মাহমুদ হাসান ফাহিম

ফজরের সময় হয়ে গেছে। মুয়াজ্জিনে আযান শুনে বিছানা ছেড়ে উঠে নাহিদ। পরনে ছেঁড়া জামা আর শপিং ব্যাগে দুটি শার্ট নিয়ে বেরিয়ে পরে ও। গোয়াল ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে হালকা আওয়াজে গলা খাঁকারি দিয়ে ডাক দেয় ইরফানেরকে। আস্তে করে বেরিয়ে আসে বন্ধু ইরফান। সন্তর্পণে পা বাড়ায় নতুন পথের দিকে। বেরিয়ে পরে অজানা গন্তব্যের খোঁজে।

রাস্তায় দু’একজন পথচারীর আনাগোনা। ঘন কুয়াশায় হালকা হয়ে যাওয়ার পর দূরে থাকা কাউকে দেখতে যেমন মনে হয়, অনুমান করা যায় কোনো মনবমূর্তির কায়া, তেমনই মনে হচ্ছে ওদের। ভয় ভয় করছে। কেউ দেখে ফেললে সব স্বপ্নই যে ভন্ডুল হয়ে যাবে। তবুও সাহস নিয়েই পা বাড়ায় দুই বন্ধু।

অজানা গন্তব্যের পথিক ওরা। গন্তব্যহীন এই সফরে কি হবে, কোনো চিন্তা নেই। কোথায় থাকবে, কি খাবে, কোথায় আশ্রয় নিবে? এসবের কোনো ভাবনা নেই। ওরা বেরিয়েছে জন্মভূমির খোঁজে। দুর্জয় হিম্মত আর অবিচলতাই তাদের পাথেয়। ‘ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়’

এই মন্ত্রই তাদের স্বপ্ন পূরণের পথ দেখাবে। পদেপদে তাদের সমস্যার সমাধান বাতলে দেবে। চরম ধৈর্য আর বুদ্ধি দিয়ে কাজ করলে সফলতা নিশ্চিত আসবে এটা ওদের বিশ্বাস।

চোখমুখে টানটান উত্তেজনা। চার বছর পর আজ মুক্ত আকাশে সূর্যের আলো দেখতে পেয়েছে ওরা। স্কুল থেকে ফেরার পথে নাহিদ ডাকাত দলের হাতে বন্দি হয়। ঝোঁপের আড়াল থেকে বেরিয়ে চারজন লোক ওর নাক-মুখ চেপে ধরে। তারপর আর কিছু বলতে পারে না ও। আর ইরফান বড় ভাইয়ের সাথে মেলায় ঘুরতে গিয়েছিল। ভাইয়ে পাঞ্জাবি ধরে ছিল, কিন্তু ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ ওর হাত ছুটে যায়। ভাইকে হারিয়ে ও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকে। একজন লোক এসে জিজ্ঞেস করে, কাঁদো কেন বাবা?

ইরফান কাঁদতে কাঁদতে বলে, ভাইয়ার সাথে এসেছিলাম। ভাইয়াকে পাচ্ছি না।

এসো আমার সাথে, তোমার ভাইয়ের কাছে নিয়ে যাই।

যাওয়ার সময় ওকে একটা রুটি খেতে দেয়। এরপর আর কিছুই মনে নেই।

চার বছর ধরে পরের গোলামী করে ওরা। জানে না ওদের জন্মভূমির নাম ঠিকানা। দীর্ঘদিন একসাথে থাকার সুবাদে দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়। এখন ওরা দু’জন খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দু’জন দু’জনের আপন। বিপদাপদে একজন অন্যজনের সাহায্যে এগিয়ে আসে। জমজ ভাইয়ের মতো একসাথে থাকে, খায়, একসাথেই চলাফেরা করে। সব কাজে এ ওর সহযোগিতা করে। আজ ওরা একসাথেই পালিয়েছে মা-বাবা আর পরিবার-পরিজনের খোঁজে।

প্রায় দু’ঘন্টা হাটার পর এক লোকের সাথে সাক্ষাৎ হয়। নাহিদ জিজ্ঞেস করে,

আংকেল, আমরা শহরে যাবো, সহজ পথ কোনটা?

