সংগ্রাম ডেস্ক
ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মোট ১১ জন নিহত হয়েছেন বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। গতকাল বুধবার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশে মার্কিন বাহিনীর সর্বশেষ হামলার পর এই প্রাণহানির সংখ্যা সামনে আসে।খুজেস্তান প্রদেশের নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগকারী বিষয়ক উপ-গভর্নর জানান, তিন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের রাতের বেলার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সাতজন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা এই তথ্য প্রকাশ করেছে।এর আগে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানায়, দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক কাউন্টিতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় এক শিশুসহ চারজন নিহত এবং ৫০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন।
টাইমস অব ইসরায়েল, রয়টার্স, আল-জাজিরা, এএফপি, প্রেস টিভি, এক্স, ফক্স নিউজ।
বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলা যুদ্ধাপরাধ
দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণঘাতী হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘এই অবৈধ ও বেছে নেওয়া যুদ্ধের সত্যতাÑএবং যুদ্ধাপরাধের প্রকৃত চেহারাÑসিরিকে দেখা গেছে। সেখানে আমেরিকার ব্যর্থতা আড়াল করার মরিয়া প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে নির্মমভাবে বোমা হামলা চালানো হয়েছে।’ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, মার্কিন বিমান হামলায় এক শিশুসহ অন্তত চারজন নিহত এবং ৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।ইরান সরকারের একটি অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত ভিডিওতে হামলার পর সিরিকে যে স্থানে বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছিল বলে দাবি করা হয়েছে, সেখানে ধ্বংসাবশেষ ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা যায়। ভিডিওতে পেছন থেকে মানুষের চিৎকারের শব্দও শোনা যায়।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভিডিওতে কনের বাবা আলী মাল্লাহী বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এটি একটি আবাসিক ভবন। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান চলার সময়ই ঘটনাটি ঘটেছে।’
তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক একটি ঘটনাৃ আল্লাহর শুকরিয়া, হতাহতের সংখ্যা বেশি হয়নি।’তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিন্স দাবি করেছেন, ‘আইআরজিসির বিপরীতে মার্কিন সামরিক বাহিনী কখনো বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানায় না।’ এখানে তিনি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কথা উল্লেখ করেন।
ইরানের পাল্টা হামলায় বহু মার্কিন সেনা নিহত
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে আঞ্চলিক বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। এতে বহু মার্কিন সেনা নিহতের দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তারা এ দাবি করে। আইআরজিসি জানায়, তারা জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ভারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে এবং এতে ‘বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা নিহত’ হয়েছে।
তবে জর্ডানে ইরানের হামলায় এখন পর্যন্ত কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন দুই মার্কিন কর্মকর্তা। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তারা বলেন, প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতেই এই মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং ইরানের হামলা অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে। ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দেশটির সামরিক বাহিনী বাহরাইনে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি শত্রুতাপূর্ণ ড্রোন হামলা মোকাবিলা করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে।
জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ১০টি ভূপাতিত করা হয়েছে এবং তিনটি প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বাহরাইন জানিয়েছে, ইরানের কয়েকটি ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে। আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় এরবিলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে তাদের স্থলবাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত হামলা চালিয়েছে। এতে একটি মেরামতকেন্দ্র, কারিগরি সরঞ্জাম রাখা কয়েকটি গুদাম এবং মার্কিন নজরদারি বেলুন নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা। একইসঙ্গে কয়েকটি জ্বালানি ট্যাংকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া এবং কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার দাবিও করেছে আইআরজিসি। তবে ইরাক কিংবা যুক্তরাষ্ট্র কেউই এরবিলে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতটি গত সপ্তাহান্তের হামলার আগে মূলত অর্থনৈতিক অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছিল। সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের লারাক দ্বীপে হামলা চালানোর পর ইরান জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
এদিকে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নতুন করে কোনো যুদ্ধবিরতি হওয়ার সম্ভাবনাকে গুরুত্বহীন করে দেখিয়েছেন। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল। তবে ইরানের হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণে সেটি দ্রুত ভেঙে পড়ে। ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, ইরানের সঙ্গে আর কোনো চুক্তি করার অর্থ নেই। তার ভাষায়, এমন চুক্তি ‘যে কাগজে লেখা হবে, তারও মূল্য থাকবে না’। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে অনেক সুযোগ দিয়েছে।
সৌদিতে মার্কিন নাগরিকদের জরুরি বার্তা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা বেড়ে যাওয়ায় সৌদি আরবে অবস্থানরত নিজ নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে দেশটিতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস।এক সতর্কবার্তায় মার্কিন দূতাবাস বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো জটিল। পরিস্থিতির অপ্রত্যাশিত অবনতির আশঙ্কাও রয়েছে। এতে আরও বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি সম্ভাব্য ফ্লাইট বাতিল, আকাশসীমা বন্ধ এবং ভ্রমণসংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের বিঘেœর বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে দূতাবাস। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবে মার্কিন নাগরিকদের জন্য এই সতর্কতা জারি করা হলো।