ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। যার রেশ পড়ছে বাংলাদেশেও। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি কূটনীতিতে নেমেছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানির চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসতে না আসতেই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হয়। এই যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় গত ৩১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের সঙ্গে বৈঠক এছাড়াও ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইরান, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক রাষ্ট্রদূতের সাথে বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এদিকে রাশিয়ার পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য বা তেল কিনতে বাংলাদেশকে ৬০ দিনের অনুমতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া থেকে তেল আমদানির প্রক্রিয়া এখনো শুরু না হলেও এ বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে কূটনীতিক সূত্রে জানা গেছে।

তিন দেশ সফরে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী: জ¦ালানি সহায়তা ও জাতিসংঘের সভাপতির পদে ভোটের আশায় তিন দেশ সফরে আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তুরস্ক, বেলজিয়াম ও ইথিওপিয়া সফরের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন এবং বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন জোরদারে কাজ করবেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ১৭ থেকে ১৯ এপ্রিল তুরস্কে অবস্থান করার কথা করবেন তিনি। এই সফরে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত পঞ্চম আনতালিয়া ডিপ্লোমেসি ফোরামে অংশ নেবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে আছেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এই ফোরামে বিভিন্ন দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা অংশ নিয়েছেন। তুরস্ক সফর শেষে ১৯ এপ্রিল ব্রাসেলস যাবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির (পিসিএ) প্রাথমিক প্রক্রিয়ায় সই অনুষ্ঠিত হবে। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় যাবেন এবং সেখানে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত অবস্থান করবেন। আফ্রিকান ইউনিয়নের সদর দফতরে অবস্থানকালে তিনি আফ্রিকার দেশগুলোর সমর্থন আদায়ে সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালাবেন। এ সময় বিদেশি মিশন প্রধানদের সম্মানে আয়োজিত একটি সংবর্ধনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে ভোট চাইবেন। এই তিন দেশ সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানিতে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা চলমান। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানিতে সংকট দেখা দেওয়ার পর বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি আমদানিতে জোর দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ইতোমধ্যে ভারত, সিঙ্গাপুর, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারত থেকে তিন দফায় ১৭ হাজার টন ডিজেল আমদানিও হয়েছে। চলতি এপ্রিল মাসে দেশটি থেকে আরও ২৫ হাজার টন ডিজেল আমদানি করা হবে। অন্যদিকে সিঙ্গাপুর থেকে ইতোমধ্যে ১১ হাজার টন জেট ফুয়েল আমদানি করা হয়েছে। দেশটি থেকে ডিজেলও আমদানি হচ্ছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় ইরান। তবে বাংলাদেশের জাহাজগুলো যেন হরমুজ প্রণালী পার হতে পারে, সে লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা চালায় সরকার। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশের জাহাজগুলোকে চলাচলের অনুমতি দেয়। ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি জানান, বাংলাদেশের জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলে বাধা নেই। বাংলাদেশের ছয়টি জাহাজকে চলাচলের জন্য ইতোমধ্যে অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। তাছাড়া ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি তেল আমদানির লক্ষ্যে ইরানের সহায়তা চেয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রাশিয়া থেকে তেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি চেয়ে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ। রাশিয়ার পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য বা তেল কিনতে বাংলাদেশকে ৬০ দিনের অনুমতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ সম্প্রতি সবুজ সংকেত দিয়েছে। রাশিয়া থেকে তেল আমদানির প্রক্রিয়া এখনো শুরু না হলেও এ বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে কূটনীতিক সূত্রে জানা গেছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সূত্র মতে, গত ১১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া এই ছাড়টি ৯ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে। এরআগে, গত ১২ মার্চ মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ রাশিয়ার জ্বালানি ক্রয়ে ৩০ দিনের ছাড় দিয়েছিল।

