মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান) এমপি

২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রাতে কাশিমপুর কারাগারের ফাঁসির মঞ্চ থেকে আমার বাবা মীর কাশেম আলী তার রবের সাক্ষাতে চলে গেলেন। প্রতি বছর এই দিনটি এলে আমি নিজেকে প্রশ্ন করিÑআমার বাবা আসলে কে ছিলেন? পত্রিকার পাতায় তার পরিচয় লেখা হয় নানাভাবে: সফল উদ্যোক্তা, রাজনৈতিক সংগঠক, ইসলামী আন্দোলনের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। সবগুলোই সত্য। কিন্তু একজন ছেলে হিসেবে, যে আট বছর আয়নাঘরের অন্ধকারে বাবার মুখটি স্মরণ করে করে বেঁচে থেকেছে, আমি বলবÑএই সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নবাজ। এমন এক মানুষ, যিনি স্বপ্ন দেখতেন, স্বপ্ন দেখাতেন এবং স্বপ্নের পেছনে ছুটে জীবন বিলিয়ে দিতেন।

ক্যাম্পাসের স্বপ্ন

ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন তার প্রাণপ্রিয় সংগঠনÑশহীদী কাফেলা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের দায়িত্বশীল। তখন থেকেই তিনি একটি স্বপ্ন লালন করতেন: একদিন এই কাফেলা দেশের প্রতিটি ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়বে; সমাজের সব স্তর থেকে মেধাবী তরুণেরা এর পতাকাতলে জড়ো হবে; এমন দিন আসবে যখন অভিভাবকেরা নিজে এসে সন্তানকে শিবিরের হাতে তুলে দেবেনÑএই আশায় যে, তাদের সন্তান একই সঙ্গে অর্জন করবে ইসলামী মূল্যবোধ ও শিক্ষাগত উৎকর্ষ।

সেই স্বপ্নকে দশকের পর দশক ঠাট্টা করা হয়েছে, দমন করা হয়েছে, রক্তাক্ত করা হয়েছে। তারপর এল ডাকসু নির্বাচনের সেই রাত। আমি সারারাত জেগে পর্দায় চোখ রেখে ফলাফলের আপডেট দেখছিলাম। শেষে যখন ঘোষণা এলÑপূর্ণ প্যানেলে শিবিরের বিজয়Ñ আমি একটি শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম। মোনাজাতে বলেছিলাম, “ইয়া আল্লাহ, আমার বাবার রুহকে জানিয়ে দিনÑতার স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে।” এরপর জাকসু, জকসু, চাকসুÑএকের পর এক। যে ক্যাম্পাসগুলোতে একদিন তার কাফেলার সন্তানেরা মাথা উঁচু করে হাঁটতে পারত না, সেখানে আজ তারা ছাত্রসমাজের নির্বাচিত প্রতিনিধি। বাবা, আপনি দেখছেন তো?

সুস্থ বাংলাদেশের স্বপ্ন

তিনি স্বপ্ন দেখতেন, এ দেশে চিকিৎসা হবে সাশ্রয়ী এবং মানসম্মতÑদুটো একসঙ্গে। যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে তিনি শ্রম দিয়েছেন, তার জন্য তার মানদ- ছিল সহজ: খরচ হবে অভিজাত বেসরকারি হাসপাতালের চেয়ে কম, সেবা হবে সরকারি হাসপাতালের চেয়ে ভালো। তিনি ব্যথিত হতেন এই ভেবে যে, চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশ প্রতিবছর শত শত কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা হারায়। তার স্বপ্ন ছিল, একদিন এই দেশ নিজেই হয়ে উঠবে মেডিকেল ট্যুরিজমের বৈশ্বিক গন্তব্যÑমানুষ চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশে আসবে, বাংলাদেশ ছেড়ে যাবে না।

আদলের অর্থনীতির স্বপ্ন

তার সবচেয়ে বড় স্বপ্নগুলোর একটি ছিল ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতিÑকুরআনের ‘আদল’-এর নীতিতে গড়া এক ইনসাফপূর্ণ অর্থব্যবস্থা, যেখানে সুদের শোষণ থাকবে না, সম্পদ কেবল কয়েকজনের হাতে কুক্ষিগত হবে না। এই স্বপ্ন নিয়েই তিনি সেই দলের একজন হয়ে দিনরাত পরিশ্রম করেছিলেন, যারা এ দেশে একটি ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাদের বিশ্বাস ছিল: এই প্রতিষ্ঠান সফল হলে বাংলাদেশের মানুষ ইসলামী অর্থব্যবস্থার ওপর আস্থা পাবে। আলহামদুলিল্লাহ, সেই প্রতিষ্ঠান আজ দেশের সবচেয়ে বড় ও সফল আর্থিক প্রতিষ্ঠান। মানুষ আস্থা পেয়েছে। স্বপ্নটি প্রমাণিত হয়েছে।

