ইকবাল কবীর মোহন : দেশজুড়ে চলছে চরম দুর্ভিক্ষ। মদিনার ঘরে তাই চলছে হাহাকার। বেশির ভাগ মানুষ না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। মানুষ খাবারের খোঁজে পাগলের মতো ছুটছে। ছুটছে কাজের সন্ধানে। কিন্তু কে দেবে কাজ? কাজের অভাবও ভয়ানক রূপ ধারণ করল। কোথাও কোনো কাজ নেই। নেই খাবারও। চারিদিকে চলছে এক মহাদুর্ভিক্ষ। শিশুরা খাবারের জন্য চিৎকার করে কাঁদছে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা খাবারের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাদের অনেকে কান্নার শক্তিও যেন হারিয়ে ফেলেছে। কঙ্কালসার দেহ যেন ওদের। কে দেখবে এসব অবুঝ শিশুকে। তাদের মা-বাবাও আজ বড়ই অসহায়। শক্ত সমর্থ লোকেরাও না খেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

এদিকে শহরে খাবারের যা কিছু চালান আসছে তা সাথে সাথেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ধনী লোক ও সওদাগররা এসব খাবার তৎক্ষণাৎ লুফে নিচ্ছে। বড় বড় ব্যবসায়ীরা কালোবাজারি করছে। তারা খাদ্যদ্রব্য কিনে তা জমিয়ে রাখছে। আর ধনীদের তো অর্থের অভাব নেই।

অর্থের জোরে তারা যত খাবার পাচ্ছে তার সবই কিনে নিচ্ছে। ফলে দুর্বল লোকেরা খাবার সংগ্রহ করতে পারছে না। কী আর করবে এসব দীন-হীন মানুষগুলো? কিভাবে বাঁচাবে ওরা? তারা কোথায় পাবে খাবার? সবমিলে চারিদিকে এক ভয়ানক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। মদিনার অলিতে-গলিতে চলছে হাহাকার। চারিদিকে শুধু বুভুক্ষু মানুষ আর জীর্ণ-শীর্ণ শিশুদের দল চোখে পড়ছে। মায়েরা পেটে পাথর বেঁধে অবুঝ বাচ্চাদের বুকে নিয়ে অঝোরে কাঁদছে। বাবা তার অসহায় অবস্থার জন্য বুক চাপড়াচ্ছে। সবাই তাকিয়ে আছে সরকারের দিকে। তারা যদি সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসেন। দেখতে দেখতে কেটে গেল বেশ কিছু দিন। দুঃখের আঁধার যেন আর শেষ হয় না। বরং তা দিনকে দিন বেড়েই চলল।

একদিন মদিনায় ঘটল এক আকস্মিক ঘটনা। মদিনার রাস্তায় হঠাৎ এক বিশাল উটের কাফেলা দেখা গেল। সিরিয়া থেকে গম, তেল, আর মনাক্কা বোঝাই করে উটের কাফেলা ঢুকল মদিনায়। এক হাজার উটের বিশাল সেই কাফেলা। উটের কাফেলা দেখে নিরাশ মানুষেরা উৎফুল্ল¬ হলো। খুশিতে তাদের বুক ভরে উঠল। তারা ভাবল, এবার হয়তো তাদের দুঃখ ঘোচবে। খাবারের একটা ব্যবস্থা হয়তো হয়ে যাবে। কিন্তু সবার প্রশ্ন একটাই। কার এই কাফেলা? এদিকে দেখতে দেখতে উটের কাফেলা গিয়ে থামল হজরত উসমান (রা)-এর বাড়ির সামনে। ধনী ব্যবসায়ী আর সওদাগররা তো মহাখুশি। খুশি এ জন্য যে, এবার ভালো ব্যবসা করা যাবে। অনেক মুনাফার সুযোগও হবে। তাই ব্যবসায়ীরা হজরত উসমান (রা)-এর বাড়িতে গিয়ে জড়ো হলো। কেউ কেউ আগ বাড়িয়ে গম, তেল আর মনাক্কার দাম বাড়াতে লাগল। নানাজন নানান দাম হাঁকল। ফলে দ্রব্যের দাম গেল বেড়ে।

হজরত উসমান (রা) এসব দৃশ্য সবই দেখছিলেন। তিনি সব জেনে শুনে একবার বললেন, ‘না, না তা হবে না, আমার মালামালের আরও বেশি দাম চাই।’ এ কথা শুনে সওদাগররা অবাক হলো। কেননা, তারা উসমান (রা)-কে ভালো করেই জানে। তিনি আগে কোনদিন অমন কথা বলেননি। উসমান (রা)-এর মনোভাব আজ যে একেবারেই ভিন্ন। তাই ব্যবসায়ীদের একজন উসমান (রা)-কে জিজ্ঞেস করল, ‘মালামালের কী দাম চান আপনি?’ হজরত উসমান (রা) হেসে বললেন, ‘একজন দশগুণ দাম বলেছেন। আপনারা যদি তার চেয়ে বেশি দাম দিতে পারেন, তা হলেই আমি এসব পণ্য বিক্রি করতে পারি।’

ব্যবসায়ীরা একথা শুনে হতবাক হয়ে গেল। তারা পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। তাদের প্রশ্ন, কে সেই সওদাগর? কে পণ্যসামগ্রীর দশগুণ দাম বলল? অথচ এখানে এমনতো কেউ নেই, যে দশগুণ দাম বলতে পারে? তারা হজরত উসমান (রা)-এর কাছে ব্যবসায়ীর নাম জানতে চাইল। উসমান (রা) এবার মুখ খুললেন। তিনি বললেন, ‘তিনি সেই মহান ও দয়াবান আল্লাহ, যিনি আমার সওদার জন্য দশগুণ বদলা দেয়ার ওয়াদা করেছেন।’

একথা শুনে ব্যবসায়ীরা সবাই চুপ হয়ে গেল। তারা কোনো কথাই আর বলতে পারল না। সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। হজরত উসমান (রা) ব্যবসায়ীদের অবস্থা দেখে আশ্চর্য হলেন। তিনি হেসে দিয়ে বললেন, ‘জানি আপনারা আল্ল¬াহর দামের চেয়ে বেশি কিছু দিতে পারবেন না। তা হলে ঠিক আছে, আমি আল্ল¬াহকেই সবকিছু বুঝিয়ে দিচ্ছি।’ এরপর হজরত উসমান (রা) উটের পিঠে বোঝাই করা সকল পণ্যসামগ্রী মদিনার গরিব-দুঃখী মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিলেন। দানবীর উসমান (রা)-এর এ কাজ দেখে সওদাগররা খুবই লজ্জা পেল। তারা সবাই খালি হাতে ফিরে গেল।

এদিকে মদিনার ঘরে ঘরে নেমে এলো খুশির বন্যা। অজস্র অসহায় মানুষের মুখে মুখে হাসি ফুটল। অবুঝ শিশুরা মায়ের কোলে আনন্দে মেতে উঠল। মদিনার সর্বত্র ঘুচে গেল খাবারের তীব্র সঙ্কট। তাই লোকেরা দু’হাত তুলে হজরত উসমান (রা)-এর জন্য দুআ করল।