মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ (১৯২৮) উপন্যাসটি তাঁর পরিণত বয়সের (৬৭ বছর) শ্রেষ্ঠ গদ্যশিল্প। এটি বুদ্ধিবৃত্তি ও কাব্যিক নন্দনের চূড়ান্ত সংহতি এবং আধুনিক উপন্যাসের আত্মবিদ্রুপের নতুন দিগন্ত স্বরূপ। ‘শেষের কবিতা’র প্রথম শিরোনাম ছিল ‘মিতা’। পরবর্তীকালে তা পরিবর্তন করে এর নামকরণ করা হয় ‘শেষের কবিতা’। নির্মলকুমারী মহলানবিশ-লিখিত ‘কবির সঙ্গে দাক্ষিণাত্যে’ (১৯৬৩) গ্রন্থে ‘শেষের কবিতা’-রচনার একটি পটভূমিও বর্ণিত রয়েছে।

বাংলা সাহিত্যজগতে নন্দনতাত্ত্বিকভাবে পরিপক্ব অনন্য ব্যতিক্রমী এক সৃষ্টি এই ‘শেষের কবিতা’Ñ যেখানে প্রেমের উপন্যাস, সাহিত্য-আলোচনা, আত্মসমালোচনা, আধুনিকতা-উত্তরাধুনিকতা এবং ভাষার সৌন্দর্য এক সুতায় গেঁথে গিয়েছে। এটি শুধু প্রেমের কাহিনি নয়; বরং এটি রবীন্দ্রনাথের শিল্পবোধ ও বিরহের দর্শন এবং নতুন যুগের সঙ্গে কথোপকথনের মহিমান্বিত এক স্বর। বাংলা উপন্যাসে রূপ, ভাষা ও চরিত্র-ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ‘শেষের কবিতা’ এক ধরনের মাইলফলক; যা আজও পাঠককে চমকে দেয় এবং সাহিত্যতাত্ত্বিকদের কাছে এক অমোঘ টেক্সট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। উপন্যাসটি একদিকে যেমন আধুনিকতার বয়ান; তেমনি অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের নিজের সাহিত্যিক সত্তার পরিহাস এবং একটি কাব্যিক আত্মসমালোচনাও। লেখক উপন্যাসটিকে ‘ফ্যাশন বা মুখোশ’ নয়; বরং বাংলা সাহিত্যে এক ভিন্ন ‘স্টাইল বা মুখশ্রী’ রূপে সংযোজন করেছেন।

বিশ্বসাহিত্যে যে ক’টি বাংলা উপন্যাস আধুনিকতার সঙ্গে বাঙালি জীবন ও মননকে জুড়ে দিতে সক্ষম হয়েছে, ‘শেষের কবিতা’ তার মধ্যে উজ্জ্বলতম। অমিত, লাবণ্য, কেতকী এবং শোভনের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ কেবল এক প্রেমকাহিনি নির্মাণ করেননি; বরং নির্মাণ করেছেন স্বাধীনতা, আত্মসমালোচনা, বোধ, ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক অভিঘাতের জটিল এক দার্শনিক সমাহার।

উপন্যাসটি ১৭টি শিরোনামে বিভক্ত: ১. অমিত চরিত ২. সংঘাত ৩. পূর্ব ভূমিকা ৪. লাবণ্য পুরাবৃত্ত ৫. আলাপের আরম্ভ ৬. নূতন পরিচয় ৭. ঘটকালি ৮. লাবণ্য তর্ক ৯. বাসা বদল ১০. দ্বিতীয় সাধনা ১১. মিলন তত্ত্ব ১২. শেষ সন্ধ্যা ১৩. আশঙ্কা ১৪. ধূমকেতু ১৫. ব্যাঘাত ১৬. মুক্তি ১৭. শেষের কবিতা। উক্ত শিরোনামগুলোকে তিনটি স্তরে বিন্যস্ত করে উপন্যাসটির আলোচনা করা যায়: ১. কাঠামো ও বয়ানভঙ্গি ২. চরিত্র, প্রেম ও দ্বৈত-দর্শন ৩. রবীন্দ্র-নান্দনিকতা ও সময়-সমালোচনা। ‘দ্যা লাস্ট পোয়েম’ শিরোনামে ‘শেষের কবিতা’র ইংরেজি অনুবাদ করেন অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়।

