বাংলাদেশের অর্থনীতির ফুসফুস হিসেবে বিবেচিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যখন প্রতিনিয়ত চাপের মুখে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে বড় ধরনের ধাক্কা এল। শর্ত অনুযায়ী কাক্সিক্ষত সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা না করায় ৪.৭ বিলিয়ন (যা পরবর্তীতে ৫.৫ বিলিয়নে উন্নীত) ডলারের ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি ছাড় স্থগিত করেছে সংস্থাটি। ওয়াশিংটনে চলমান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলকে এই কঠোর বার্তা সরাসরি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ১.৩ বিলিয়ন ডলারের যে কিস্তি পাওয়ার আশা করছিল, তা এখন কার্যত ‘নীতিগত সংস্কার বনাম সময়সীমা’র দ্বন্দ্বে আটকে গেছে। আইএমএফ স্পষ্ট জানিয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত রাজস্ব খাত, ব্যাংকিং শৃঙ্খলা এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হারের মতো মৌলিক সংস্কারগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে না, ততক্ষণ কোনো অর্থ ছাড় করা হবে না। এই সিদ্ধান্তের ফলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অর্থনীতির নির্ভরযোগ্যতা বা ‘ক্রেডিবিলিটি’ বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কেন এই কঠোর অবস্থান?

আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির প্রতিটি কিস্তি ছাড়ের আগে একটি ‘রিভিউ মিশন’ বা নিয়মিত পর্যালোচনা পরিচালনা করা হয়। এবার বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নির্ধারিত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ না হওয়ায় সংস্থাটি এখনই রিভিউ মিশন পাঠাতে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। বিশেষ করে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে না পারা এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে দীর্ঘসূত্রতা আইএমএফকে ক্ষুব্ধ করেছে।

ওয়াশিংটন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি তিনটি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে:

(এক) বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ভর্তুকি কমানো: ২০২৬ সালের মধ্যে ভর্তুকি শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে এর কোনো কার্যকর প্রতিফলন দেখা যায়নি।

(দুই) ব্যাংক রেজোলিউশন বিল: বিলে যুক্ত হওয়া কিছু বিতর্কিত ধারা নিয়ে আইএমএফ উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, এটি ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ফিরিয়ে আনার পথে বড় বাধা।

(তিন) বাজারভিত্তিক বিনিময় হার: ডলারে একক ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নিশ্চিত করার শর্তটি এখনও আংশিক বাস্তবায়িত।

রাজস্ব সংস্কারের গোলকধাঁধা: এনবিআর ভাঙার সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কার নিয়ে সরকারের নীতিগত দ্বিধা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল এনবিআরকে ভেঙে দুটি পৃথক বিভাগ তৈরি করা একটি হবে ‘রাজস্ব নীতি’ এবং অন্যটি ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’।

পরিকল্পনা ছিল, করনীতি প্রণয়ন ও কর আদায়ের দায়িত্ব আলাদা থাকলে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দুর্নীতি কমবে। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই অধ্যাদেশটিকে বিল আকারে সংসদে না তোলায় পুরো সংস্কার প্রক্রিয়া থেমে গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, সরকার এখনও নিশ্চিত নয় যে তারা এনবিআরকে পুরোপুরি বিলুপ্ত করবে নাকি নতুন কোনো কাঠামোয় পুনর্গঠন করবে। আইএমএফের কাছে এই অনিশ্চয়তাটি বাংলাদেশের একটি বড় ‘দুর্বলতা’ হিসেবে ধরা দিয়েছে।

ভর্তুকি ও কর-ছাড় নিয়ে ত্রিমুখী চাপ

আইএমএফ সুপারিশ করেছে যে, আগামী অর্থবছর থেকেই ধাপে ধাপে সব ধরনের কর-ছাড় (Tax Exemption) এবং ভর্তুকি তুলে নিতে হবে। বিশেষ করে রপ্তানি ও কৃষি খাতে যে বিশাল কর-ছাড় দেওয়া হয়, তা আইএমএফের মতে রাজস্ব আহরণের পথে প্রধান অন্তরায়।

তবে দেশীয় অর্থনীতিবিদরা এই সুপারিশ নিয়ে সতর্কবাণী দিয়েছেন। তাদের মতে, হঠাৎ করে কর-ছাড় তুলে নিলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যা সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে। ফলে সরকার এখন একদিকে দাতা সংস্থার চাপ আর অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট।

ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর দশা

আইএমএফের ঋণের অন্যতম শর্ত ছিল দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন এবং খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাংক খাতের শাসনব্যবস্থার উন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো ফল আসেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক দখলের পুরনো সংস্কৃতি ফেরার উপক্রম হয়েছে। আইএমএফের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ব্যাংকিং খাতের এই ভঙ্গুরতা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

বিকল্পের সন্ধানে সরকার: অতিরিক্ত ২ বিলিয়ন ডলারের আবেদন

কিস্তি আটকে যাওয়ার এই চরম মুহূর্তে সরকার বিকল্প অর্থায়নের পথ খুঁজছে। অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ২ বিলিয়ন ডলার জরুরি সহায়তা চেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং লোহিত সাগরে উত্তেজনার ফলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে। এই বাড়তি চাপ মোকাবিলায় এই ২ বিলিয়ন ডলার অত্যন্ত জরুরি।

যদিও ওয়াশিংটনের বৈঠকে অতিরিক্ত অর্থায়নের বিষয়ে প্রাথমিক ইতিবাচক ইঙ্গিত মিলেছে, তবে বিদ্যমান ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের কিস্তি সময়মতো ছাড় না হলে বাজেট সহায়তা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

রিজার্ভ ও মুদ্রাস্ফীতির ওপর প্রভাব

আইএমএফের ১.৩ বিলিয়ন ডলার ছাড় না হওয়া মানে হলো দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সরাসরি টান পড়া। বর্তমানে বাংলাদেশের নিট রিজার্ভ যে অবস্থায় আছে, তাতে আমদানিকারকদের এলসি (LC) সেটেলমেন্ট করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যদি এই অর্থ ছাড় না হয়, তবে ডলারের দাম আরও বাড়বে এবং এর ফলে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আইএমএফের এই অবস্থান কেবল টাকার হিসাব নয়, এটি একটি সংকেত। যদি আইএমএফ নেতিবাচক রিপোর্ট দেয়, তবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বা বিশ্বব্যাংকের মতো অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের আশ্বাস

ক্ষমতাসীন বিএনপির খাতভিত্তিক বিস্তারিত নির্বাচনী ইশতেহারের প্রশংসা করেছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

বুধবার (১৫ এপ্রিল) রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ওয়াশিংটন ডিসিতে আইএমএফ –বিশ্বব্যাংকের ‘স্প্রিং মিটিংস’-এর বসন্তকালীন বৈঠকের ফাঁকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এক বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট এই আশ্বাস দেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসাদও উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে অজয় বাঙ্গা ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়লাভ করে সরকার গঠন করায় বিএনপিকে অভিনন্দন জানান।

বাংলাদেশের অর্থনীতি রূপান্তরে বিশ্বব্যাংকের জোরালো সহযোগিতা কামনা করেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৈঠকে বিশেষ করে সময়মতো অর্থ ছাড় এবং ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির পরিমাণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

জবাবে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জানান, শুধু গতানুগতিক ঋণই নয়, বরং বন্ডের মতো পুঁজিবাজারের বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে অর্থায়নের নতুন নতুন পথ তৈরিতেও বাংলাদেশকে সহায়তা করবে বিশ্বব্যাংক।

ভবিষ্যৎ করণীয়

সরকারের সামনে এখন দুটি রাস্তা খোলা। প্রথমত, আইএমএফের সব শর্ত মেনে নিয়ে দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম দৃশ্যমান করা এবং দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের পথ সুগম করা। দ্বিতীয়ত, শর্ত মানতে ব্যর্থ হয়ে ঋণ কর্মসূচি থেকে সরে আসা। তবে দ্বিতীয় পথটি বেছে নিলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করছেন, অন্তত দুটি বড় শর্তে (যেমন: রাজস্ব নীতি আলাদা করা এবং জ্বালানি ভর্তুকি কমানো) দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারলে হয়তো আইএমএফকে পুনরায় রিভিউ মিশন পাঠাতে রাজি করানো সম্ভব হবে।

দেশের অর্থনীতি এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, অন্যদিকে দাতা সংস্থার কঠোর নজরদারি। এই অচলাবস্থা কাটাতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নেই। শুধু ১.৩ বিলিয়ন ডলার নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন এই সংস্কার প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।