চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে সিইআইজেড
# সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার
# ১১০টির বেশি চীনা কোম্পানি এই শিল্পাঞ্চল পরিদর্শন করেছে
# ৩০টির বেশি কোম্পানি বিনিয়োগের আগ্রহপত্র দিয়েছে
# ১ লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা
# চীনা সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আসছে
মুহাম্মদ নূরে আলম
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্র নীতির নীতিগত পরিবর্তন, অবকাঠামোগত উন্মোচন এবং উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনার ফলে এ যৌথ অংশীদারিত্বে তৈরি হয়েছে নতুন দিগন্ত। ফলে চীনা বিনিয়োগে বদলে যেতে পারে দেশের অর্থনীতির চাকা, বাড়তে পারে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বাণিজ্য। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও বাণিজ্যের পর এবার উৎপাদনশীল শিল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগের দিকে এগোচ্ছে দুই দেশ। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (সিইআইজেড) বাস্তবায়নের গতি বাড়া, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন এবং চীনা কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশে উৎপাদনভিত্তিক বিনিয়োগের আগ্রহ সব মিলিয়ে ঢাকা-বেইজিং অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত মিলছে। বিশেষ করে গত ৩০ আগস্ট পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের বৈঠকের পর অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়টিও সামনে এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় চীনা সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে আসছেন বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে। দুই দেশ দ্রুত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের কৌশলগত সংলাপ এবং প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ের কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা সংলাপ শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়। এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বিনিয়োগের বিষয়টি আরও জোরালো হয়। ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ বিবৃতিতেও বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প ও সরবরাহ চেইন, বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে সহযোগিতা জোরদারের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে চীন বাংলাদেশের ১০০ শতাংশ ট্যারিফ লাইনে শূন্য শুল্ক সুবিধার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানিয়েছেন, চীন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থার (সিআইডিসিএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী এবং ইউনান প্রদেশের নির্বাহী ভাইস গভর্নরের আসন্ন বাংলাদেশ সফর এই বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক ব্লুপ্রিন্টকে বাস্তবে রূপ দেবে। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতি গ্রহণ করা গেলে চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য আগামী দিনের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।
কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনা বিনিয়োগের অর্থ শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হওয়া নয়; অর্থনীতির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে। কারণ বাংলাদেশ এখন এমন একটি সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর এই চারটি বিষয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনা বিনিয়োগ এলে বাংলাদেশ তিনটি বড় সুবিধা পেতে পারে; প্রথমত, নতুন শিল্প; দ্বিতীয়ত, দক্ষ জনশক্তি; তৃতীয়ত, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা জ্ঞান।
বিডা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানাযায়, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল। দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটিয়ে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এর নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এই শিল্পাঞ্চলের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা চীনের অগ্রাধিকারমূলক ঋণের মাধ্যমে আসার কথা। প্রকল্পের মধ্যে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, বর্জ্য ও বর্জ্যপানি ব্যবস্থাপনা এবং শিল্পকারখানার জন্য জেটি-সুবিধা রয়েছে। এই শিল্পাঞ্চলের অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কর্ণফুলী টানেলের কাছে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে। ফলে শিল্পাঞ্চলটি ভবিষ্যতে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক একটি বড় উৎপাদন ও রপ্তানি-লজিস্টিকস হাবে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধন দীর্ঘদিনের ও সুদৃঢ়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর দুই দেশের যৌথ ভবিষ্যতের কমিউনিটি গঠনের ভিত্তিকে সুসংহত করেছে। ইতোমধ্যে ১১০টির বেশি চীনা কোম্পানি এই শিল্পাঞ্চল পরিদর্শন করেছে এবং ৩০টির বেশি কোম্পানি বিনিয়োগের আগ্রহপত্র দিয়েছে। সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার এবং এসব বিনিয়োগ থেকে ১ লাখের বেশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে বিডার তথ্য অনুযায়ী, শিল্পাঞ্চলটি পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হলে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ এবং ১ লাখের বেশি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।