একে কাব্যধর্মী রোমান্টিক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসও (poetic nobel) বলা যায়; কারণ এ-গ্রন্থে ছোটো-বড়ো প্রায় ১৪টি কবিতা বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া বিশ্ববিখ্যাত কবি জন ডন (১৫৭২-১৬৩১), ওয়াল্ট হুইটম্যান (১৮১৯-১৮৯২), আর্থার সাইমন (১৮৬৫-১৯৪৫), ক্যাথরিন তিনান হিঙ্কশন (১৮৬১-১৯৩১) এবং জন কীট্স (১৭৯৫-১৮২১) প্রমুখের বিখ্যাত কবিতার পঙ্ক্তির উদ্ধৃতিও রয়েছে এ-উপন্যাসে। সর্বোপরি উপন্যাসটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংরেজ কবি জন ডনের নান্দনিক পঙ্ক্তি “ফর গড্’স সেক, হোল্ড ইওর টাং অ্যান্ড লেট মি লাভ” বাক্যটি ব্যবহার করে রোমান্টিকতার উচ্চাঙ্গের বোধ সৃষ্টি করেছেন।

উপন্যাসটি বয়ানভঙ্গি ও কাঠামো বর্ণনার আলোকছায়ায় এটি লেখকের বহুমাত্রিক এক শৈলী হয়ে উঠেছে। এর প্রথম বৈশিষ্ট্য তার জটিল বয়ান ও স্বগতোক্তিমূলক প্রবাহ। উপন্যাসটি মূলত দুইটি সম্পূরক সময়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে: ১. লাবণ্য ও অমিতের সম্পর্কের ক্রমোন্নতি ও ক্রমবিয়োগ ২. প্রেম ও আত্মপর্যালোচনার মধ্যেকার টানাপোড়েন। রবীন্দ্রনাথ বয়ানকে সরল ধারাবাহিকতায় সাজাননি; বরং চরিত্রের মনস্তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে তৈরি করেছেন অভ্যন্তরীণ চেতনার পূর্বাভাসমূলক এক ধারা। লাবণ্য-অমিতের সংলাপ, অমিতের ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য, লাবণ্যের নীরবতার ভাষাÑসব মিলিয়ে উপন্যাসটির পাঠ ফুলের মালার মতো গ্রথিত হয়।

উপন্যাসটির শক্তি তার ভাষার বৈচিত্র্য ও ছন্দে। অমিতের ইংরেজি-দক্ষতা, পাশ্চাত্য-প্রভাবে মিশ্রিত বাংলা, আর লাবণ্যের শুদ্ধ, পরিচ্ছন্ন, স্নিগ্ধ সৌন্দর্যমণ্ডিত ভাষাÑ দ্বৈতধারার এই মিশ্রণ রবীন্দ্রনাথের ভাষার নতুন পরীক্ষা। লাবণ্যের চিঠি epistolary tradition অর্থাৎ ‘চিঠিভিত্তিক যোগাযোগ’-এ অনন্য; ভাষা কখনও কবিতার মতো, কখনও আত্মদর্শনের মতো। এখানে রবীন্দ্রনাথ চিঠিকে শুধু মাধ্যম হিসেবে নয়; সাহিত্যের স্বাধীন নান্দনিক এক প্রকরণ হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

