স্টাফ রিপোর্টার
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধান, সত্য উদ্ঘাটন, বিচার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে রাজধানীতে পদযাত্রা ও সমাবেশ করেছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালন জাতীয় কমিটি। একই সঙ্গে গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিলের প্রতিবাদ জানিয়ে এবং আগের অধ্যাদেশ বহাল রাখার দাবিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে সংগঠনটি।
গতকাল রোববার বিকেল ৩টায় রাজধানীর বাংলামোটরে সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হয়। পরে সেখান থেকে পদযাত্রা করে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে গিয়ে সমাবেশ করেন নেতাকর্মীরা। সমাবেশ চলাকালে কমিটির একটি প্রতিনিধি দল স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি জমা দেয়। কর্মসূচিতে ১১ দলীয় ঐক্য সংহতি প্রকাশ করে।
জাতীয় সংসদের সামনে সমাবেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গুমের শিকার সংগ্রামী জনতা, জুলাই যোদ্ধা ও ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে যারা গুমের শিকার হয়েছেন, তাদের স্মরণে আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, গুমের বিরুদ্ধে যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, তা বাতিল করে গুমের ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের হাতে দিয়ে সরকার আবার গুম করার ষড়যন্ত্র করছে। গুম প্রতিরোধের আগের অধ্যাদেশ বহাল রাখতে হবে। যারা গুম করে, তাদের হাতে তদন্তের দায়িত্ব থাকতে পারে না।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে জনগণ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশে আর গুম-খুনের আস্তানা চলতে পারে না। জুলাই সনদে মানবাধিকার রক্ষা ও গুম প্রতিরোধে চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে সেখানে নামেমাত্র একটি কমিটি করতে চায়।
স্পিকারকে স্মারকলিপি দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ব্রিগেডিয়ার (অব.) হাসিনুর রহমান বলেন, তারা অনেক আশা নিয়ে স্পিকারের কাছে গিয়েছিলেন। স্মারকলিপিতে উত্থাপিত সব বিষয় তাকে জানানো হয়েছে। স্পিকার তাদের সঙ্গে দ্বিমত করেননি এবং সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, বর্তমান আইনের মাধ্যমে গুমের ঘটনা যথাযথভাবে প্রমাণ করাও কঠিন। আমরা এ ধরনের আইন চাই না। ধৈর্যেরও সীমা আছে। আগামী ৫ সেপ্টেম্বরের লংমার্চসহ সব কর্মসূচি সফল করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জাগপার সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসে গণভোটের গণরায়ের সঙ্গে বেঈমানি করে যে যাত্রা শুরু করেছে, তারই ধারাবাহিকতায় গুম অধ্যাদেশ বাতিল করেছে। এর মাধ্যমে গুমের বিচার প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে।
কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, বর্তমান সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল করেছে। সরকারের আনা কিছু অধ্যাদেশ আগের ফ্যাসিবাদী সরকারের চেয়েও খারাপ দাবি করে তিনি এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাশেম আরমান এমপি বলেন, আল্লাহ তাদের দ্বিতীয় জীবন দিয়েছেন। এমন আইন প্রণয়ন করতে হবে, যাতে কাউকে গুম করার আগে অপরাধীরা দশবার চিন্তা করে। গুমবিরোধী আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
স্মারকলিপিতে যা আছে
স্পিকারের কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে বাংলাদেশে সংঘটিত গুম, গোপন আটক, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সত্য উদ্ঘাটন, দায়ীদের বিচার, ভুক্তভোগী ও পরিবারের ন্যায়বিচার এবং গুম প্রতিরোধে স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা ও কার্যকর আইন প্রণয়নের দাবি জানানো হয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস শুধু নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্মরণ করার দিন নয়; এটি রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহির প্রশ্ন তোলার দিন। কোনো নাগরিককে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নামে আইনের বাইরে নিয়ে গিয়ে অদৃশ্য করে দেওয়া যায় কি না এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, গত প্রায় দেড় দশকে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, মতপ্রকাশকারী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীসহ বহু মানুষকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া, গোপন স্থানে আটক, নির্যাতন এবং পরে তাদের অবস্থান অস্বীকার করার অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে।
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের উল্লেখ করে স্মারকলিপিতে বলা হয়, কমিশনের কাছে ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাইয়ের পর ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে শনাক্ত করা হয় এবং ২৮৭টি ঘটনা ‘নিখোঁজ ও মৃত’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।
স্মারকলিপিতে ‘আয়নাঘর’কে গোপন আটক ও নিপীড়নের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
এতে বলা হয়, গুমের বিচার শুধু অতীতের অপরাধের বিচার নয়; এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে নিরাপদ করার লড়াই। গুমের অভিযোগের তদন্ত কোনো পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা বা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে এককভাবে দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনী বা তাদের নিয়ন্ত্রিত কোনো সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত করানো হলে স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবে।
এ জন্য গুমের অভিযোগ তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন বা কার্যকর তদন্তব্যবস্থা গঠনের দাবি জানানো হয়।
স্মারকলিপিতে রিফবংঢ়ৎবধফ ড়ৎ ংুংঃবসধঃরপ প্রকৃতির গুমের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার কীভাবে কার্যকর হবে, তা আইনে স্পষ্ট করার দাবি জানানো হয়। কোনো ঘটনা তদন্তের শুরুতে সাধারণ গুম হিসেবে বিবেচিত হলেও পরবর্তীতে বৃহত্তর, পরিকল্পিত বা ধারাবাহিক অপরাধের অংশ হিসেবে প্রমাণিত হলে কীভাবে সেটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যাবে—তারও সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি কোনো ব্যক্তি, সংগঠিত অপরাধী চক্র, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো হড়হ-ংঃধঃব ধপঃড়ৎ গুম, অপহরণ, বেআইনি আটক বা গোপন আটকের মতো অপরাধ করলে তাদেরও বিচারের আওতায় আনার জন্য আইনে সুস্পষ্ট সংজ্ঞা ও বিচারিক প্রক্রিয়া নির্ধারণের দাবি জানানো হয়।
স্মারকলিপিতে আরও দাবি করা হয়, গত ১৫ বছরের সব গুমের ঘটনা পুনরায় যাচাই করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান নির্ধারণ, জীবিত থাকলে উদ্ধার এবং মৃত্যুর প্রমাণ থাকলে পরিবারকে সত্য জানানো; ‘আয়নাঘর’সহ সব গোপন আটককেন্দ্রের তদন্ত; ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ; কমান্ড রেসপনসিবিলিটি নিশ্চিত করা এবং গুম সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের আগে ভুক্তভোগী পরিবার, মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অর্থবহ পরামর্শ করার ব্যবস্থা করতে হবে।
স্মারকলিপিতে মিরাজ শেখের ঘটনায় হাইকোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়ন করে তার অবস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ঘটনার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জানানো হয়।
পদযাত্রা পূর্ব সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, ব্রিগেডিয়ার (অব.) হাসিনুর রহমান, সাবেক এমপি মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও মানবকণ্ঠের সম্পাদক শহিদুল ইসলামসহ অনেকে।
সংসদ ভবনের সামনের সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ড. রেজাউল করিম, বিডিপির জেনারেল সেক্রেটারি নিজামুল হক নাঈম, গুমের শিকার শাহাদাৎ হোসেন টুটুল, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন ও মাওলানা মাহফুজুর রহমান প্রমুখ।
এ সময় বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসাইন মিয়াজী, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ডা. ফখরুদ্দিন মানিক ও ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবিরসহ বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।