৯ দফা প্রস্তাব গৃহীত
সবখানে সরকার দলীয় করণ করছে অভিযোগ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষৎতে দেশ আরও ভয়াবহ ফ্যাসিজমের কবলে পড়বে। তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, পিছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতার মসনদে যারা গিয়েছিলেন, তারা তাদের পরিণতি বহন করে বিদায় হয়েছে। এখনো যদি কেউ এমন করে থাকেন, তাদের পরিণতি ভিন্ন কিছু হওয়ার কথা নয়- তা প্রমাণিত, কারণ প্রধান বিচারক আল্লাহ তায়ালা। ১১ দল জনগণের সাথে থাকবে বলেও ঘোষণা দেন ডা. শফিকুর রহমান।
গতকাল শুক্রবার ঢাকাস্থ আল-ফালাহ মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘জেলা ও মহানগরী আমীর সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। উপস্থিত ছিলেন দলের নায়েবে আমীর, সেক্রেটারি জেনারেল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্যরা। জেলা ও মহানগরীর আমীর ও সেক্রেটারিরা সম্মেলনে অংশ নেন।
আমীরে জামায়াত বলেন, দুটি ভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে পৃথক ব্যালটে। একটি ছিল জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচন, আরেকটি হলো গণভোটে হ্যাঁ কিংবা না। জনগণ তাদের রায় দিয়েছে। গণভোটে ৬৮% -এর বেশি হ্যাঁ-তে ভোট দিয়েছেন জনগণ। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টা বলেছেন, তাদের আমরা মেইন স্ট্রিমে আসতে দেইনি। তাদের ১৬৮টি পাওয়ার কথা ছিল তাদের আমরা ৬৮টিতে বেঁধে দিয়েছি। এটি চরম লজ্জাজনক, বলেন ডা. শফিকুর রহমান।
আমীরে জামায়াত বলেন, ইতিহাস একদিন এই নির্বাচনের পোস্টমর্টেম করবে। সেদিন চুলচেরা আরও অনেক জিনিস বের হয়ে আসবে। তবে আমাদের ১১ দল দেশ পরিচালনার জায়গায় গেল কিনা সেটি বড় আফসোসের জায়গা নয়, জনগণের আকাক্সক্ষার মৃত্যু হলো। আমরা চাইনি দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক। এই নির্বাচন শেষ নির্বাচন নয়, এই মার্কা নির্বাচন ২০০৮ সালে হয়েছিল। সেই নির্বাচনে বোঝাপড়া করে পিছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতার মসনদে যারা গিয়েছিলেন, তারা তাদের পরিণতি বহন করে বিদায় হয়েছে। এখনো যদি কেউ এমন করে থাকেন, তাদের পরিণতি ভিন্ন কিছু হওয়ার কথা নয়- তা প্রমাণিত, কারণ প্রধান বিচারক আল্লাহ তায়ালা।
আমীরে জামায়াত বলেন, আমাদের আফসোসের জায়গা হলো জনগণের ভোটাধিকার আর কতকাল চোরাবালিতে হামাগুড়ি খাবে। আমরা আশাবাদী, অপসংস্কৃতির অপনোদন হবে। সুস্থ রাজনীতির বিকাশ ঘটবে। আমরা সেই সুস্থ রাজনীতির ধারায় হাঁটছি বলেই এতো বড় দলীয় বা জোটগত ক্ষতি আমরা মেনে নিয়েছি বৃহত্তর স্বার্থে। আরেকটি আফসোস হলো আমরা প্রথম দিনে দুটি শপথ নিলেও সরকারি দল একটি নিয়েছে। আমরা প্রতারণা ও ধোকাবাজির রাজনীতিকে প্রত্যাখান ও ঘৃণা করি। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদ নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময় সীমা ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন ও সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।
আমীরে জামায়াত বলেন, সংকট বিএনপ সংসদ সদস্যদের শপথ না নেয়ার মধ্যদিয়ে সূচনা এবং সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকার মধ্যদিয়ে তার ষোলোকলা পূর্ণ করা হয়। মার্চের ১২ তারিখ সংসদ অধিবেশন ডাকা হয়। সময় স্বল্পতার মধ্যে বিরোধীদল সংসদে নোটিশ উত্থাপন করলেও তা টকডআউট করা হয়, যা স্পিকারের নিরপেক্ষতাকে ক্ষুণ্ন করে বলে অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি আরও বলেন, জনগণের রায়কে অস্বীকার, অগ্রাহ্য অমান্য করার ধারা শুরু হয়, এরপর থেকেই চলছে। অধিবেশনের প্রথম দিনেই বিগত সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদশ উত্থাপিত হয়েছিল। ৩০ দিনের মধ্যে এটি নিষ্পত্তি করতে হবে। যে যে জায়গায় সংবিধানের বর্তমান অবস্থানকে পরিবর্তন করার জন্য অধ্যাদেশ জারি হয়েছে- সেই জায়গাগুলো বিএনপি বদলাতে চায় না। অর্থাৎ ঐ জায়গাগুলো রেখে দিয়ে ফ্যাসিবাদী কায়দায় হয়তো তারা দেশ চালাতে চায়। আমাদের লোকেরা তখন নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন।
