স্টাফ রিপোর্টার

মাঝ-নদীতে থামতো বোট। একে একে বন্দীদের বের করে নেওয়ার পর ঘটতো হত্যাকা-। তবু শেষ হতো না নির্মমতা। কেটে ফেলা হতো নিথর দেহের পেট। বেরিয়ে আসত নাড়িভুঁড়ি। মাথায় গুলী করলে মগজও বেরিয়ে আসতো। শরীর থেকে ঝরতো রক্ত। আর সেই রক্তাক্ত বোটই ধুয়ে ফিরতে হতো নদীর তীরে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এমনই ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী আব্বাস মল্লিক। আওয়ামী লীগের শাসনামলে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল বুধবার। এদিন ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে দশম সাক্ষী হিসেবে আব্বাস মল্লিকের জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়।

৬০ বছর বয়সী এই সাক্ষীর বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণ চরদুয়ানী গ্রামে। তিনি পেশায় একজন জেলে। মাঝেমধ্যে হাল চাষও করেন। তারা তিন ভাই ও চার বোন। তার ছোট ভাইয়ের নাম আলকাছ মল্লিক।

জবানবন্দীতে আব্বাস মল্লিক বলেন, মাঝেমধ্যে আমাদের সঙ্গে নদীতে মাছ ধরতে যেতেন আলকাছ মল্লিক। কখনও আবার মুদির দোকানেও বসতেন। আমরা যে বোটে করে নদীতে মাছ ধরতে যেতাম, সেটির মালিক ছিলেন আলকাছ। তিনি কিছু লেখাপড়া জানতেন। ২৫-২৬ বছর আগে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। ছয়-সাত বছর থাকার পর পুনরায় চরদুয়ানীতে ফিরে আসেন। এরপর মাছ ধরার দু’টি ট্রলার বা বোট তৈরি করেন ছোট ভাই। একটার দায়িত্বে ছিলাম আমি। আরেকটি জলিল মাঝিকে দেন। আমরা নিয়মিত মাছ ধরতে যেতাম।

সাক্ষ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে চরদুয়ানী ও কাঠালতলীতে আসা-যাওয়া করতেন র‌্যাব সদস্যরা। বোট মালিকদের ডেকে অভিযানে যেতেন তারা। যেদিন র‌্যাব সদস্যরা আমাদের এলাকায় আসতেন, সেদিন বিকেলে সাদা পোশাকে দু’জন ঘোরাফেরা করতেন। তারা দোকানের মালিকদের ডেকে বলতেন, সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ ও বাতি নিভিয়ে রাখতে হবে। রাত ১১টা থেকে ১২টার দিকে র‌্যাবের চার-পাঁচটি মাইক্রোবাস এসে বরফ মিলের সামনে থামতো। এরপর গাড়িতে করে ঢাকা থেকে আনা বন্দীদের বোটে নিয়ে তোলা হতো। তাদের হাত ও চোখ বাঁধা থাকতো। বন্দীদের বোটে ওঠানোর পর সিমেন্টের বস্তা, রশি ও হোগলা রিয়াজের দোকান থেকে নিতেন র‌্যাব সদস্যরা।

আব্বাস মল্লিক বলেন, বন্দীদের তোলার পর আমাদের বোট চালাতে বলা হতো। এরপর চরদুয়ানী দিয়ে বলেশ্বর নদীতে যেতাম। আমাদের আরও গভীর পানিতে যেতে বলা হতো। গভীর পানিতে গিয়ে আমরা ধীর গতিতে বোট চালাতাম। ট্রলারের পাটাতনের নিচকে বলে খোন্দা আর ওপরের ছাউনি সম্বলিত ঘরকে বলে ব্রিজ। গভীর পানিতে যাওয়ার পর বন্দীদের ব্রিজ ও খোন্দা থেকে বের করে আনতেন র‌্যাব সদস্যরা। আমাদের ট্রলারের দুই সাইডে সাপোর্ট নামক একটি অংশ থাকে। একজন বন্দীকে বের করার পর দুইজন র‌্যাব সদস্য ওই সাপোর্টের ওপর বসিয়ে চেপে ধরে রাখতেন। এরপর ওই বন্দীর মাথায়, কানে অথবা বুকে গুলী করতেন জিয়া স্যার। কাউকে একটি গুলী, আবার কাউকে দুটি করতেন। এরপর লাশের পেট কেটে নাড়িভুঁড়ি বের করে গলায় বা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। এভাবে এক এক করে মারার পর সুন্দরবন যেতেন তারা।

