• প্রথম ইউনিটের ভাল্বের ত্রুটিতে আটকে আছে পরবর্তী ধাপ
  • এখানো নির্ধারণ হয় নি বিদ্যুতের দাম
  • সাম্প্রতিক সময়ের অগ্নিকান্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন

একের পর এক নানা জটিলতায় আটকে যাচ্ছে দেশের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ। চলতি মাসে প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ এবং নভেম্বরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবারাহ কোনটাই আপতত সময় সীমার মধ্যে হচ্ছেন না।

এর কারণ হিসেবে অনুসন্ধানে জানা গেছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের পরীক্ষায় টারবাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাল্বের ত্রুটি ধরা পড়ায় আটকে আছে পরবর্তী ধাপের কাজ। এছাড়া এখানের উৎপাদন করা বিদ্যুতের দাম এখনো নির্ধারণ করা হয়। এরই মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের এর একটি অস্থায়ী ভবনে গত ৭ সেপ্টেম্বর অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে।

অগ্নিকান্ডের স্থানটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল স্থাপনার বাইরে অবস্থিত। যদিও এ ঘটনায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল স্থাপনাসমূহের নির্মাণ কার্যক্রম ও কমিশনিং কার্যক্রম প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ নাই এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন,চলতি মাসে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ শুরু হচ্ছে না। নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত না করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত করার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাম্প্রতিক কারিগরি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী জানান, রিয়্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা যন্ত্রাংশ পিওআরবির (প্রেসারাইজার ওভারপ্রেসার প্রটেকশন সিস্টেম) তিনটি ভালভের মধ্যে দুটি ভালভ গত দেড় মাস ধরে কাজ করছে না।

তিনি বলেন, বিষয়টি শুধু আমাদের নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি নির্মাতা রুশ কোম্পানির সুনামের সঙ্গেও জড়িত। বর্তমানে রাশিয়ার প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে এসে ভালভ দুটি মেরামতের কাজ করছেন।

রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ঘটে যাওয়া আগুনের ঘটনার বিষয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী বলেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিলো। আগুনে কিছু আসবাবপত্র ও কাগজপত্র পুড়ে গেছে। তবে পুড়ে যাওয়া সমস্ত নথিপত্রের নিরাপদ ব্যাকআপ আমাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। এই আগুনের ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দামের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, খুব দ্রুতই রূপপুরের বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম নির্ধারণ করা হবে।

সূত্র জানায়, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রূপপুর বিদ্যুত কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের ভাল্বটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চুল্লির সফল ট্রায়াল সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। ত্রুটি দূর করতে রাশিয়া থেকে আবার নতুন ভাল্ব তৈরি করে আনতে হবে। ফলে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের উৎপাদনে যাওয়ার সময় আরও পিছিয়ে যেতে পারে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সূত্রের দেওয়া তথ্যমতে, রাশিয়ার পক্ষ থেকে দ্বিতীয় ইউনিটের ভাল্ব খুলে প্রথম ইউনিটে স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ এতে রাজি হয় নি। কারণ, একটি ইউনিটের ভাল্ব খুলে অন্য ইউনিটে লাগানো সঠিক প্রক্রিয়া নয়। তাই নতুন করে ভাল্ব তৈরি করে এনে প্রথম ইউনিটে স্থাপন করতে হবে। এদিকে প্রথম ইউনিটের পরীক্ষার কাজ শেষ না হওয়ায় দ্বিতীয় ইউনিটের পরীক্ষাও শুরু করা যাচ্ছে না। প্রথম ইউনিট চালু হওয়ার পরই দ্বিতীয় ইউনিটের পরীক্ষার কাজ শুরু হওয়ার কথা।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একটি পাওয়ারপ্লান্টের টেস্টিংয়ের সময় বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এখন প্রথম ইউনিটের টেস্টিং চলছে। প্রথম ইউনিট চালু হলে দ্বিতীয় ইউনিটের টেস্টিং হবে। তিনি বলেন, ‘‘টেস্টিংয়ের সময় ভাল্বে সমস্যা দেখা দেয়। এটা নিয়ে আমরা দুই মাস ধরে কাজ করছি।’’

সূত্র জানায়,যতক্ষণ পর্যন্ত না টেস্টিং শেষ হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটা বলা সম্ভব না। কারণ টেস্টিংয়ের সময় নানা সমস্যা দেখা দেয়। সেসব কাটিয়ে ওঠার পর একটি ইউনিট চালু করা সম্ভব।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট একজন প্রকল্প কর্মকর্তা গত ২৬ আগস্ট গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘‘আইডিয়াল প্রোগ্রাম যদি অনুসরণ করি, তাহলে আগামী নভেম্বরের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে যেতে পারে বলে আশা করছি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কোনও পরীক্ষায় আটকে গেলে সময় আরও পেছাতে পারে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে কেন্দ্রটির প্রেসারাইজার পাইলট অপারেটেড রিলেটেড ভাল্বের (পিওআরভি) জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। সূত্রমতে, সেটি স্থাপনের পর ফিউশন রিঅ্যাকশন ঘটিয়ে পাওয়ার স্টার্টআপে যাওয়া যাবে। আবার পিওআরভি শেষে যখন ফিউশন রিঅ্যাকশন ঘটানো হবে, তখন সেই পরীক্ষাতেও কারিগরি ত্রুটি দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে শিডিউল অনুযায়ী রূপপুরের কাজ সময়মতো শেষ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