আমীরে জামায়াত আরও বলেন, আমরা বলেছিলাম ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপিত হয়েছে এটা সংসদের প্রপার্টি, এটা সংসদেই আলোচিত হতে হবে। কিন্তু শেষ দিন দেখা গেল এখানে কাটছাট করে আমাদের সামনে আলোচ্যসূচি দেয়া হয়েছে। আমরা তখন বাধ্য হয়ে আবার সংসদ থেকে ওয়াকআউট করি। আমরা বলেছিলাম গণভোটকে বাস্তবায়ন করার জন্য জনগণের কাছে গিয়েছিলাম। আমরা আবার জনগণের এজেন্ডা নিয়ে জনগণের কাছে চলে যাচ্ছি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশে একটা সরকার গঠিত হয়েছে। বিশ্বে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন দেশের মতো আমাদের দেশও আর্থিক ও জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হোক- তা আমরা চাইনি। আমরা আন্দোলন সংগ্রামের দিকে যাবো এতে জনদুর্ভোগ বাড়বে, আমরা এটা চাইনি। কিন্তু আমাদের যখন সংসদে ন্যায্য বিষয়ে কথা বলতে দেয়া হবে না, তখন আমাদের জায়গা থাকে রাজপথ। কারণ আমরা জনগণের দায়িত্ব নিয়ে সেখানে ঢুকেছি।
আমীরে জামায়াত বলেন, আমরা বুঝি এ দেশের জনগণ সতর্ক। কারো বাবা হারিয়েছে, কারো ছেলে হারিয়েছে, কারো ভাই হারিয়েছে। তারা দেখছে কে কি করছেন আর কে কি বলছেন। জনগণের সামনে সব পরিস্কার। আমরা জনগণের এজেন্ডা নিয়ে এখন জনগণের সাথে কাজ করি। সংসদেও আমরা যখন সুযোগ পাবো তখন আমরা ন্যায্য কথাগুলো জনগণের জন্য বলতেই থাকবো।
তিনি বলেন, ৭০ ভাগ মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করে কার্যত জনগণকে অপমান করেছে সরকার। বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসে কোথাও রেফারেন্ডাম এভাবে বৃথা যায়নি। বাংলাদেশে চারটি রেফারেন্ডাম হয়েছে- এটা চতুর্থ। চতুর্থটাও বিএনপির হাতে। জিয়াউর রহমান যে গণভোট করেন সেই প্রথমটাও সংবিধানে ছিলো না। শেষটাও সংবিধানে ছিলো না। ওটা যদি জায়েজ হয় তাহলে এটা জায়েজ হবে না কেন? প্রশ্ন রাখেন আমীর জামায়াত। এটা মনের মতো হয়নি এজন্য এটা নাজায়েজ। এখন আবার এটা ফ্যাক্ট টার্ম ভ্যালিড, বলেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কতগুলো সংস্কার প্রস্তাব অধ্যাদেশ আকারে এসেছিলো। তারমধ্যে ছিলো দুদক: দুদকের নিয়োগটা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বাইরে রেখে উপযুক্ত দক্ষ, নিরপেক্ষ লোক এনে এখানে বসানো। সেটা ওনারা তুললেন না, আটকিয়ে দিলেন। এরপর মানবাধিকার : এখানে একটু সামান্য আলোচনা করে এটাকে জোর করে পাস করিয়ে নিলেন। পুলিশ সংস্কার কমিশন: পুলিশে অনেক সংস্কার প্রয়োজন। স্বয়ং পুলিশ পুলিশের হাতে নিরাপদ নয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে তারা বৈষম্যের শিকার। এ সবগুলো বিষয় সেখানে ছিলো। গুম কমিশন, গুম প্রতিরোধ আলোচনায় আনা হলো না। এই গুমের শিকার লোকেরাই তো এখন সংসদে সদস্য হয়ে এসেছেন। কেউ সাড়ে ৮ বছর, কেউ ৪ মাস। এ রকম লোকেরা এখানে আছেন। আমার গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা এখানে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। জোর করে এটাও ফেলে দেয়া হলো। তার মানে কি আবার গুম হবে? তার মানে কি আবার নতুন করে আয়নাঘর তৈরি করা হবে? প্রশ্ন রাখেন বিরোধী দলীয় নেতা।
