মিয়া হোসেন
সংসদের রেওয়াজ অনুযায়ী সংসদ নেতার পাশে সাধারণত সংসদ উপনেতার আসন হয়ে থাকে। বিরোধীদলীয় নেতার পাশের আসনে বসেন বিরোধীদলীয় উপনেতা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ শুরু হওয়ার পর থেকেই সংসদ নেতার পাশের আসনে বসেছিলেন বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কিন্তু তাকে তখন সংসদ উপনেতার পদ দেয়া হয়নি। এখন তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। আর সেই আসনে তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিন থেকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে বসতে দেখা গেছে। যার কারণে সংসদীয় রাজনীতিতে সরকারী দলের উপনেতার পদ ঘিরে নানা কৌতূহল দেখা দিয়েছে। নানা প্রশ্নেও সৃষ্টি হয়েছে।
সংসদ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংসদ নেতার পর সংসদ উপনেতার পদটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ পদটি সাধারণত দলের সবচেয়ে সিনিয়র ও অভিজ্ঞজনদের দেয়া হয়ে থাকে। আর সংসদ নেতার পাশের আসনেই সংসদ উপনেতা বসতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা কোথাও নেই। সাধারণত সংসদ নেতা সংসদ কার্যক্রমে যাদের কাছ থেকে বেশি সহযোগিতা নেয়ার প্রয়োজন মনে করেন তাদেরকেই তার কাছের আসনে বসার ব্যবস্থা করে থাকেন। তবে এ পর্যন্ত সংসদ নেতার পাশেই বসতেন সংসদ উপনেতা। সংসদ নেতার পাশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগে বসেছিলেন। যার কারণে ঘোষনা ছাড়াই ধরে নেয়া হয়েছিল তিনিই হচ্ছেন সরকারী দলের উপনেতা। এখন তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তার আসনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে বসতে দেখা গেছে। এ নিয়ে বিএনপির ভেতরে এবং রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।
প্রশ্ন উঠেছেÑএটি কি কেবল নিয়মিত আসন পুনর্বিন্যাস, নাকি সংসদে সালাহউদ্দিন আহমদকে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আনার কোনো প্রস্তুতি? এর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে জাতীয় সংসদের উপনেতা পদটি।
তবে এখন পর্যন্ত সালাহউদ্দিন আহমদকে সংসদ উপনেতা করার কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা হয়নি। জাতীয় সংসদের ওয়েবসাইটে ত্রয়োদশ সংসদের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর তালিকাতেও বর্তমানে সংসদ উপনেতার নাম নেই। সেখানে তারেক রহমানকে সংসদ নেতা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
উপনেতার দায়িত্ব আসলে কী?
রাজনৈতিক আলোচনায় সংসদ উপনেতার দায়িত্ব নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তিও রয়েছে। সংসদ উপনেতা প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক বা নির্বাহী দায়িত্ব পালন করেন না। সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে বা তার কর্তৃত্বে প্রয়োগ হয়। প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হওয়ার বিষয়টিও সংবিধানের ৫৭ অনুচ্ছেদে আলাদাভাবে নির্ধারিত।
সংসদের সরকারি ব্যাখ্যায় উপনেতার ভূমিকা হলো সংসদ নেতাকে সংসদীয় কার্যক্রম ও আইন প্রণয়ন-সংক্রান্ত কাজে সহায়তা করা। অর্থাৎ, পদটি মূলত সংসদের ভেতরে নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত; এটি প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী দায়িত্বের বিকল্প নয়। ফলে সালাহউদ্দিন আহমদ ভবিষ্যতে সংসদ উপনেতা হলে এর তাৎপর্য হবে সংসদে সরকারের রাজনৈতিক ও আইন প্রণয়ন কার্যক্রমে প্রধানমন্ত্রীকে সহায়তা করাÑপ্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সরকারের নির্বাহী দায়িত্ব গ্রহণ করা নয়।
কৌতূহলের নেপথ্যে
কৌতূহলের মূল কারণ খুঁজতে গেলে নতুন আসনবিন্যাসটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এতদিন সংসদ নেতা তারেক রহমানের পাশের আসনে বসতেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার পরের আসনে ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এরপরের আসনটি ছিল সালাহউদ্দিন আহমদের। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন। একই সঙ্গে তার ঠাকুরগাঁও-১ সংসদীয় আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে।
নতুন আসনবিন্যাসে ফখরুলের জায়গায় উঠে এসেছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তার পরের আসনে রয়েছেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এরপরের আসনে বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। অর্থাৎ, আগের সারিতে থাকা সালাহউদ্দিন আহমদকে আরও সামনে আনা হয়েছে। একইভাবে ট্রেজারি বেঞ্চের প্রথম সারির আসনবিন্যাসে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নতুন সদস্য আমানউল্লাহ আমানও সামনে এসেছেন। এ কারণেই শুধু একটি আসন বদলের ঘটনা হিসেবে বিষয়টিকে দেখছেন না দলের অনেক নেতা।
জানা গেছে, মির্জা ফখরুলের আসনটি কে পাবেনÑএ নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা ছিল। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, সংসদ নেতা তারেক রহমানের পাশের আসনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান কিংবা অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কেউ আসতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেখানে সালাহউদ্দিন আহমদ বসায় নতুন করে হিসাব শুরু হয়েছে। একটি পক্ষ মনে করছে, চিফ হুইপকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, নতুন আসনবিন্যাস মূলত তারই প্রতিফলন। আবার দলের আরেকটি অংশ মনে করছে, সংসদ নেতাকে সংসদীয় কার্যক্রমে সহায়তা করার জন্য সালাহউদ্দিন আহমদকে সামনে আনা হয়েছে।
বিএনপির অতীতের প্রসঙ্গ তুলে এক নেতা বলেন, দলটি বিভিন্ন মেয়াদে সংসদ উপনেতার পদ পূরণ করেনি। ফলে এবারও পদটি পূরণ করা হবে কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তবে এ নিয়ে দলের কেউ কিছুই জানেন না। সংসদ উপনেতা কে হবেন, সেটি প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতার এখতিয়ার।
জানা গেছে, ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী সংসদ উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে পদটি শূন্য হয়। বিএনপি সরকারের পরবর্তী সময়ে ওই পদে নতুন করে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
পদটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
সংসদ উপনেতা সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের একজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে করা হয়। সংসদে সরকারের আইন প্রণয়ন কর্মসূচি, বিতর্ক, আলোচনা এবং সংসদীয় কৌশল নির্ধারণে সংসদ নেতার সঙ্গে সমন্বয় করাই এ পদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। এ কারণে পদটি অনেক সময় দলের ভেতরের ক্ষমতার ভারসাম্য ও নেতৃত্বের অগ্রাধিকারেরও একটি প্রতীক হয়ে ওঠে।
জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। আর উপনেতার পদ পূরণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই মুখ্য। সুতরাং সালাহউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনে বসানো আপাতত একটি দৃশ্যমান রাজনৈতিক বার্তা হলেও এটিকে উপনেতা নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলা যাচ্ছে না।