• পায়রা ও আশুগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বন্ধ
  • রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা-সংকটের প্রভাব

আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি উৎপাদন ইউনিটের একটি কারিগরি ত্রুটির কারণে বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দেওয়ায় কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ ৮০০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে। এর ফলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

শুধু ইউনিট-১ চালু থাকার কারণে গতকাল ভারতের এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গড়ে প্রায় ৭৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে । ৯ সেপ্টেম্বর রাত ১১টায় ইউনিট-২ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে আদানি প্রায় ১ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল। ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মধ্যরাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে ৭৫৮ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়। বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান কমাতে দেশ যখন এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছে, তখনই নতুন করে এই বিঘ্নের ঘটনা ঘটলো।

গতকাল শুক্রবার ভোররাত ৩টায় জাতীয় গ্রিড থেকে ১৫ হাজার ৭৭৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১২ হাজার ৯০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে ২ হাজার ৮৬৯ মেগাওয়াটের ঘাটতি দেখা দেয়।

আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ এখন প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে, বিশেষ করে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, আদানির ইউনিট-২-এর প্রধান পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ফিড ইউনিটে সমস্যা দেখা দেওয়ায় ১০ সেপ্টেম্বর রাত ১টার দিকে ইউনিটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘আদানি আমাদের জানিয়েছে, ফিড ইউনিটটিতে ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। সেটি অতিরিক্ত গরম হয়ে গিয়েছিল। এ কারণে বাধ্য হয়ে ইউনিটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।’

বিপিডিবি জানিয়েছে, মেরামতের কাজ শুরু করার আগে ইউনিটটিকে প্রথমে ঠান্ডা হতে দিতে হবে। তাই এই সমস্যা সমাধানে তিন থেকে চার দিন সময় লাগতে পারে। বয়লার ফিড পাম্প নামে পরিচিত এই ফিড ইউনিট তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের স্টিম সিস্টেম, যা অনবরত উচ্চ চাপে স্টিম বয়লারে পানি সরবরাহ করে থাকে।

এই ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি দেখা দিলে তা বয়লারের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে এবং নিরাপত্তার খাতিরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য করতে পারে।

গত কয়েক সপ্তাহে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহে বেশ কয়েকবার বিঘ্ন ঘটার পর সর্বশেষ এই যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা ঘটল। এর আগে রেলপথে ব্যাপক জটের কারণে গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কেন্দ্রটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানো হয়েছিল।

আদানি এর আগে জানিয়েছিল, কয়লা পরিবহন ও লোড করার ওপর কড়াকড়ির কারণে কয়লার পর্যাপ্ততায় প্রভাব পড়েছে। এর ফলে তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন সমন্বয় করতে এবং সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হয়েছিল।

আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের প্রতিটির স্থাপিত সক্ষমতা ৮০০ মেগাওয়াট। তবে এর প্রকৃত সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট।গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে এই কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে, কারণ কখনো কখনো এর সরবরাহ ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটও ছাড়িয়ে যায়।

এদিকে কয়েক সপ্তাহ কিছুটা কম থাকার পর দেশে আবারও বেড়েছে লোডশেডিং। বিদ্যুৎ উৎপাদনে একের পর এক সংকট তৈরি হওয়ায় বৃহস্পতিবার দেশের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে কয়েক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গ্যাস ও কয়লার সংকটের পাশাপাশি কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন কমে গেছে। সর্বশেষ ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট এবং আরএনপিএলের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

জাতীয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (এলএনডিসি) তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত ১১টার দিকে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন ১ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াট থেকে কমে ৭৫৮ মেগাওয়াটে নেমে আসে। একই সময়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট থেকে কমে ৪ হাজার ৮৫৭ মেগাওয়াটে নেমে যায়।

কয়লা স্বল্পতার কারণে প্রায় এক মাস ধরে সীমিত সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল আদানির কেন্দ্রটি। গত মাসের শেষ দিকে কয়লা সরবরাহ বাড়ায় উৎপাদনও বাড়তে শুরু করে। দিনের বেলায় প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল কেন্দ্রটি।

বুধবার রাতে উৎপাদন ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও রাত ১২টার দিকে বয়লারে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। এতে কেন্দ্রটির উৎপাদন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে।

শুধু আদানির কেন্দ্রেই নয়, গ্যাস ও কয়লার সংকটেও দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পিডিবি সূত্র বলছে, দুই মাসের বেশি সময় ধরে গ্যাসের সংকট তীব্র হওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমেছে। এতে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এর পাশাপাশি পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ রয়েছে। পটুয়াখালীর আরেকটি কেন্দ্র এবং বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কয়লা-সংকটের প্রভাব পড়েছে।

কারিগরি ত্রুটিতে আশুগঞ্জের ৪৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রও বন্ধ হয়ে গেছে। ঢাকায় গ্যাস-সংকটের কারণে অন্তত সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ অথবা কম সক্ষমতায় চলছে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলেও একটি করে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে।

বিদ্যুৎ পরিস্থিতির বৃহস্পতিবার বেলা ৩টার হিসাবে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াট। এ সময় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৭৮৮ মেগাওয়াট।

ফলে চাহিদা ও উৎপাদনের বড় ব্যবধানের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়ে যায়। শহরাঞ্চলে দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে ৭ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও জ্বালানি-সংকট ও একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি সমস্যার কারণে আবারও বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ইউনিটটি দ্রুত চালু করা না গেলে আগামী কয়েকদিনও লোডশেডিংয়ের চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।