ব্যাংক সংস্কার নিয়ে আমীরে জামায়াত বলেন, ব্যাংক সংস্কারের জন্য ব্যাংক রেজুলেশন। ব্যাংক থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা লুট হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে গেল। এগুলো আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার অধ্যাদেশ ছিলো। সেটা বাদ দেয়া হলো। কোথায় বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? এখন ব্যাংকের উপর থাবা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনরকে অপদস্ত করা ও একজন ঋণখেলাপিকে গভর্নর পদে বসানোর সমালোচনা করেন তিনি। বলেন, ব্যাংকের মালিক দেশবাসী, কোনো দল নয়। সবাইকে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করতে হবে, গর্জে উঠতে হবে। আপনার আমানত আপনাকে রক্ষা করতে হবে।
আমীরে জামায়াত বলেন, বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক আদলে রেখে যতসব অবিচার করা হয়েছে, জুডিসিয়াল কিলিং করা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং আমাদের নেতৃবৃন্দসহ অনেকেই ভুক্তভোগী হয়েছেন, কেউ কেউ অবিচারের শিকার হয়েছে। সেই জায়গায় স্বাধীন বিচারালয়ের আলাদা সচিবালয় হওয়ার কথা- এটাকে ঠেকিয়ে দেয়া হলো। তার মানে বিচারকে আর স্বাধীনভাবে চলতে দেয়া হবে না। আগের সেই ফ্যাসিবাদের কায়দায় এখন ডিক্টেশনের আন্ডারে বিচার চালানো হবে।
তিনি বলেন, উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ সেখানে একটা নিরপেক্ষ বডি এটা করবে সেই রকম অধ্যাদেশ জারি হলো সেটাকে ঠেকিয়ে দিলো। এখানেও দলীয় প্রভাব। দলীয় ভিত্তিতে যখন বিচারক তৈরি হবে তখন বিচারপতি খাইরুল হক তৈরি হবে, বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিক তৈরি হবে। শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ বিচারপতি এনায়েতুর রহিম তৈরি হবে। ওটা দলীয় ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগের কুফল। সে কুফল আপনারা ভোগ করলেন, আমরাও ভোগ করলাম। আবার কেন সেই পুরোনো সংস্কৃতিতে ফিরে যাবো? পিএসসি গঠনে ঠিক একই কথা সেটাকে ঠেকিয়ে দেয়া হলো। এগুলো যখন বিদ্যমান থাকবে আমরা আশঙ্কা করছি অতীতের ফ্যাসিজমের চাইতে আগামীর ফ্যাসিজম হবে আরও ভয়াবহ। এজন্য আমরা বলতে বাধ্য হয়েছি। যেদিন গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা হয়েছে সেদিন থেকে এই নতুন ফ্যাসিজমের যাত্রা শুরু হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক যত প্রতিষ্ঠান ছিলো, সবগুলো ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে। খেলার ময়দানেও বাপের তালিকায় আবার কেউ স্বামীর তালিকায়- এভাবে দলীয়করণ করে ফেলা হলো। সিভিল প্রশাসনে যে লোকগুলো আসল দক্ষ সে লোকগুলোকে ওএসডি করা হচ্ছে। তাদের মেধা থেকে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে। আর জনগণের উপর জুলুম করা হচ্ছে। পুলিশেও একই অবস্থা। সকল দিকে একটা মহা নৈরাজ্য চলতেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চোখের পলকে বিদায়। দুদক থেকে কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেছেন, মানবাধিকার কমিশন থেকে পদত্যাগ করে খোলা চিঠি দিয়েছেন। বিচারকদের উপর হস্তেক্ষেপ করে এখন ২৮ জন বিচারককে শোকজ করা হয়েছে, অথচ বলা হচ্ছে বিচারকরা স্বাধীন। এ অল্প সময়ের ভিতরে তারা এ কাজগুলো করেছে।
বক্তব্যের শুরুতে ডা. শফিকুর রহমান জুলাই আন্দোলনে নিহতদের শহীদের মর্যাদা ও আহতদের সুস্থতা কামনা করেন। এছাড়াও যারা জেল জুলুম নির্যাতন ও আয়নাঘরের শিকার হয়েছেন, যাদের জান মাল ও ইজ্জতের উপর আঘাত হয়েছে, তাদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, শুধু চব্বিশের জুলাই নয় ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে এদেশে সন্ত্রাসের কবলে পড়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ১১ জন শীর্ষ দায়িত্বশীল নেতাসহ আমাদের সহস্রাধিক কর্মীকে হারিয়েছি। অন্যান্য বিরোধী দল ও মতের উপর একই তাণ্ডব চালিয়েছি ফ্যাসিবাদী সরকার।