চীনা সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো মোংলা বন্দর। দুই দেশ মোংলা বন্দর সুবিধা আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সাথে বৈঠকে। ৩০ আগস্ট রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে এ বিষয়ে অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন। মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়লে শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নয়, দেশের সামগ্রিক আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। খুলনা, যশোর, বরিশালসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্প ও কৃষিপণ্য দ্রুত পরিবহনের সুযোগ তৈরি হলে নতুন শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনাও বাড়বে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিডার সূত্রে জানাযায়, চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (সিইআইজেড)-এ তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইলের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, চিকিৎসা সরঞ্জামসহ উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও চীনা বিনিয়োগকারীদের সেমিকন্ডাক্টর, উচ্চপ্রযুক্তি ও কৌশলগত শিল্পে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় এফডিআই উৎসে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের এফডিআই স্টক -এর প্রায় ৮.৭৮ শতাংশ চীনের; হংকংকে আলাদাভাবে ধরলে চীনা উৎসের অংশ আরও বড় হয়। বাংলাদেশের ইপিজেড-গুলোর চিত্রও একই কথা বলছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘বিইপিজেডএ’ ৩৬টি কোম্পানির সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি করেছে, যার মধ্যে ২৩টি চীনা মালিকানাধীন বা চীনা যৌথ উদ্যোগ। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৪৯৮.৮৬ মিলিয়ন ডলার।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, চীনা বিনিয়োগের প্রকৃত সাফল্য শুধু কত ডলার বিনিয়োগ হলো, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। দেখতে হবে এই বিনিয়োগ থেকে বাংলাদেশ কত পণ্য উৎপাদন করে চীনসহ তৃতীয় দেশের বাজারে রপ্তানি করতে পারছে। চীনা কোম্পানিগুলোর আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের সঙ্গে বাংলাদেশের কারখানাগুলো যুক্ত হতে পারলে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ইলেকট্রনিকস, জুতা, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক যানবাহনের যন্ত্রাংশ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম রপ্তানির সম্ভাবনা বাড়তে পারে। তিনি বলেন, শুধু বিনিয়োগই নয় চীনের সাথে আমাদের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কও জোরদার করার দরকার। চীনের তৈরি উচ্চপ্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পের সাথে বাংলাদেশকে যুক্ত করা জরুরি।
চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের বক্তব্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার লক্ষ্যটি বেশ পরিষ্কার। চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (সিইআইজেড)-এর ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এই শিল্পাঞ্চল বাংলাদেশের শিল্প ও সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করতে, রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান তৈরিতে সহায়তা করবে। চীন শিল্পাঞ্চলটির নির্মাণ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং আরও উচ্চমানের চীনা প্রতিষ্ঠান আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত বলেও তিনি জানান।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী এবং দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে নতুন কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো হবে। তিনি জানান, চীনের সঙ্গে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক ‘২+২’ সংলাপের ভিত্তি তৈরির কাজ চলছে এবং পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে এটি শুরু হবে। একই সঙ্গে দ্রুত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের কৌশলগত সংলাপ শুরুর বিষয়েও দুই পক্ষ আলোচনা করেছে। এখানে অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। কারণ একটি দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত সংলাপ নিয়মিত হলে বিনিয়োগ, বাণিজ্য, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও আঞ্চলিক যোগাযোগের বিষয়গুলোকে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত কাঠামোর মধ্যে আনা সহজ হয়।
বিশিষ্ট সিনিয়র কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ সাকিব আলী মনে করেন, বাংলাদেশের জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পরবর্তী বাণিজ্য বাস্তবতায়। তার মতে, চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের একটি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের পরিবর্তন বাংলাদেশকে নতুন সুযোগ দিচ্ছে। তিনি বলেন, চীনা বিনিয়োগ বাড়লে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে সহায়তা হতে পারে। তার মতে, এক্ষেত্রে আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (সিইআইজেড) শিল্পায়নের বড় অনুঘটক হতে পারে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) কৌশলগত বিশ্লেষকরাও একই মত দিয়েছেন।