এর আগে রূপপুরের বি-টু ধাপ নিয়েও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন, এই ধাপে ফুয়েল লোডিং ও ফিজিক্যাল স্টার্টআপের কাজ শেষ করে ফিউশন রিঅ্যাকশন ঘটানো হবে। এতে এনার্জি বা তাপশক্তি তৈরি হবে। সেই তাপশক্তি স্টিমে রূপান্তর করে টারবাইন ঘোরানো হবে এবং টারবাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে হলে উৎপাদন ক্ষমতা অন্তত ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে।

এ পর্যায়ে যেতে বি-টু ধাপ এবং পরবর্তী পরীক্ষাগুলো সফলভাবে শেষ করা জরুরি। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে দুই মাসের মতো সময় লাগতে পারে। ফলে নতুন ভাল্ব না বসাতে পারলে পরবর্তী কাজের অনিশ্চয়তা রয়েই যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চলতি বছর চালু হবে কিনা, সেই শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ, নভেম্বরের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে প্রথম ইউনিটের বর্তমান ত্রুটি এখনই দূর করতে হবে। এরপর ধারাবাহিকভাবে পরবর্তী পরীক্ষাগুলো সফল করতে হবে।

সূত্র জানায়, রূপপুরে দুটি ইউনিট রয়েছে। বর্তমানে প্রথম ইউনিটের পরীক্ষার কাজ চলছে। দ্বিতীয় ইউনিটের পরীক্ষার কাজ এখনও শুরু হয় নি। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম ইউনিট চালু হওয়ার পর দ্বিতীয় ইউনিটের টেস্টিং শুরু হবে। ফলে প্রথম ইউনিটের উৎপাদনে যাওয়ার বিষয়টি দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ শুরুর সঙ্গেও যুক্ত।

একটি পাওয়ারপ্লান্ট চালুর আগে বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা করতে হয়। এসব পরীক্ষায় কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে তা সমাধান করে আবার পরীক্ষা করতে হয়। রূপপুরের ক্ষেত্রেও প্রথম ইউনিটের ভাল্বের ত্রুটির কারণে দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও পিছিয়ে পড়ছে।

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্য দিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করার কথা বাংলাদেশের। ভাল্ব ছাড়াও বিদ্যুতের দাম এবং পেন্ট ফুয়েল নিয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি।

পিডিবি জানায়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সঙ্গে রূপুপুর প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে কয়েকবার বৈঠক করেছে। পিডিবি এ বিষয়ে রূপপুর কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু তথ্য চেয়েছে। কিন্তু তারা এখনও পিডিবিকে সব তথ্য দেয়নি বলে একটি অনুষ্ঠানে অভিযোগ করেছেন পিডিবির চেয়ারম্যান নিজেই। জানা গেছে, প্রয়োজনীয় এই তথ্য না পেলে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করতে পারবে না পিডিবি।

চুক্তির সময় প্রাথমিকভাবে ২০১৬ সালে রূপপুর প্রকল্পের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছিল ৪ টাকা ৬৫ পয়সা। তবে সব খরচ বিবেচনা করে এখন তা ১০ টাকার আশপাশে থাকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাশিয়া থেকে আনা জ্বালানি ইউরেনিয়াম পুড়ে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে, সেই পুড়ে যাওয়া অংশে তেজস্ক্রিয়তা থাকে। চুক্তি অনুযায়ী সেটি ধ্বংস করার জন্য রাশিয়া নিজ ব্যবস্থাপনার দেশে নিয়ে যাবে। এ জন্য রাশিয়াকে কী পরিমাণ টাকা দিতে হবে—সেই বাণিজ্যিক চুক্তি এখনও হয়নি।

গত ৩ সেপ্টেম্বর এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইউনিটটির দুটি সেফটি ভাল্বে ত্রুটি ধরা পড়ায় পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা শুরু করা যাচ্ছে না। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে কিনা, তা এখনই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না সরকার।

মন্ত্রী বলেন, গত ২৮ এপ্রিল রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা শুরু হয়। তখন চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপের মধ্যে ‘বি’ স্টেজ শেষ হয়েছে। তবে দুটি সেফটি ভাল্বে সমস্যা দেখা দেওয়ায় ‘সি’ স্টেজে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কবে নাগাদ ভাল্বের সমস্যা সমাধান হবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না বলে জানান ফকির মাহবুব আনাম।

তিনি বলেন, ভাল্ব দুটি কেন কাজ করছে না, তা নির্ধারণে রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল আসবে। তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ত্রুটির প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। প্রকল্পের ডিজাইনারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভাল্ব দুটি পুরোপুরি পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে বলেও জানান মন্ত্রী।

এদিকে প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোড করার আগে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে গত বছরের ১০ থেকে ২৭ আগস্ট রূপপুর পরিদর্শন করে আইএইএর বিশেষজ্ঞ দল।

পরিদর্শনের পর সংস্থাটি জানায়, প্রকল্প পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা উন্নয়নে সদিচ্ছা দেখিয়েছে। তবে কয়েকটি ক্ষেত্রে উন্নতির প্রয়োজন। এর মধ্যে ছিল অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, পরিচালন কার্যক্রমের তদারকি বাড়ানো এবং যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন। অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি তাই সাম্প্রতিক অগ্নিকান্ডের পর প্রথমবার সামনে আসেনি, আন্তর্জাতিক পর্যালোচনাতেই এটি চিহ্নিত হয়েছিল।