তিনি পৃথিবীর নানা প্রান্ত চষে বেড়িয়েছেনÑএকটি জিনিসের খোঁজে: আইডিয়া। যা কিছু দেখতেন, ভাবতেনÑএটি কি বাংলাদেশে সম্ভব? এভাবেই তিনি গড়তে চেয়েছিলেন একটি ‘বাংলাদেশি স্বপ্ন’। তিনি কখনো স্বপ্ন দেখা থামাননি, কখনো আইডিয়ার সন্ধান থামাননি... যতদিন না ফ্যাসিস্টরা তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র সম্পন্ন করল।

সবচেয়ে বড় স্বপ্ন

কিন্তু তার সবচেয়ে বড় স্বপ্নটি আমি জেনেছি মৃত্যুর সামনে তার অবিচল দাঁড়িয়ে থাকা থেকে। ফাঁসির রায় শুনে যে মানুষ বিচলিত হন না, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যার চোখে ভয়ের বদলে থাকে প্রশান্তিÑতার কাছে নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে যা এই দুনিয়ার চেয়ে বড়। আমি বুঝেছি, যেদিন তিনি ইসলামী আন্দোলনের কাফেলায় নাম লিখিয়েছিলেন, সেদিন থেকেই তিনি একটি স্বপ্ন বুকের গভীরে লালন করে এসেছেনÑ শাহাদাতের স্বপ্ন। জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ স্থানের স্বপ্ন। সেই দলে শামিল হওয়ার স্বপ্ন, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন: “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদের মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত, তাদের রবের কাছে রিযিকপ্রাপ্ত” (সূরা আলে ইমরান: ১৬৯)। কঠিন হিসাব থেকে অব্যাহতির স্বপ্ন। চূড়ান্ত সাফল্যের স্বপ্ন।

ফাঁসির মঞ্চ তার কাছে ছিল না পরাজয়Ñছিল স্বপ্নপূরণের সিঁড়ি। জালিমেরা ভেবেছিল, মীর কাশেম আলীকে শেষ করে দিচ্ছে। তারা জানত না, তারা কেবল একজন স্বপ্নবাজের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটিকে পূর্ণ করে দিল।

হে বাংলাদেশের তরুণ

আজ সেই ফ্যাসিবাদ ধূলিসাৎ। যারা তাকে হত্যা করেছিল, ইতিহাস তাদের নাম লিখছে লজ্জার কালিতে। আর যে স্বপ্নগুলো তিনি রেখে গিয়েছিলেন, সেগুলো একে একে সত্যি হচ্ছে। এটাই স্বপ্নবাজদের নিয়তি: তারা চলে যান, তাদের স্বপ্ন থেকে যায়।

তাই হে বাংলাদেশের তরুণ, আসুন আমরা স্বপ্নবাজ হই। স্বপ্ন দেখি এমন এক মাতৃভূমির, যেখানে চিকিৎসার জন্য কাউকে সীমান্ত পাড়ি দিতে হবে না, যেখানে অর্থনীতি চলবে ইনসাফের ভিত্তিতে, যেখানে জ্ঞান ও ঈমান হাতে হাত রেখে চলবে। কিন্তু সেই সঙ্গে দেখি এর চেয়েও বড় স্বপ্নÑসেই দলে শামিল হওয়ার স্বপ্ন, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন: “আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট” (সূরা বাইয়্যিনাহ: ৮)।

দুনিয়ার স্বপ্ন আর আখিরাতের স্বপ্নÑদুটো আলাদা নয়। আমার বাবা দুটোকে একসঙ্গে দেখেছিলেন, একসঙ্গে বেঁচেছিলেন। এটাই ছিল তার স্বপ্নবাজ জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

ইয়া আল্লাহ, আমার বাবার শাহাদাত কবুল করুন। তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ স্থানে জায়গা দিন। আর আমাদের এমন স্বপ্নবাজ বানান, যারা স্বপ্নের পথে হাঁটতে হাঁটতে একদিন আপনার সন্তুষ্টির যোগ্য হয়ে উঠতে পারে। আমিন।

লেখক: সংসদ সদস্য, ঢাকা-১৪; বিরোধীদলীয় নেতার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ; শহীদ মীর কাশেম আলীর পুত্র।