দেশবাসীর উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় জুলাই বিপ্লবের পর দেশে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল। ট্রানজিশনাল পিরিয়ডের সরকার হিসেবে তাদের একটি পবিত্র দায়িত্ব ছিল ক্ষমতা হস্তান্তরটিকে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করা। কার্যত তারা সে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি, ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে জাতির মধ্যে যে আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল, নির্বাচনের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন হয়নি। কেন হয়নি তা পরিষ্কার। নির্বাচনকে সুষ্ঠু হতে দেয়া হয়নি। ব্যাপক ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টার মুখ থেকে তা বের হয়েছে। তিনিই প্রথম রাজসাক্ষী।
আমীরে জামায়াত বলেন, অধ্যাপক ইউনূস যুক্তরাজ্য সফরে গিয়ে বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে একটি বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে হতে পারে বলে জানান। আমরা এটির প্রতিবাদ করেছিলাম যে, বিদেশের মাটিতে বসে দেশের নির্বাচনের তারিখ কেন ঘোষণা করা হবে ? দ্বিতীয়ত, বিএনপি একমাত্র স্টেকহোল্ডার নয়। সেসময় দেশে ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ছিল। আমরা স্পষ্ট বলেছিলাম তিনি জাতিকে একটি ভুল বার্তা দিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাই নয়, বরং সরকারেরই একজন প্রতিমন্ত্রী বলে ফেলেছেন যে, আন্দোলন করেছে যুবসমাজ, আমরাও ছিলাম। তবে প্রফেসর ইউনূস যুক্তরাজ্যে গিয়ে ক্যাপ্টেনের হাতে ট্রফি তুলে দিয়ে এসেছেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ট্রফি যদি ওখানেই তুলে দেয়া হয়, তাহলে নির্বাচনের প্রয়োজন কি? এটি দ্বিতীয় রাজসাক্ষী। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে নির্বাচনে যোগসাজশের মাধ্যমে ব্যাপক অনিয়ম করে জনগণের প্রত্যাশার কবর রচনা করা হয়েছে।
চাঁদাবাজির সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এবং হেলথ কার্ডও দিবেন এটা ভালো, কিন্তু সে জায়গায়ও দলীয়করণ। আবার এটাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি হচ্ছে। চাঁদাবাজি আগের চাইতে এখন দিন দিন বাড়ছে। দ্রব্যমূল্য বাড়ানোর সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দ্রব্যমূল্যের জাঁতাকলে মানুষ পিষ্ঠ। দুই কারণে, একটা জ্বালানি সংকটে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, আরেকটি হলো- বাড়তি চাঁদার চাপ। এর সবটুকু খেটেখাওয়া মানুষের ঘাড়ে চাপতেছে। অথচ আপনারা বলেছিলেন দুর্নীতির টুটি চেপে ধরবেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি- মিডিয়া আর সমাজের বিভিন্ন জায়গার ভালো মানুষগুলোর ঠোট সেলাই করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এভাবে কারো ঠোট বা মুখ চিরদিন বন্ধ করা যায় না।
তিনি বলেন, আমরা ন্যায়সম্মত সকল কাজে সমর্থন এবং সহযোগিতা দিবো। অন্যায় এবং জনগণের অধিকার হরণ করার যত কাজ আছে সব কাজের বাধার দেয়াল হয়ে দাঁড়াবো, ইনশাআল্লাহ। এ ক্ষেত্রে এক চুলও ছাড় দিবো না।
আমীরে জামায়াত বলেন, আমাদের লড়াই আমাদের জাতির জন্য, সবার জন্য। এ লড়াই আপনাদের-আমাদের সকলের। এ লড়াইয়ে আমরা একসাথে সামনের দিকে এগিয়ে যাবো। আমরা দৃঢ় আস্থাশীল। জনগণের সব দাবি আদায় গণভোটের রায়ও বাস্তবায়ন হবে, ইনশাআল্লাহ। আইনি কোনো জটিলতায় এ পথে বাধা হয়ে থাকতে পারবে না। আইন মানুষের জন্য, সংবিধানও মানুষের জন্য। আইন এবং সংবিধানের জন্য মানুষ নয়। এখন সংবিধানের কথা বললে সরকারি দলও নেই এবং বিরোধী দলও নেই। এটা কোন সংবিধানের বলে আসছে? এটা ন্যাশনাল কনসাসের বলে আসছে, বলেন তিনি।
