বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর নিবন্ধন ফি ১ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রতিবাদ জানিয়েছে ২২টি সংগঠন। নির্ধারিত ফি কমানোর দাবি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পাশাপাশি নিবন্ধন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংগঠনগুলো।
গত সোমবার (৩১ আগস্ট) নিবন্ধনের শেষ দিন পার হলেও এসব সংগঠনের কোনোটিই নিবন্ধন করেনি। সংগঠনগুলোর দাবি, নিবন্ধন ফি যৌক্তিক পর্যায়ে কমানো হলে পরবর্তীতে নিবন্ধনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গত ১৩ জুলাই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করে। এতে নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সঙ্গে সোনালী ব্যাংকের বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় ১ হাজার টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তের পর থেকেই নিবন্ধন ফি কমানোর দাবি জানিয়ে আসছে সংগঠনগুলো। তাদের ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশে এসব সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেখানে নিবন্ধনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ নির্ধারণ সংগঠনগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
নিবন্ধন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে বরিশাল ইউনিভার্সিটি কুইজ সোসাইটি, বরিশাল ইউনিভার্সিটি এনভায়রনমেন্ট কনজার্ভেশন সোসাইটি, বিইউ রেডিও, বরিশাল ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি, বরিশাল ইউনিভার্সিটি বিজনেস ক্লাব, বরিশাল ইউনিভার্সিটি ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, বরিশাল ইউনিভার্সিটি রিসার্চ সোসাইটি, পদাতিক, বরিশাল ইউনিভার্সিটি আইটি সোসাইটি, প্রথম আলো বন্ধুসভা, বাঁধন (ববি ইউনিট), বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম (ববি শাখা), বরিশাল ইউনিভার্সিটি সায়েন্স ক্লাব, সমকাল সুহৃদ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, সেইভ ইউথ বিইউ চ্যাপ্টার, বরিশাল ইউনিভার্সিটি ক্রিকেট ক্লাব, ইউথ ইনডিং হাঙ্গার-বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল ইউনিভার্সিটি প্রেস ক্লাব ও বরিশাল ইউনিভার্সিটি গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স ক্লাবসহ আরও কয়েকটি সংগঠন।
জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা’ ২০২১ সালে ৩৪তম একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদিত এবং পরবর্তীতে ৭২তম সিন্ডিকেটে পাস হয়। ওই প্রবিধান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৬ জুলাই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য নয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরে ওই কমিটির মাধ্যমে নিবন্ধন ফি ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
তবে সংগঠনগুলোর দাবি, ২০২২ সালে নিবন্ধনের উদ্যোগ নেওয়ার সময় প্রতিটি সংগঠনের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছিল। সে সময় নিবন্ধন কার্যক্রম আর এগোয়নি। এবার একই ধরনের নিবন্ধনের জন্য ১০০ টাকার পরিবর্তে ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করায় প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনগুলো।
তাদের দাবি, ৭২তম সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্ট পরিপত্রে যৌক্তিকতার ভিত্তিতে নিবন্ধন ফি নির্ধারণের কথা উল্লেখ রয়েছে। চার বছর আগে যেখানে ১০০ টাকা নেওয়া হয়েছিল, সেখানে এবার হঠাৎ করে ১ হাজার টাকা নির্ধারণের যৌক্তিকতা কী—এ প্রশ্নও তুলেছে তারা।
শিক্ষার্থীদের একাংশও প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, যোগাযোগ, সৃজনশীলতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব সংগঠনকে সহযোগিতা করার পরিবর্তে অতিরিক্ত নিবন্ধন ফি আরোপ করা হলে শিক্ষার্থীদের সংগঠনভিত্তিক কার্যক্রমে আগ্রহ কমতে পারে।
এ ছাড়া সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৪০০ টাকা ‘সাংস্কৃতিক ফি’ নেওয়া হয়। তবে এ অর্থ কোন খাতে ব্যয় করা হয়, সে বিষয়ে তাদের কাছে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নিয়মিত কোনো আর্থিক সহযোগিতাও পায় না বলে দাবি তাদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিইউ রেডিওর সভাপতি নাজমুল হোসেন বলেন, আজ থেকে ৭/৮ বছর আগে সংগঠনগুলো টিএসসিতে একবার রেজিস্ট্রেশন করেছে। তখন আমরা ১০০ টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করেছিলাম। এখন রেজিস্ট্রেশন নবায়নের জন্য ১ হাজার টাকা চার্জ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় সামাজিক সংগঠনগুলোকে কোনো রকম সুবিধা দেয় না। অন্যদিকে, রেজিস্ট্রেশন ফি ধার্য করা হয়েছে ১ হাজার টাকা। হয়তোবা পূর্বের রেজিস্ট্রেশন ফি ১০০ টাকা বেড়ে ২০০ বা ৩০০ টাকা হতে পারে, কিন্তু একসঙ্গে ১ হাজার টাকা—সংগঠনগুলোর জন্য একটা বার্ডেন ক্রিয়েট করছে। অনেক সংগঠন আছে, যারা নতুন, মাত্র তাদের যাত্রা শুরু করেছে। এক্ষেত্রে ১ হাজার টাকা তাদের জন্য অনেক বড় বোঝা। তাই আমরা সকল সংগঠন মিলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছি। আশা করি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেবেন।
বরিশাল ইউনিভার্সিটি ইনভায়রনমেন্ট কনজার্ভেশন সোসাইটির সভাপতি নাইমুর রহমান সজিব বলেন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে, যেগুলো অধিকাংশই স্বেচ্ছাসেবী এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে আয়ের কোনো উৎস নেই। শিক্ষার্থীরা বাৎসরিক বা মাসিক কিছু চাঁদার মাধ্যমে পরিচালনা করে থাকে। সেখানে সামাজিক সংগঠনগুলোর যে নিবন্ধন ফি ১ হাজার টাকা রাখা হয়েছে, যেটা অনেক বেশি এবং অধিকাংশ সংগঠনের সেটা বহন করার সক্ষমতা নেই। তাই আমি মনে করি, এই নিবন্ধন ফি কমিয়ে সাধ্যের মধ্যে আনা হোক এবং যেহেতু সামাজিক সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গলের জন্যই কাজ করে থাকে, সে কারণে কোনো নিবন্ধন ফি না রাখাই উচিত। আশা করি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এটা যথাযথভাবে ভেবে দেখবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নিবন্ধন কমিটির সদস্য সচিব ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের পরিচালক তরিকুল হক বলেন, আমরা একটা স্মারকলিপি পেয়েছি, সেখানে অনেকগুলো যৌক্তিক পয়েন্ট আমি দেখেছি। এ বিষয়ে আমাদের একটি কমিটি রয়েছে। এখন আহ্বায়ক এ বিষয়ে মিটিং ডাকলে সেখানে আলোচনা হবে। যেহেতু আবেদনপত্র দিয়েছে, সেহেতু এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ আছে।