উপন্যাসে অমিত লাবণ্যকে কবিতা শোনায়; লাবণ্য অমিতকে নিজস্ব নীরবতার ভাষা শোনায়। কবিতা এই উপন্যাসে আলাদা রীতি হিসেবে নয়; বরং প্রেমের রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই কৌশল বাংলা উপন্যাসে এক অনন্যতা সৃষ্টি করেছে; যেখানে বয়ানকে ভাঙা-গড়া করে কবিতার আবেশে পাঠককে দোলায়িত করা হয়েছে।

অমিত বিদদ্রƒপ ও বুদ্ধিবৃত্তির প্রতীক। তিনি উপন্যাসে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, শহুরে এবং রসাত্মক-এক অনন্য চরিত্র। তিনি বাঙালি মধ্যবিত্ত যুবককে নতুন আলো দেখিয়েছেন। অমিত সমাজ-বিরোধী নন; বরং দ্বৈত সামাজিক সত্তার ভেতর দিয়ে নিজের স্বাধীনতা খুঁজে বেড়ানো আধুনিক এক মানব।

আধুনিক ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে অমিত চরিত্রে, প্রেমে ও দ্বৈত দর্শনে অনন্য। অমিত চট্টোপাধ্যায় বাংলা উপন্যাসে এক নবযুগের প্রতিনিধি; যিনি বিদ্রƒপপ্রিয়, সাহিত্যে স্বাধীন স্বর এবং ব্যক্তিবাদী। অমিতকে রবীন্দ্রনাথ তৈরি করেছেন একরকম ‘আত্ম-সাহিত্যিক ব্যঙ্গের পাত্র’ হিসেবে। অনেক সমালোচক মনে করেন: অমিত আসলে রবীন্দ্রনাথের নিজের সাহিত্যচর্চারই এক প্রতিবিম্ব; যে নিজের লেখাকে নিজের মধ্যেই খণ্ডন করতে চান। অমিতের মধ্যে আধুনিক পশ্চিমা শিক্ষা, রোমান্টিকতা এবং ‘উদার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ’Ñ সব মিলিয়ে এক নতুন চরিত্ররূপ দাঁড়ায়।

লাবণ্য অনিন্দ্য নীরবতার এক প্রতিমূর্তি। লাবণ্য বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পরিপূর্ণ নারীচরিত্র। তিনি বুদ্ধিমতী, শিক্ষিতা, স্বাবলম্বী; কিন্তু তার ব্যক্তিত্বের মূল সুরÑ মিতভাষী, অভ্যন্তরীণ বোধের গভীরতা এবং অমিতকে না পাওয়ার সিদ্ধান্তেও দৃঢ়তা। লাবণ্যের অন্যতম শক্তি হলো, তিনি অমিতকে জয় করতে চান না; বরং সম্পর্ককে এমন একটি বিন্দুতে নিয়ে যেতে চান যেখানে প্রেম ও যৌক্তিকতা সমান্তরালে চলে। লাবণ্যের সিদ্ধান্তÑ অমিতের সঙ্গে নয়; বরং শোভনের সঙ্গে জীবনযাপনÑ রোমান্টিক উপন্যাসের ধারা ভেঙে দেয়। এর মধ্যে আছে নারীর নিজের প্রতি দায়বদ্ধতাÑ যা উপন্যাসটি লেখার সমকালীন (১৯২৮) সাহসী এবং দৃষ্টান্তমূলক প্রয়াস। জনৈক সমালোচক বলেন: “লাবণ্য রবীন্দ্রীয় নারীর স্বাধীনতা ও বোধের সবচেয়ে পরিণত প্রতিমূর্তি।” তিনি প্রেমের আবেগে ভেসে যান না; বরং প্রেমকে নিজের মূল্যবোধ ও আত্মসম্মানের আলোয় বিচার করেন।

