যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। মাসব্যাপী এ লড়াই এখন সমুদ্রপথে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি ঘিরে দু’দেশের পালটাপালটি সামরিক পদক্ষেপে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এক অপরের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তিনটি ইরানি তেল ট্যাংকারে হামলা চালানোর দাবি করেছে। এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। মিডলইস্ট আই, আল জাজিরা, ওয়াশিংটন পোস্ট।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের বাহিনী তিনটি ইরানি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে একটি খার্গ দ্বীপের কাছে, একটি জাস্ক বন্দরের কাছে এবং অন্যটি ওমান উপসাগরে ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্য ছিল একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও একটি ডেস্ট্রয়ার। তবে মার্কিন বাহিনী হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে এবং কোনো সেনা হতাহত হয়নি।

অন্যদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা মার্কিন যুদ্ধ জাহাজ লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সর্তক করেছে তেহরান।

ট্যাংকারে হামলার কারণ

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরানি তেল ট্যাংকারগুলো নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল বিক্রির একটি গোপন নেটওর্য়াকের অংশ। এসব আয়ের মাধ্যমে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ও তাদের মিত্রগোষ্ঠী অর্থ পায় বলে ওয়াশিংটনের দাবি।

অন্যদিকে ইরান জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও অর্থনেতিক নিষেধাজ্ঞা তাদের ওপর চাপ তৈরির কৌশল। তেহরান মনে করছে, নিজেদের তেল রপ্তানি ও সামুদ্রিক চলাচল রক্ষায় পালটা ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারে প্রভাব

হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এ পথ দিয়ে যেত। ফলে এ অঞ্চলের সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সংঘাতের কারণে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ৯৬ দশমিক ২৮ ডলারে পৌছেছে; যা যুদ্ধ শুরুর আগে ৭০ ডলার ছিল। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।

সংঘাত কোন দিকে যাচ্ছে?

জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়ন কর্মসূচির পরিচালক সিনা আজোদির মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পালটাপালটি হামলা সংঘাত আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার মতে, কোনো পক্ষই এখন সহজে পিছু হটবে না। রাজনৈতিক সমাধান না হলে সংঘর্ষ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকিও বাড়বে।

আজোদি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আরও সেনা পাঠাতে পারে, তবে ইরানও অবরোধ প্রতিরোধ করলে পালটা চাপ বাড়াবে। শেষ পর্যন্ত যে পক্ষ ক্ষয়ক্ষতি ও চাপ সহ্য করতে পারবে, তারাই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।

অন্যদিকে তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটিজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলী আকবর দারেইনি বলেন, ইরানি তেল ট্যাংকারে মার্কিন হামলা তেহরানকে আরও কঠোর প্রতিশোধ নিতে উৎসাহিত করবে। তার মতে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের পাশাপাশি ইরান অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করবে এবং তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের ওপর নেওয়ারও চেষ্টা করতে পারে।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান এ উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন হারিয়ে যে বড় ক্ষতি ওয়াশিংটনের

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে অন্তত ৪৫টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ধ্বংস হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। এতে ১৩০ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে।

গতকাল সোমবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

তিনজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে জানানো হয়, এ ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ-পূর্ব ড্রোন বহরের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এসব ড্রোনের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১৩০ কোটি ডলারেরও বেশি হতে পারে।

ইসরাইলি গণমাধ্যম চ্যানেল-১২ জানিয়েছে, এ ক্ষতির কারণে মার্কিন ড্রোন বহরের উল্লেখযোগ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে কার্যকর এমকিউ-৯ এর সংখ্যা প্রায় ১৩৫টি।

মার্কিন বিমান বাহিনীর কর্মকর্তারাও এ ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কারণ এমকিউ-৯ রিপার গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি এবং নির্ভুল হামলার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

যুদ্ধের দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাবে এত বড় সংখ্যক ড্রোন হারানো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনা ও নজরদারি সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

বিশ্বের ওপর দায় চাপাচ্ছে

ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধের প্রভাবের দায় যুক্তরাষ্ট্র এখন পুরো বিশ্বের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ অভিযোগ করেন।

বাঘাই বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালানোর আগে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে, ট্যাংকার চলাচল থেমেছে এবং জ্বালানির দাম বেড়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটন নিজেদের তৈরি সংকটের দায় ইরানের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করলেও অর্থনৈতিক মূল্য পুরো বিশ্বকে দিতে হচ্ছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করেছে কিন্তু এখন সেই যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ পুরো বিশ্বকে পরিশোধ করতে হবে-এটা একেবারে অযৌক্তিক।

সামরিক উপস্থিতি নিয়ে কড়া বার্তা তেহরানের

পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে কোনো দেশ সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখলে ইরান সেটিকে আগ্রাসনে সরাসরি সহায়তা হিসেবে দেখবে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই এ হুঁশিয়ারি দেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্ভাব্যভাবে ‘অবদান রাখার’ বিষয়টি বিবেচনা করছে—এমন বক্তব্যের পর ইরান এই সতর্কবার্তা দিল।

ইসমাইল বাঘেই বলেন, ইরান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্মান রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার সময় পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে কোনো দেশ সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখলে বা সামরিক অভিযানে অংশ নিলে, ইরান সেটিকে আগ্রাসনে সরাসরি সহায়তা হিসেবে দেখবে।

তিনি বলেন, এর ফলে ওই দেশকে গুরুতর পরিণতির মুখে পড়তে হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, কোনো সার্বভৌম ও দায়িত্বশীল দেশেরই যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও হুমকির কাছে নতি স্বীকার করা উচিত নয়। একই সঙ্গে তিনি দক্ষিণ কোরিয়াকে ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসী কর্মকাণ্ড ও ভয়াবহ অপরাধে’ জড়িয়ে না পড়ার আহ্বান জানান।

এর আগে, অস্ট্রেলিয়ার সম্প্রচারমাধ্যম এসবিএসকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, হরমুজ

প্রণালিতে নৌবাহিনী মোতায়েনের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া ‘চূড়ান্ত ও বাস্তব প্রস্তুতি’ নিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে নৌবাহিনী পাঠানোর জন্য আমরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত মোতায়েনের অংশ হিসেবে পি-৮ সামুদ্রিক টহল বিমান, বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণে বিশেষজ্ঞ একটি দল এবং একটি লজিস্টিক সহায়তা জাহাজ রাখা হচ্ছে।