মাওঃ মোঃ শামছুল ইসলাম

কুরবানির বিধান যুগে যুগে সব শরিয়াতেই বিদ্যমান ছিল। মানব সভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে প্রমাণিত যে, পৃথিবীর সব জাতি ও সম্প্রদায় কোনো না কোনোভাবে আল্লাহর দরবারে তার প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করতেন। উদ্দেশ্য একটাই- আল্লাহ তা'য়ালার সন্তুষ্টি অর্জন।

কুরবানি শব্দটি আরবি কোরবান শব্দ থেকে উদ্ভূত।

এর অর্থ সান্নিধ্য বা নৈকট্য লাভ ।

মুসলিম জীবনে কুরবানির গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআন এবং সুন্নাহর আলোকে কুরবানির বর্ননা সংক্ষেপে উপস্থাপিত হলোঃ

আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কুরবানির এক বিশেষ রীতি পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি, যেন তারা ওই সব পশুর ওপর আল্লাহর নাম নিতে পারে, যা আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন।’ (সুরা হজ: ৩৪)

আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, সুতরাং আপনি আপনার প্রতিপালকের জন্য নামাজ এবং কুরবানি আদায় করুন।( সূরা কাওসার : ২)

আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, আপনি বলুন, নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মৃত্যু; সবই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহ তা'য়ালার জন্য।’ (সুরা আনআ’ম : ১৬২)

জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর রাসূলকে জিজ্ঞেস করলেন,

কুরবানি জিনিস কি ? জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বললেন, কুরবানি হলো তোমাদের পিতা ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নত! সাহাবায়ে কেরাম পুনরায় বললেন হে আল্লাহর রাসূল তাতে আমাদের ফায়দা কি? তিনি বললেন, এর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে। ( ইবনে মাজাহ)

আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, ঈদের দিনে আদম সন্তানের সবোকৃষ্ট আমল হলো কুরবানি করা।

( ইবনে মাজাহ ,তিরমিজি)

কুরবানি সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশনা:

কুরবানি হলো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের অনন্য মাধ্যম। কুরবানির শুরু হয়েছিল হজরত আদম আলাইহিস সালামের দুই ছেলে হাবিল ও কাবিলের মধ্যে সংঘটিত কুরবানির মাধ্যমে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে রাসূল! আপনি তাদেরকে আদমের পুত্রদ্বয়ের বৃত্তান্ত যথাযথভাবে পাঠ করে শুনান। যখন তারা উভয়েই কুরবানি করেছিল, তখন একজনের কুরবানি কবুল হলো এবং অন্যজনের কুরবানি কবুল হলো না।

সে (কাবিল) বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব।

অপরজন (হাবিল) বলল, অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকিদের কুরবানি কবুল করেন।

সে (হাবিল) বলল, যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে আমার দিকে হস্ত প্রসারিত কর, তবুও আমি তোমাকে হত্যা করতে তোমার প্রতি হস্ত প্রসারিত করব না। কেননা আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।’

(সুরা মায়েদা : ২৭-২৮)

এ হলো কুরবানি কবুল হওয়া ব্যক্তির ভাবাবেগ ও মানসিকতা। কেননা কুরবানি তাকওয়াবান লোকদের আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অনন্য নিদর্শন।

কুরবানির প্রচলন হজরত আদম আলাইহিস সালামের যুগ থেকে শুরু হলেও মুসলিম উম্মাহ কুরবানি মূলতঃ হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের আল্লাহর সন্তুষ্টির পরীক্ষায় হজরত ইসমাইল আলাইহি সালামকে কুরবানির স্মৃতিময় ঘটনা নিজেদের মধ্যে বিরাজমান করা।

আল্লাহ তাআলা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে কঠিন অগ্নি পরীক্ষায় ফেলেছিলেন এ কুরবানির নির্দেশ প্রদান করে। যা তিনি হাসিমুখে পালন করে আল্লাহর প্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, ‘যখন ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে তাঁর পালনকর্তা কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা করলেন, অতঃপর তিনি তা পূর্ণ করলেন, তখন তিনি বললেন, আমি তোমাকে মাবনজাতির নেতা বানিয়ে দিলাম।’ (সুরা বাকারা : ১২৪)

কেন কুরবানির প্রচলন!

হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম যখন চলাফেরা করার বয়সে উপণীত হলেন; তখন হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তাঁর প্রাণপ্রিয় সন্তানকে আল্লাহর রাস্তায় কুবানির জন্য স্বপ্নে আদিষ্ট হন। আর নবিদের স্বপ্নও ‘ওহি’ বা আল্লাহর প্রত্যাদেশ।

তখন হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম পুত্র ইসমাইলকে বললেন, ‘হে স্নেহাস্পদ সন্তান! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে যবেহ করছি। এ বিষয়ে তোমার অভিমত কি?

সে (হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম) বলল, ‘পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তা পালন করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।’ (সুরা সাফফাত : ১০২)

৯২ বছরের বৃদ্ধ হজরত ইবরাহিম (আঃ) তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্রকে আত্মনিবেদনে আল্লাহ তা'য়ালা যে পরীক্ষার সম্মুখীন করেছিলেন। আর তিনিও মিনা প্রান্তরে প্রাণাধিক সন্তানকে কুরবানির যে নির্দেশ পালন করেছিলেন।

আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে তাঁর মানসিকতা আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে গিয়েছিল। যা আজও মুসলিম উম্মাহ প্রতিবছর জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ এ তিন দিনের যে কোনো একদিন পালন করে থাকেন।

কিভাবে কোরবানি আদায় করতে হবে:

ছাগল-বকরি ,ভেড়া- দুম্বা, গরু-মহিষ ও উট দ্বারা কুরবানি আদায় করতে হবে। প্রতিটি জন্তু মোটা তাজা ও নিখুঁত হওয়া জরুরী।

ছাগল- বকরি, ভেড়া- দুম্বার বয়স এক বছর পূর্ণ হতে হবে

এবং এগুলো একজনের পক্ষ থেকে কুরবানি করা যায়।

গরু-মহিষের বয়স দুই বছর পূর্ণ হতে হবে এবং এগুলো সাত জনের পক্ষ থেকে কুরবানি করা যায়।

উটের বয়স পাঁচ বছর পূর্ণ হতে হবে এবং সাতজনের পক্ষ থেকে কুরবানি করা যায়।(বুখারী, মুসলিম, তিরমিজি)

যবেহ করার পদ্ধতি:

১/ কুরবানির জন্তুর মাথা দক্ষিণ দিকে কাঁত করে শুইয়ে এবং চেহারা কিবলামুখী থাকবে

২/যবেহকারী কিবলামুখী হয়ে যবেহ করবে

৩/ ধাঁরালো অস্ত্র দিয়ে যবেহ করবে

৪/দোয়া পাঠ করা এবং উচ্চস্বরে বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলা

৫/ যবেহ করার সময় চারটি রগ কাটা ,যেমন শ্বাসনালী খাদ্যনালী ও রক্তনালীর ২টি মোটা রগ।(আলমগীরী ৫ম খন্ড)

কুরবানির চারটি মৌলিক কথা মনে রাখতে হবে:

১.পরিশুদ্ধ নিয়ত ২.হালাল টাকায় কুরবানি ৩.শরীয়ত মোতাবেক কুরবানি ৪.রিয়ামুক্ত কুরবানি।

আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, আল্লাহর কাছে কুরবানির জন্তুর গোশত রক্ত পৌঁছায় না বরং তাঁর কাছে তোমাদের তাকওয়া পৌঁছায়।( সূরা হজ্জ: ৩৭)

আবু হুরায়রা (রা.)থেকে বর্ণিত,রাসুল (সা.) বলেন,যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটে না আসে। ( ইবনে মাজাহ)

আল্লাহ তা'য়ালা মুসলিম উম্মাহকে লোক দেখানোর জন্য কুরবানি নয় বরং পশুকে যবাইয়ের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে মনের পশুত্ব ও আমিত্বকে যবাই করার তাওফিক দান করুন। কুরবানির মাধ্যমে নিজেকে তাকওয়াবান হিসেবে তৈরি করার তাওফিক দান করুন। আমিন।