# প্রতি ইউনিট ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব

# ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি কমানোর টার্গেট

পাইকারি মূল্যর পাশাপাশি খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের সুরক্ষায় শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত লাইফলাইন পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়নি।

আপতত প্রান্তিক এসব গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের দাম না বাড়ালেও অন্য আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ব্যবহারভেদে ধাপে ধাপে ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাব যাচাই করার পর মন্ত্রীপরিষদে তোলা হবে। প্রস্তাবটি যাচাইয়ের জন্য ইতোমধ্যে উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি করা হয়েছে। গত ৯ এপ্রিল গঠিত হয় ঐ কমিটি ।

বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের জন্য গত ৯ এপ্রিল উচ্চপর্যায়ের একটি মন্ত্রিসভা কমিটিতে অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী এবং বাণিজ্যমন্ত্রী সদস্য হিসেবে রয়েছেন। এ ছাড়া অর্থ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিবরা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটি বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দামের পুননির্ধারনের জন্য প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে মন্ত্রিসভার জন্য সুপারিশ দেবে।

জানা গেছে, বিদ্যুৎ খাতে অস্বাভাবিক ভর্তুকির লাগাম টানতে বাসাবাড়িতে ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব তৈরি করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। পাশাপাশি পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তিনটি বিকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। যাতে ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি হ্রাস পায়।

বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজ স্বাক্ষরিত প্রস্তাবে বলা হয়, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় দুই বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম না বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর এলএনজি, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হয়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গিয়ে ভর্তুকির পরিমাণও দ্রুত বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিতে সরকার একদিকে কৃচ্ছ্রনীতি, অন্যদিকে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। উচ্চমূল্যেও এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখতে কয়লার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যাতে বেসলোড বিদ্যুৎ উৎপাদন বিঘিœত না হয়। তবে এসব উদ্যোগের ফলে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়েছে।

প্রস্তাবে আরো বলা হয়, বর্তমানে বিদ্যুতের গড় পাইকারি মূল্য ৭ টাকা ৪ পয়সা, যা উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম। ফলে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা ভর্তুকির মাধ্যমে সামাল দিতে হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে এই চাপ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ বিভাগ পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তিনটি বিকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে। বর্তমান ৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে ৫০ পয়সা বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট হবে ৭ টাকা ৫৪ পয়সা। এতে ৫ হাজার ২৪৪ কোটি ভর্তুকি কমবে। ১ টাকা বাড়িয়ে পাইকারি দাম ৮ টাকা ৪ পয়সা হলে ভর্তুকি ১০ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা কমতে পারে। পাইকারি মূল্য প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ২৪ পয়সা করলে ১২ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে।

পাইকারি মূল্যের পাশাপাশি খুচরা পর্যায়েও দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে নি¤œ আয়ের গ্রাহকদের সুরক্ষায় শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত লাইফলাইন পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়নি। অন্য আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ব্যবহারভেদে ধাপে ধাপে ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ২০২৫ সালে বিদ্যুৎ খাত পর্যালোচনায় একটি কারিগরি মিশন পাঠায়, যা বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে টানা দুই সপ্তাহ আলোচনা করে। তাদের সুপারিশে বলা হয়, বিদ্যুৎ খাতে দক্ষতা বাড়ানো এবং ভর্তুকি কমাতে তিন বছর মেয়াদি একটি রোডম্যাপ প্রণয়ন দরকার। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সুরক্ষা রেখে ধাপে ধাপে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। শ্রীলংকা আবাসিক খাতে ৭ দশমিক ২ শতাংশ, শিল্প খাতে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি করেছে। পাশাপাশি দেশটি পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। সিঙ্গাপুরে জ্বালানির মূল্য সরাসরি ট্যারিফে সমন্বিত হওয়ায় বিদ্যুতের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।

সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে শুধু স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতেই অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। জ্বালানি তেলে দৈনিক গড়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। চলতি বাজেটে ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৪২ হাজার কোটি। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই অর্থ পর্যাপ্ত নয়। আগামী জুন পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে আরও প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

আইন নিয়ে বিতর্ক : আইনগতভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও সংস্থাটি ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে গণশুনানির মাধ্যমে নিয়মিত ট্যারিফ নির্ধারণ শুরু করে। উৎপাদন ব্যয়, আমদানি খরচ ও ভর্তুকির হিসাব বিবেচনায় নিয়ে এ প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খাতের স্বচ্ছতার প্রধান ভিত্তি ছিল। তবে ২০২২ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে সরকার সরাসরি দাম নির্ধারণের ক্ষমতা নিজেদের হাতে নেয়। ফলে গণশুনানি ছাড়াই গেজেটের মাধ্যমে মূল্য সমন্বয়ের পথ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার আবারও গণশুনানি প্রক্রিয়া পুনর্বহালের উদ্যোগ নেয় এবং বিইআরসিকে সক্রিয় করার চেষ্টা করে।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগ আইনগত কাঠামোর সঙ্গে আংশিক দ্বন্দ্ব তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ আইনে বলা আছে, দাম বাড়ানোর প্রস্তাব এলে তা বিইআরসির মাধ্যমে যাচাই ও গণশুনানির প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই চূড়ান্ত হওয়ার কথা।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, বিদ্যুৎ খাতে লুটপাট ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করা হয়েছে। তার মতে, এই ঘাটতিকে ভিত্তি করে মূল্য সমন্বয়ের কোনো সুযোগ নেই। আগে ঘাটতির প্রকৃত কারণ ও বৈধতা নিরূপণ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাদ দিতে হবে। এরপর যদি বাস্তব ঘাটতি থাকে, তবে তা নিয়ে গণশুনানির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, মূল্যবৃদ্ধির বর্তমান প্রক্রিয়া ভোক্তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না।