বিলের রিপোর্ট নিয়ে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের বিতর্ক

সংসদ রিপোর্টর

সংসদীয় কমিটির কাঙ্খিত সভাপতি পদ না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশের পর অধিবেশনের শেষ মুহুর্তে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা। এরআগে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং মানবাধিকার কমিশন বিলের প্রতিবেদন উত্থাপনকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। বিরোধী দলের অভিযোগ, প্রস্তাবিত আইনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ রাখা হয়নি। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ২০২৫ সালের গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশের চেয়ে প্রস্তাবিত আইনটি আরও শক্তিশালী।

গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বিলের প্রতিবেদন উত্থাপনের সময় এ বিতর্ক হয়। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনে ১০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের পর অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা। তবে, বিরোধী জোটের শরীক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ ও খেলাফত মজলিসের সদস্য সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা অধিবেশন কক্ষে ছিলেন। তারা অধিবেশন সমাপ্তি ঘোষণার পর অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হন।

কমিটি গঠনের পর ফ্লোর নেন বিরোধী দলীয় উপনেতা ডা, সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি দলের আচরণে আমাদের সংসদের থাকার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। সরকারি দলের সঙ্গে আলোচনায় বিরোধী দলের আসন অনুপাতে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার থাকলেও সেই প্রতিশ্রুতি রাখা হয়নি। আগের দিনও এ নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে। সেদিন কমিটি গঠন না করে চিফ হুইপ সভাপতি পদ পেতে শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন। এটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্লোর নিলে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা একে একে রেরিয়ে যান। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কমিটি গঠনের বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।

এরআগে বিলের রিপোর্ট উত্থাপনকালে আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নতুন আইনে গুমের শিকার ব্যক্তি বা তাঁর পরিবার সরাসরি আদালতে যেতে পারবেন। গুমের বিভিন্ন ধরন সংজ্ঞায়িত করে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদ-, জরিমানা ও ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এখতিয়ার এবং আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও ভুক্তভোগীদের মামলা করতে নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হতো। নতুন আইনে সরাসরি আদালতে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ‘এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ বা জোরপূর্বক গুমের বিচার আগের মতোই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) এখতিয়ারে থাকবে। পাশাপাশি গুমের অন্যান্য ধরনও আইনে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

গুমের ঘটনায় ক্ষতিপূরণের দায় যার ওপর বর্তাবে তার সম্পত্তি না থাকলেও সরকার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দায়িত্ব নেবেÑএমন বিধানও রাখা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টিও আইনে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, আইন দুটি আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে প্রণয়ন করা উচিত, যাতে সরকারি ও বিরোধী দলের সবার অংশগ্রহণে এগুলো চূড়ান্ত করা যায়।

এরআগে বিতর্কে অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাশেম (আরমান) বলেন, প্রস্তাবিত আইনের কিছু বিধান কোনো সাধারণ ‘গ্যাপ’ নয়। এর মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে জবাবদিহির বাইরে থাকার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘তোমরা যা খুশি তাই করো, তোমাদের জবাবদিহিতা আনার কোনো সুযোগ আমরা রাখলাম না’Ñএমন একটি সংকেত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দেওয়া হচ্ছে। তিনি অভিযোগ, এর ফলে গুম, নির্যাতন বা অন্যায় করলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ থাকবে না। তিনি এটিকে ‘অসৎ উদ্দেশ্য’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আইনটি পাসের আগে দফাওয়ারি আলোচনার সময় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য দেওয়া হবে।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিলটি পাসের আগে সংশোধনী আনার সুযোগ রয়েছে। যৌক্তিক সংশোধনী এলে তা বিবেচনা করা হবে।

এদিকে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল পরীক্ষা করে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিগুলো প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করেছে। এর মধ্যে মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়ে আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কয়েকটি পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে।

কমিটির সভাপতি নওশাদ জমির প্রতিবেদন উপস্থাপন করলে আপত্তি জানান বিরোধী দলের সদস্য নাজিবুর রহমান। তিনি বলেন, কমিটির আলোচনায় তাঁরা কেন অংশ নেননি, সে বিষয়ে লিখিত বক্তব্য দেওয়া হলেও তা প্রতিবেদনে রাখা হয়নি। অথচ প্রতিবেদনের এক জায়গায় তাঁদের ‘সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের’ কথা বলা হয়েছে।

জবাবে নওশাদ জমির বলেন, বিরোধী দলের সদস্যরা কমিটির সামনে বক্তব্য দিয়েছিলেন। তবে বিস্তারিত আলোচনা শুরুর আগে তাঁরা কক্ষ ত্যাগ করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কমিটির বৈঠক থেকে ওয়াকআউটের ঘটনা সম্ভবত নজিরবিহীন। বিরোধী দলের সদস্যরা তাঁদের বক্তব্য নোট অব ডিসেন্ট হিসেবে দিলে তা প্রতিবেদনে রাখা যেত।

জবাবে নাজিবুর রহমান বলেন, তাঁরা লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। সেটি প্রতিবেদনে না থাকায় প্রতিবেদনটি অসম্পূর্ণ।

বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহেরও তাঁদের বক্তব্য প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কমিটির বৈঠকে কে কী বলেছেন, সাধারণত তা প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ থাকে না। তবে ‘সক্রিয়’ শব্দটি নিয়ে আপত্তি থাকলে তা বাদ দেওয়ার বিষয়টি স্পিকার বিবেচনা করতে পারেন।

ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, বিল পাসের আগে দফাওয়ারি আলোচনায় সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাবেন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের সংশোধিত প্রস্তাবে একজন নারী কমিশনারের পাশাপাশি একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সদস্য রাখার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। কমিশন গঠনের বাছাই কমিটিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি অথবা তাঁর মনোনীত মানবাধিকার বিষয়ে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সাংবাদিককে যুক্ত করার সুপারিশও করা হয়েছে। এ ছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের সময় কোনো স্থান, অফিস-আদালত, হাজতখানা বা আটককেন্দ্র পরিদর্শনের ক্ষেত্রে ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে’Ñএই শর্ত বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।

১০টি সংসদীয় কমিটি গঠন ॥ বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও সেলিমা রহমানকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করে গতকাল সংসদে ১০টি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। সেলিমা রহমানকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভপতি করা হয়েছে। এছাড়া জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুলকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। সেলিম ভুইয়াকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীকে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, কলিম উদ্দিন আহমেদকে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, আমান উল্লাহ আমানকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, হুইপ জিকে গউছকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, নাসের রহমানকে ভুমি মন্ত্রণালয় এবং রফিকুল ইসলাম জামালকে ধর্ম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়।