সরকারি দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আসুন, ভুল মানুষ করে আমরাও করতে পারি। জাতি মনে করে আপনারা স্পষ্ট ভুলের মধ্যে নিমজ্জিত, ভুল থেকে বের হয়ে আসেন। প্রথমে গণভোটের রায়কে মেনে নিন। তার জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ নিন। আমরা আপনাদের বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবো। কিন্তু জনগণের উপর ফ্যাসিজম কায়েম করার জন্য সামান্য কিছু ময়লা-আবর্জনা যদি থাকে, সেটা আমরা মেনে নেবো না। এই সংসদের তিনশ’ মানুষ যদি দেশবাসীর জন্য দায়িত্বশীল হয়ে যায়- তাহলে বাংলাদেশ বদলে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাজনীতির সেই স্লোগান কে মানে, কে মানে না- ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। আমরা কার্যত দেখতে পাচ্ছি- দেশের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়! এই চরিত্রকে পাল্টাতে হবে। রাজনীতির এই সংস্কৃতি বাংলাদেশে আর চলতে দেয়া হবে না।
তিনি বলেন, পানি সংকট, বিদ্যুৎ সংকট, সার সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এগুলো নিয়ে আলোচনা করি। এগুলো আলোচনা করা উনাদের পছন্দ নয়, শুধু লুকোচুরি। আমাদের আহ্বান হলো আসুন খোলামনে আলোচনা করে জাতীয় সংকট উত্তরণে একসাথে কাজ করি। এ দেশটা আমাদের সকলের। আমীরে জামায়াত বলেন, বগুড়া আর শেরপুর আরও দুই বিপদ ঘটে গেছে। এখন মানুষ বলে, ’৯৪ তে মাগুরা, ২৬’ সালে এসে বগুড়া। ফেয়ার ইলেকশন দিয়ে হয় আপনারা জিতবেন, না হয় আমরা জিতবো- কেন এমন করা হলো ? আমরা সমসময় বলেছি, সাদাকে সাদা বলুন, কালোকে কালো বলুন। আমার সাদাকে সাদা বলুন। সাদাটাকে কালো এবং বাদামী বানাতে যাইয়েন না। এটা ভালো জিনিস নয়।
দেশবাসীর উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আপনাদের অধিকার কেউ ঘরে এনে দেবে না। হয়তো আপনারা বলবেন, আর কত ত্যাগ ? হ্যাঁ, ত্যাগের রাস্তায় আমাদের চলতে হবে এবং কালো রাতের অবসান ঘটবে। কে বাঁচবো কে মরবো জানি না। কোন দল ক্ষমতায় আসবে, কোন দল ক্ষমতা থেকে যাবে- তাও জানি না। কিন্তু এটা জানি, মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রতি অবিচার করেন না। সুতরাং সুবিচার পাব, সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।
বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে আমীরে জামায়াত বলেন, আমাদের অনুরোধ যারা মজলুম তাদের যেন কেউ আর কষ্ট না দেয়। যারা জুলুম করছেন, তারা বিশ্ববাসীকে মেহেরবানী করে আর কষ্ট দেবেন না। স্বাধীন দেশ হিসেবে সবাই সম্মানের সাথে পাশাপাশি বসবাস করার পরিবেশ নিশ্চিত করুন। জাতিসংঘকে বিশ্বসভার অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
সম্মেলনে ৯ দফা প্রস্তাব গৃহীত: দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যালোচনা করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘জেলা আমীর সম্মেলন’ সর্বসম্মতিক্রমে নিম্নোক্ত প্রস্তাবসমূহ গ্রহণ করছে-
(এক) অবিলম্বে গণভোটের রায় পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন
‘হ্যাঁ’ ভোটে বিজয়ী ‘গণভোট’ একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের মৌলিক রূপরেখা। কিন্তু গণভোটের রায় বাস্তবায়নে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় জনগণের মধ্যে হতাশা ও সরকারের প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে, যা রাষ্ট্রের জন্য অশুভ সংকেত।
এ প্রেক্ষিতে ‘জেলা আমীর সম্মেলন’ জোরালোভাবে প্রস্তাব করছে যে,
ক) অবিলম্বে একটি সুস্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে, যাতে প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি জনগণের কাছে দৃশ্যমান হয়।
খ) জুলাই সনদের প্রতিটি ধারা বাস্তবায়নের জন্য স্বাধীন ও কার্যকর মনিটরিং এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো পর্যায়ে শিথিলতা বা গাফিলতি না থাকে।
গ) সকল রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে জাতীয় ঐকমত্য বজায় রেখে তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
(দুই) জ্বালানি সংকট নিরসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ
বর্তমান জ্বালানি সংকট দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, শিল্প খাতের উৎপাদন, কৃষি কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিদ্যুৎ ঘাটতি, গ্যাস সংকট এবং জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি করেছে এবং উৎপাদনশীল খাতকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সম্মেলন প্রস্তাব করছে যে,
ক) জ্বালানি খাতে বিদ্যমান দুর্নীতি, অনিয়ম ও অদক্ষতা চিহ্নিত করে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
খ) আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করে দেশীয় গ্যাস, কয়লা ও নবায়নযোগ্য শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
গ) স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলা করা যায়।
ঘ) বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং অপচয় ও চুরি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
ঙ) জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতার জন্য দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।
চ) জ্বালানি সমস্যার কারণে কৃষকেরা মারাত্মকভাবে সার সংকটে নিপতিত হয়েছেন। এ সংকট কাটিয়ে উঠতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
(তিন) রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কাঠামোতে দলীয়করণ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানসমূহে দলীয়করণ, পক্ষপাতিত্ব ও প্রভাব বিস্তার সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নষ্ট হচ্ছে এবং জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
এ প্রেক্ষিতে সম্মেলন প্রস্তাব করছে যে,
ক) প্রশাসন, বিচার বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে।
খ) সকল নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততাকে মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
গ) একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক ‘পাবলিক সার্ভিস কমিশন’ এর মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে।
(চার) দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের জীবনযাত্রার মান রক্ষা করতে হবে
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বাজার সিন্ডিকেট, মজুদদারি ও তদারকির দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
এ অবস্থায় সম্মেলন প্রস্তাব করছে যে,
ক) বাজার সিন্ডিকেট, কারসাজি ও মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
খ) নিয়মিত বাজার মনিটরিং, ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত তদারকি জোরদার করতে হবে।
গ) ভর্তুকি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও টার্গেটেড সহায়তার মাধ্যমে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে কার্যকর সহায়তা প্রদান করতে হবে।
ঘ) কৃষক ও উৎপাদকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।
ঙ) হামের ভয়াবহ আক্রমণে জনস্বাস্থ্য আজ মারাত্মকভাবে হুমকির সম্মুখীন। এ থেকে উত্তররণের জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
(পাঁচ) চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাস নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন
দেশব্যাপী চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিস্তার জননিরাপত্তা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হবে।
এ প্রেক্ষিতে সম্মেলন প্রস্তাব করছে যে,
ক) অপরাধীদের দলীয় পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
খ) আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে তাদের পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
গ) বিচার ব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ, দ্রুত, কার্যকর ও সময়োপযোগী করে অপরাধ দমনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ঘ) জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা জোরদার করতে হবে।