অমিত-লাবণ্যের প্রেম যেন দার্শনিক দ্বৈত সুরÑ তাদের প্রেম বাংলা সাহিত্যের প্রচলিত সংজ্ঞার্থকে অতিক্রম করে। এটি পূর্ণতা পেতে গিয়েও অপূর্ণ থেকে যায় এবং ঠিক এই অপূর্ণতাই উপন্যাসটিকে অনন্ত করে তোলে। অমিতকে না পাওয়ার মধ্যেই লাবণ্য অমিতকে চিরস্মরণীয় করে রাখে। লাবণ্য ঘোষণা করে: “ওগো তুমি নিরুপম,/ হে ঐশ্বর্যবান,/ তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান;/ গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।/ হে বন্ধু, বিদায়।” আর অমিতও উপলব্ধি করে: প্রেম সবসময় মিলনে পরিণত হলে তার গভীরতা নষ্ট হয়। তাই অমিত জানায়: “কেতকীর সঙ্গে আমার সম্বন্ধ ভালোবাসারই; কিন্তু সে যেন ঘড়ায়-তোলা জল, প্রতিদিন তুলব, প্রতিদিন ব্যবহার করব। আর লাবণ্যর সঙ্গে আমার যে ভালোবাসা সে রইল দিঘি; সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাতে সাঁতার দেবে।” এই দর্শন রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘদিনের প্রেমতত্ত্বেরই পরিণত এক রূপ।

শোভন ও কেতকী ভিন্ন পরিমণ্ডলের দুই পাত্র-পাত্রী। শোভনÑযিনি লাবণ্যর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তিনি রক্ষণশীল, মধ্যবিত্ত স্থিতিশীলতার একটি প্রতীক। অমিতের জীবনসঙ্গিনী কেতকীÑ সহজ, সামাজিক, বুদ্ধিজীবী একটি পরিবারের পরিমিত ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা চরিত্র। তাদের উপস্থিতি উপন্যাসে ‘স্ট্রাকচার’ তৈরি করে। রবীন্দ্রনাথ এ উপন্যাসে প্রচলিত প্রেমকাহিনির ত্রিভুজ তৈরি করেছেন; কিন্তু সেই ত্রিভুজে সংঘাত নয়; নান্দনিক সমঝোতা সৃষ্টি হয়।

সমালোচকদের মতে, কেতকী ও শোভন উপন্যাসের কেবল সহায়ক চরিত্র নয়; বরং তারা বিকল্প বাস্তবতার প্রতীক; শোভনÑ নিরাপদ, শৃঙ্খলিত ও বাস্তববাদী; কেতকীÑ সাধারণ, সহজ ও সংসারমুখী। তাদের উপস্থিতি অমিত-লাবণ্য সম্পর্ককে অনবদ্য দর্শনীয় এক পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। “অমিত লাবণ্যকে পায় না; লাবণ্যও অমিতকে পায় না। এই না পাওয়ার মধ্যেই দুজনের পাওয়া”Ñএই দর্শনই বিশ্বসমালোচকের কাছে উপন্যাসটির সবচেয়ে অনন্য দিক।

উপন্যাসটি নন্দন-দর্শন, আধুনিকতা, রবীন্দ্র-সমালোচনা, স্ববিরোধী ও রসাত্মক আত্মসমালোচনার প্রতীক। রবীন্দ্রনাথ ‘শেষের কবিতা’তে নিজের সাহিত্যসমালোচনাই করেছেন অমিতের মুখ দিয়ে। এখানেই উপন্যাসটি অনন্য। এটি রবীন্দ্র-সাহিত্যের উপর রবীন্দ্রনাথেরই এক ‘meta-critique’ অর্থাৎ- সমালোচনার সমালোচনা বা তার চুলচেরা বিশ্লেষণ। তিনি নিজের কবিত্ব, রোমান্টিকতা, প্রেমের উপাখ্যান-এ সবকিছুকে অমিতের মুখ দিয়ে হাস্যরসের মধ্যে ভেঙে ফেলেছেন। অমিতের বিখ্যাত মন্তব্যÑ “রবীন্দ্রনাথকে আমি অনেকদিন আর পড়ব না”Ñএটি শুধু বিদ্রƒপ নয়; সাহিত্যের প্রতি রবীন্দ্রনাথের নিজেরই স্বচ্ছ ও সত্যনিষ্ঠ এক দৃষ্টিভঙ্গি।