এই প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সুন্দরবন যাওয়ার পর অন্য বন্দীদের বোট থেকে বের করে নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হতো। এরপর সাংবাদিকদের ফোন দিয়ে ডেকে আনতেন র‌্যাব সদস্যরা। পরে বিভিন্ন থানায় এসব লাশ জমা দেওয়া হতো।

সাক্ষী আব্বাস মল্লিক বলেন, বোটগুলোকে ধুয়ে আমরা চরদুয়ানীতে আসতাম। তবে বোট ধোয়ার সময় বন্দীদের কাটা পেট থেকে বের হওয়া নাড়িভুঁড়ি দেখতে পেতাম আমরা। মাথায় গুলী করলে মগজও বেরিয়ে আসতো। এছাড়া, বন্দীদের শরীর থেকে রক্ত প্রবাহিত হতো। এরপর আমরা সুন্দরবন থেকে চরদুয়ানী বরফ মিলে ফিরে যেতাম। তখন মেজর সাব্বির বলতেন, ‘তোমাদেরকে জিয়া স্যার ডাকেন’। এরপর আমরা মাঝিরা জিয়া স্যারের কাছে যেতাম। তিনি আমাদের প্রত্যেককে কখনও দুই হাজার, কখনও পাঁচ হাজার টাকা দিতেন। এসব টাকা খামে করে দেওয়া হতো। আমার ছোট ভাই আলকাছ র‌্যাবের সঙ্গেই কাজ করতেন।

সাক্ষ্যে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০১১ সালের মাঝামাঝি কোনো একদিন র‌্যাব থেকে আলকাছ মাঝিকে ফোন দিয়ে বলা হয়, ‘জিয়া স্যার তোমাকে বটতলা মানিকখালী আসতে বলেছেন’। র‌্যাবের কর্মকা- নিয়ে বাজারে আলোচনা করতেন আলকাছ মাঝি। তখন অন্যান্য বোটের মালিকরা আলকাছকে বলতেন, ‘র‌্যাব তোমার ওপর খুব খ্যাপা’। ২০১১ সালের মাঝামাঝি কোনো একদিন র‌্যাবের পরিচয় দিয়ে আলকছাকে ফোন করা হলে দুপুরের ভাত খেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। ওই দিন সন্ধ্যা সাতটা-আটটার দিকে আলকাছের স্ত্রী আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘মাইজা ভাই, র‌্যাবের ফোন পেয়ে জিয়া স্যারের সঙ্গে দেখা করতে বটতলা মানিকখালী গেছেন আলকাছ। এখন তার ফোন বন্ধ পাচ্ছি’। এরপর আমরা তাকে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে থানায় যাই। থানার লোকজন আমাদের খুঁজে দেখতে বলেন। পরে খুলনা, পটুয়াখালী, বরিশাল ও ঢাকা র‌্যাব অফিসে তার সন্ধান করি। কিন্তু কোথাও খুঁজে পাইনি। এ নিয়ে আমরা পাথরঘাটা থানায় একটি জিডি করি। জিডিতে জিয়া স্যারের ও র‌্যাবের নাম লিখতে বলি। কিন্তু তারা নাম লিখেননি। তবে আমার ভাইকে আর কোথাও খুঁজে পাইনি। হয়তো বন্দীদের মতো আলকাছকেও হত্যা করা হয়েছে। এজন্য জিয়া স্যারের বিচার চাই। আমি ওই সময় জিয়া স্যারকে দেখেছি। আজ তিনি ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত আছেন।

জবানবন্দী শেষে আব্বাসকে জেরা করেন জিয়াউল আহসানের আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান ও সাহিদুর রহমান।

প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও তাসমিরুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, শাইখ মাহদী, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মঈনুল করিম, অলি মিয়াসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।