ওই মোড় থেইক্যা সিএনজি পাইবা। পঞ্চাশ টাহা নিবো।

আধ ঘন্টার পথ অতিক্রম করে ওরা শহরে পৌঁছে। পনের মিনিট পর ঢাকার উদ্দেশ্যে ট্রেন ছাড়বে। কাউন্টারে আসার পর ট্রেন ছেড়ে দেয়। তাই টিকেট ছাড়াই ট্রেনে উঠে।

ওরা এখন স্বাধীন। নাহিদ বলল, শহরে গিয়ে আপতত কাজ করবো আর মনে মনে খুঁজতে থাকবো আমাদের জন্মভিটা। ওসব চিন্তা করিস না বন্ধু, আল্লাহই সব ব্যবস্থা করে দিবেন, ইরফানের উত্তর। একসময় ট্রেন থামল। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে, ‘বিমানবন্দর’ লেখা। সবাই নেমে পড়ছে। এক বগিতে ওরা দুই বন্ধু আর চারজন লোক বসা। প্লাটফর্মে অনেক মানুষের সমাগম। ইরফান বলল,

চল বন্ধু, এখানেই নেমে পড়ি। আর হ্যাঁ, ছেঁড়া জামা পাল্টে ভালো জামা পরে নিই।

ঠিক আছে, চল, তাহলে নেমে যাই। আল্লাহ অবশ্যই আমাদের পথ দেখাবেন, নাহিদ বলল।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। প্লাটফর্মের কোণায় এক বৃদ্ধ লোক চা বিক্রি করেছেন। খুব খিদে পেয়েছে ওদের। সাথে টাকা পয়সা যা আছে কোনোমতে দু’জন নাশতা হবে। দুই পিস রুটি আর দুটি কলা নিয়ে খেতে বসেছে ওরা। মুরুব্বি লোকটা মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। নাহিদ বিষয়টা খেয়াল করেছ। খাওয়া শেষ করে বিল দিতে গেলে বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করল,

তুমি নাহিদ না? আমাগো পশ্চিম পাড়ার লুকমানের ছেড়া?

মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। এই বুঝি ধরা পড়ে গেলাম। নিজেকে স্বাভাবিক করে মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলো নাহিদ। সাথে বাবার নাম শুনে ওর ভয় অনেকটা কেটে গেছে। মুখ খুলে বলল,

হ্যাঁ, আমি নাহিদ। আপনাকে চিনলাম না যে?

আমি তোমার হোসেন কাকা। উত্তর পাড়ার হোসোন আলী। গ্রামে থাকতে প্রতিদিন তোমরার বাড়িতে যাওয়া-আসা করতাম। পাঁচ বছর আগে ঢাহা আইছি কিন্তু তোমার মুখটা মনো আছে, তাই চিন্তে ভুল করি নাই। আইচ্ছা, অহন কই যাইবা?

বাড়িতে যাবো। ও আমার বন্ধু, আমাদের এলাকায় ঘুরতে যাবে।

বাড়িতে যাইতে যাইতে মেলা রাইত অইয়া যাইবো। রাইতটা আমার গরীবখানায় থাইক্যা সহাল সহাল যাইয়ো।

নাহিদ রাজি হলো। ওদের ভাগ্যাকাশে আনন্দের দ্যুতি খেলে গেলো। ইরফানের বলল,

দেখ বন্ধু, আল্লাহ আমাদের জন্য মঙ্গলের ফায়সালা করেছেন। উত্তম আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

মুরুব্বী তাদের রাতের খাবারের ব্যবস্থা করলেন। এবার নাহিদ আসল কথাটা বলার ইচ্ছা করলো। তারপর মুরুব্বিকে তাদের চার বছরের বৃত্তান্ত শোনালো। মুরুব্বি চোখের পানি আটকে রাখতে পারেননি। চোখের পানিতে দাড়ি ভিজিয়েছেন।

পুরো বৃত্তান্ত শুনে বললেন, কালকে আমি তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাবো। কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নাও।

সকালে নিজেই ওদেরকে নিয়ে যান।

নাহিদের বাড়ি ফিরার সংবাদ শুনে গ্রামের সবাই ওকে দেখতে আসে। বন্ধুর ছেলেকে দেখতে আসেন পাশের গ্রামের মকবুল হোসেন। এসে দেখেন তার ছেলে ইরফানও। তারপর ... মায়ের কোলে ফিরে আসার আনন্দ প্রকাশ করার ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।