এ উপন্যাসে আমরা তিনটি আত্মসংঘাতের রূপ দেখতে পাই। এক. এখানে রয়েছে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি বনাম বাঙালি সত্তা ও যুক্তিবাদ বনাম সহমর্মিতা (অমিত); দুই. দেহী-প্রেম বনাম অনাশ্রয়ী প্রেম (লাবণ্য) এবং তিন. সামাজিক নিয়ম বনাম ব্যক্তিস্বাধীনতা (কেতকী)। এই সংঘাত উপন্যাসটিকে আধুনিকতার চূড়ান্ত চিত্র করে তোলে। ‘শেষের কবিতা’ আধুনিকতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা নবীন বাঙালি এক মানুষের আত্মপরিচয়ের সংগ্রামও বটে।

রবীন্দ্রনাথ এখানে বিচ্ছেদের নন্দন-দর্শনকে প্রেমের এক সৌন্দর্যবোধের আলোকযাত্রা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। প্রেমের সার্থকতা মিলনে নয়; বরং প্রেমের গভীরতা নীরবতার মধ্যে। লাবণ্যের শেষ চিঠিতেÑ“তোমার কাছে আমার পাওয়া হলো নাÑ এই না পাওয়াই আমার পাওয়া”Ñ এই উক্তি শুধুই চরিত্রের সংলাপ নয়; রবীন্দ্রনাথের সর্বজনীন প্রেমদর্শনের সারমর্ম।

বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সমালোচকের অভিমত: এটি রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে নিপুণভাবে নির্মিত উপন্যাস। অমিত-লাবণ্যর সম্পর্ক আধুনিক প্রেম-দর্শনের নতুন ধারা। উপন্যাসটি এক ধরনের সেল্ফ প্যারোডি বা নিজের কাজের হাস্যরসাত্মক অনুকরণ; যেখানে রবীন্দ্রনাথ নিজের সাহিত্যিক রোমান্টিকতাকে নিজেই ব্যঙ্গ করেছেন।

কেন ‘শেষের কবিতা’ কালজয়ী একটি উপন্যাস? তার কারণ: ১. ভাষার দ্যুতি ও সংলাপের শিল্প ২. আধুনিক প্রেম-ধারণার পরিণত রূপ ৩. চরিত্রের গভীর মনস্তত্ত্ব ৪. আত্মসমালোচনার অনন্য রসাত্মক প্রকাশ ৫. অমিত ও লাবণ্যের সম্পর্কের দার্শনিক মূল্য ইত্যাদি কারণে এটি কালজয়ী উপন্যাস। বাংলা সাহিত্যে প্রেমের উপন্যাস অসংখ্য; কিন্তু ‘শেষের কবিতা’র মতো নান্দনিক ও বৌদ্ধিক উচ্চতায় কোনো প্রেমকাহিনি পৌঁছুতে পারেনি। এটি প্রেমের উপন্যাস নয়, প্রেমকে নিয়ে দার্শনিক এক টেক্সট। এখানে প্রেমের পরিণতি নয়Ñপ্রেমের অনুভবই মুখ্য। রবীন্দ্রনাথ এই উপন্যাসে প্রেমকে বিনাশ করেননি; তাকে অনন্ত এক আলোকবৃত্তে স্থাপন করেছেন; যেখানে অপূর্ণতা হয়ে উঠেছে পূর্ণতার আরেক নাম।

‘শেষের কবিতা’ বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী একটি রোমান্টিক উপন্যাস হলেও প্রথাগত উপন্যাসের কাঠামোর দিক থেকে বিচার করলে এতে বেশ কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি বা অপূর্ণতার দিক লক্ষ করা যায়। উপন্যাসের মূল ভাবাবেগ, দর্শন এবং ভাষার চমৎকারিত্বের আড়ালে সমালোচকরা কিছু দুর্বলতা চিহ্নিত করেছেন। তাঁরা সার্থক উপন্যাস হিসেবে ‘শেষের কবিতা’র ত্রুটি-বিচ্যুতিসমূহ এভাবে বিশ্লেষণ করেছেন:

প্লট বা কাহিনীর অভাব : প্রথাগত উপন্যাসে যে-ধরনের জটিল কাহিনি বা ঘটনার ঘনঘটা থাকেÑ শেষের কবিতায় তার অভাব রয়েছে। এটি মূলত চরিত্রদের কথোপকথন, দর্শন এবং প্রেমের অনুভূতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

‘অমিত’ চরিত্রের অতিরঞ্জন ও বাচালতা: নায়ক অমিত রায় অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও উচ্চশিক্ষিত হলেও উপন্যাসে তার সংলাপ বা বাচালতা অনেক সময় ক্লান্তি তৈরি করে। তার প্রতিটি কথোপকথন ও চিঠিতে যেন লেখক রবীন্দ্রনাথই বেশি কথা বলেছেন বলে মনে হয়।

নারীদের ওপর অমিতের একচ্ছত্র আধিপত্য: উপন্যাসের সব নারীচরিত্রÑ লাবণ্য, কেতকী, সিসি, লিসি সবাই অমিতকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। অমিতের অভিনবত্ব ও আভিজাত্যের আড়ালে নারী-চরিত্রগুলো যেন তাদের নিজস্ব সত্তা হারিয়ে ফেলে।

বাস্তবতার অভাব ও বায়বীয় প্রেম: উপন্যাসের প্রেমটি বাস্তব জীবনের আটপৌরে সম্পর্কের চেয়েও যেন বেশি বায়বীয় বা রোমান্টিক। শিলং-এর পটভূমিতে প্রেমকাহিনিটি অনেক বেশি কাব্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক; যা সাধারণ মানুষের বাস্তব প্রেমের জটিলতা থেকে দূরে অবস্থান করে।

কবিতার আধিক্য: উপন্যাসের নামের মতোই এতে কবিতার বাহুল্য রয়েছে। অনেক জায়গায় সংলাপগুলো উপন্যাসের গদ্যের স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করে কবিতার মতো হয়ে উঠেছে; যা কথাসাহিত্যের বিচারে ত্রুটি হিসেবে গণ্য হতে পারে।

প্রেমের পরিণতিতে অস্বস্তি: লাবণ্য অমিতকে ভালোবাসলেও শেষপর্যন্ত শোভনলালকে বিয়ে করে; আর অমিত কেতকীকে। এই বিচ্ছেদ বা পরিণতি অনেকের কাছে কিছুটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং রোমান্টিক আবেগের সাথে বেমানান বলে মনে হয়।

উল্লিখিত ত্রুটিগুলো সত্ত্বেও ‘শেষের কবিতা’র কাব্যিক ভাষা, উন্নত মানসিকতার প্রেম এবং দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি একে বাংলা সাহিত্যে অনন্য একটি স্থান দিয়েছে। সমালোচকরা মনে করেন: এটি প্রথাগত উপন্যাসের ছাঁচে না-পড়লেও, একটি ‘মানস-উপন্যাস’ (Novel of the Mind) হিসেবে এর সার্থকতা প্রশ্নাতীত। প্রেম, দর্শন, ব্যঙ্গ ও ভাষাশৈলীÑসমস্ত কিছু মিলিয়ে এটি বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য শিল্পসৃষ্টি। তাই প্রেম, দর্শন এবং আধুনিক মনস্তত্ত্বের অপূর্ব এক মিশ্রণে এটি চিরায়ত উপন্যাস। এ জন্য ‘শেষের কবিতা’ প্রকাশের প্রায় এক শতাব্দী পর এটি এখনও প্রাসঙ্গিক।