের বিপক্ষে বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ প্রতিবেদন দেওয়া বাস্তবসম্মত নয় বলে মত বিশেষজ্ঞদের। খসড়ার নির্দিষ্ট ধারার কারণে অভিযুক্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সহজে আইনি অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ পেয়ে যেতে পারেন।