জ্বালানি আমদানিতে সরকারের নানামুখী কূটনৈতিক তৎপরতা: ঢাকায় নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিন গত ১৫ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে রাশিয়ার জ্বালানি তেল সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়। ভারত থেকে জ্বালানি তেল আমদানির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দিল্লিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান দেশটির জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদ্বীপ সিং পুরীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেই বৈঠকে জ্বালানি সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়। এর আগে জ্বালানি তেল সহায়তা চেয়ে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠিও দেয় বাংলাদেশ। রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। বৈঠকে এই সংকটকালে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত ৩১ মার্চ ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের বৈঠক করেন। বৈঠকে ড. খলিলুর রহমান মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রীকে জানান, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘœ ঘটায় বাংলাদেশ বর্তমানে জ্বালানি খাতে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কামনা করেন। বৈঠকে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল তৃতীয় দেশে পরিশোধিত হওয়ার পর জ্বালানি হিসেবে আমদানির বিকল্প সুযোগের বিষয়েও আলোচনা হয়।

সাম্প্রতিক সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে সরকারের ওপর কোনো ধরনের বাধ্যবাধকতা নেই। সাম্প্রতিক বৈঠকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, বিশেষ করে জ্বালানি, বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়ে সাধারণ আলোচনা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল বর্তমানে এক উত্তাল সময় অতিক্রম করছে। জ্বালানি সঙ্কট অর্থনীতি ও সমাজের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতিতে আমাদের একসাথে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়, যার মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের পরিমাণই বেশি। এছাড়া অল্প পরিমাণ অকটেন আমদানি করা হলেও চাহিদার বড় অংশ দেশেই উৎপাদন হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতিদিন জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ১৪ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে সিংহভাগ, অর্থাৎ প্রায় ১২ হাজার টন ডিজেল। বাকি চাহিদার মধ্যে পেট্রোল প্রায় ১২০০ টন এবং অকটেন প্রায় ১১০০ টন । মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ ডিজেল। বড় অংশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ আমদানির ওপরই নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে সৌদি আরব কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বড় ভরসা। এছাড়া ভারত, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর থেকেও বাংলাদেশে ডিজেল আমদানি করা হয়।যেমন সম্প্রতি মালয়েশিয়া থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন এবং মার্চ মাসে ভারত থেকে ২২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে এসেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন।

কূটনীতিক সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রাশিয়া থেকে তেল আমদানির বিষয়ে সম্মতি চাওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশি কূটনীতিকরা দেশটির ট্রেজারি বিভাগের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কাজ করে আসছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র তেল আমদানির জন্য বাংলাদেশকে রাশিয়ার কিছু তেল কোম্পানির নামও দিয়েছে। তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে তেল আমদানি করা যাবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ডিজেলের গড় নিয়মিত চাহিদা ১২ হাজার মেট্রিক টনের মতো। অর্থাৎ মজুত থাকা ডিজেলে প্রায় ১১ দিনের মতো চলবে। এই সময়ে নতুন করে আমদানি করা জ্বালানি তেলের চালান দেশে পৌঁছালে আবারও এই মজুত বাড়বে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি তেল আমদানিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, আমাদের জ্বালানির উৎসগুলো বহুমুখী করার জন্য যা যা করার দরকার, মন্ত্রণালয় থেকে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, যেই উৎসগুলা থেকে আমরা এখন যুদ্ধের কারণে তেল আনতে পারছি না, সেই কারণে অন্য উৎসগুলো থেকে যাতে আমরা তেল আনতে পারি, জ্বালানি আনতে পারি, সেক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যতটুকু সহযোগিতা জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে করার সেটা আমরা শতভাগ করছি। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, জ্বালানি তেল আমদানিতে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ফলপ্রসূ আলাপ হয়েছে। ভারত ও সৌদি আরব থেকেও আমরা জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছি।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি আমদানিতে সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কেমন হওয়া উচিত জানতে চাইলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটাতে সরকারকে বিকল্প চিন্তা করতে হবে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল আমদানিতে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একমুখী উৎস থেকে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়েই জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই। তবে আমার মনে হয়, এটা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া দরকার।