ঙ) সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিকদের অন্যায়ভাবে হত্যা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
(ছয়) জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উন্মুক্ত করে দেয়া
চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থাণের প্রেক্ষাপট, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের চরিত্র উন্মোচন এবং জাতির আত্মত্যাগের ইতিহাসকে তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে অতি দ্রুত জুলাই স্মৃতি জাদুঘর জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। এজন্য যা করতে হবে-
ক) জুলাই জাদুঘরে প্রবেশমূল্য না নেয়া
খ) স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্যাম্পেইন করা
গ) জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে গবেষণার জন্য দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা
(সাত) স্থানীয় সরকার নির্বাচন
রাষ্ট্রের সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচনের বিকল্প নেই। এজন্য-
ক) স্থানীয় পর্যায়ের সকল স্তরে দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে।
খ) সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সরকার দলীয় নেতাদের অপসারণ করতে হবে।
(আট) ব্যাংক ও আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা
দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা আনতে সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে। আর্থিক খাত ভেঙে পড়লে রাষ্ট্র তার স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না, জনগণ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এজন্য যা করতে হবে-
ক) ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে দলীয়করণ করা যাবে না।
খ) ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অর্থ লোপাটকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
গ) দখলবাজি বন্ধ করতে হবে।
ঘ) গ্রাহকদের আমানত রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা সরকারকে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
ঙ) দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
(নয়) মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও মুসলিম বিশ্বের করণীয়
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, যুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয় মুসলিম বিশ্বকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। নিরীহ মানুষের প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আন্তর্জাতিক বিবেককে নাড়া দিচ্ছে এবং বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ প্রেক্ষিতে সম্মেলন মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে যে,
ক) মুসলিম দেশসমূহ পারস্পরিক বিভেদ ও দ্বন্দ্ব পরিহার করে কার্যকর ঐক্য ও সহযোগিতা গড়ে তুলবে।
খ) সংঘাত নিরসনে সক্রিয়, দায়িত্বশীল ও ফলপ্রসূ কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ সুগম করতে হবে।
গ) ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা, পুনর্বাসন এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিতভাবে জোরদার করতে হবে।
ঘ) আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
প্রস্তাবে বলা হয়, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, প্রস্তাবসমূহ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষ, নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সচেতন নাগরিকদের প্রতি আমরা এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে সম্মিলিত ও আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।