খাতুনে জান্নাত কণা

রুবীর কথা শুনলে মনে হয়, বাংলাদেশের বাইরে যারা গেছে, সবাই খুব ভাগ্যবান। এত চমৎকার নির্ঝঞ্ঝাট জীবন-যাপন! ছেলে সাদমানকে অষ্ট্রেলিয়া পাঠানোর ব্যাপারে তাহলে চিন্তা-ভাবনা করা যেতে পারে। তবে, হুটহাট সিদ্ধান্ত না নিয়ে, আরো একটু খোঁজ খবর নেয়া দরকার। বান্ধবী রুবী সারাজীবন একটু বাড়িয়ে বলায় অভ্যস্ত। খালাতো বোন ইয়াসমিনের মেয়ে তো অষ্ট্রেলিয়ায় পড়তে গেছে। ওর সাথে কথা বলা যেতে পারে। ইয়াসমিন সাংস্কৃতিক জগতের মানুষ। অভিনয়, আবৃত্তি ইত্যাদি নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকলেও, ওর অবসর সময়ে খাদিজাকে দেখা করতে বলল।

: খাদিজা আপা, তোমার হঠাৎ আমার কথা মনে হলো দেখি? ডেকে বাসায় আনতে পারি না। অথচ, আজ নিজেই সময় নিয়ে এসে হাজির হয়েছো। বলো, কি খাবে? আমি কিন্তু চমৎকার কাবাব বানাতে পারি। বিকেলের নাশতায় নান রুটি দিয়ে খেতে খেতে গল্প করা যাবে।

: আমাদের সুপ্তি কেমন আছে রে ? তোরা লেখাপড়ার জন্য মেয়েটাকে অষ্ট্রেলিয়া পাঠিয়ে দিলি। এখন বাসাটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে।

: এখন তো আফসোস হচ্ছে, কেন ওকে এত দূর দেশে পাঠালাম। আহ্লাদ দিয়ে বড় করেছি। সেই মেয়ে রেষ্টুরেন্টে পার্ট টাইম জব করে নিজের পড়াশোনার খরচ সাশ্রয়ের চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমাদের পাঠানো টাকায় এখন পুরো খরচ চালাতে নাকি বাধো বাধো লাগে।

ইয়াসমিন কথা বলতে বলতে বিকেলের নাশতার আয়োজন করে ফেলল। গুঁছিয়ে নিয়ে পরিবেশন করতে করতে বলতে থাকল,

: সুপ্তির বাবার ব্যবসা-পাতি মোটামুটি ভালো চললেও, দেশের বাইরে বাচ্চাদের এভাবে লেখাপড়া করানো চাট্টিখানি কথা না আপা। দিনে দিনে অনেক কিছু বুঝতে পারছি। নিজেদের অনেক বেশি কাছের, পরিচিত মানুষেরা আশেপাশে থাকে বলে মেয়েকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ওখানে যে রেসিজম নেই তা কিন্তু না। এশীয় দেশগুলো থেকে যাওয়া মানুষদের, ছেলে- মেয়েদের, ওরা খুব একটা গুরুত্ব দিতে চায় না। স্থানীয় কিশোর আর তরুণ বয়সীদের মধ্যে কেউ কেউ খুব উগ্র। একটুতেই মারামারি করে। ছুরি আর পিস্তল দিয়ে খুন খারাবি করা ওদের জন্য কোন ব্যাপারই না। আজেবাজে জিনিস খেলে, ড্রিংক করলে কোনো হুঁশ থাকে? বলো? তাইতো আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে যাওয়া ছেলে-মেয়েরা, নির্দিষ্ট একটা এলাকায় কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। এমনিতেই শান্তিপূর্ণ দেশ। কিন্তু, মানুষের মনের ভেতরে থাকা বর্ণবাদী আচরণ প্রকাশ পেলে সরকার কি করবে বলো? ওদের নাগরিকদের অনেক কিছুতেই ছাড় পাওয়ার সুযোগ আছে। তাই মাঝে মধ্যে খুব টেনশানে থাকি আপা।

: আল্লাহ ভরসা। সুপ্তি অনেক বুদ্ধিমতী মেয়ে। সব ঠিকমতোই হবে ইনশাআল্লাহ। কাবাবগুলো সত্যিই খুব মজা হয়েছে ইয়াসমিন।

সেদিন ইয়াসমিনের সাথে কথা বলে খাদিজা বুঝতে পারলো, বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করা এত পানির মতো সহজ বিষয় নয়। ছেলে-মেয়েরা মোটামুটি নিজের দায়িত্ব বুঝে চলার মতো উপযুক্ত হলেই কেবল তাদের একা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। অবশ্য দেশেও বৈরী পরিবেশের অভাব নেই। বর্ণবাদী লোকজন চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছেলে সেদিন এসে ওর এক প্রতিবেশী জুনিয়র ছেলেকে নিয়ে নালিস করছিল,

: আম্মু , অয়ন একটা রেসিস্ট। আমাকে কী বলে জানো? বলে, তুমি তো অনেক কালো। আমি কালো মনুষদের ঘৃণা করি।

: কিন্তু সাদমান, ওতো তোমাকে অনেক পছন্দ করে বলেই জানি। কেন এ কথা বলেছে?

: আমার চেজ বোর্ড নিয়ে দুষ্টুমি করছিল। আমি বাধা দেয়াতে এ কথা বলেছে। ওকে ডেকে আনছি দাঁড়াও। ও সরি না বললে আমি ওর সাথে মিশবো না।

অয়ন এসে সরি বলল। ক্ষমা চাওয়ার সময় বলল,

: আমি এটা আসলে তোমাকে রাগানোর জন্য বলেছিলাম ভাইয়া। মন থেকে বলিনি। রাগ করো না ।

: গায়ের রঙ, চেহারা এসব আল্লাহর দান। তাই, এসব নিয়ে কাউকে কিছু বলা ঠিক না বাবা। আমরা চাইলেই কি নিজের উচ্চতা, রঙ, সৌন্দর্য পরিবর্তন করতে পারবো? বলো? পারবো না। তবে, নিজেদের ব্যবহার, আচরণের সৌন্দর্য বদলানো যায়। এটা চর্চ্চার বিষয়। প্রায় দেড় হাজার বছর হতে চলল বেলাল (রা:) দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। কিন্তু, মুসলিম জাহানের সমস্ত মানুষ তাঁকে কত শ্রদ্ধা আর সম্মান নিয়ে এখনও স্মরণ করে। তিনি তো অনেক কালো ছিলেন। প্রথম জীবনে গোলাম হিসেবে তাঁকে একজনের অধীনে থাকতে হয়েছিল। এসব কোনো কিছুই তাঁর মর্যাদা আর সম্মানের পথে বাধা সৃষ্টি করেনি। অথচ, আবু লাহাব নাকি দেখতে খুব ফর্সা আর সুন্দর ছিল। তার বংশ মর্যাদা আর অনেক সম্পদও ছিল। কিন্তু, আল্লাহ নিজেই তার ধ্বংস চেয়েছেন। আল্লাহ মাফ করুন। তাহলে, তোমরাই বলো, এই বাইরের সৌন্দর্য দিয়ে কি হবে? যদি আমাদের আচরণ ভালো না হয়?

: ঠিক বলেছেন আন্টি। আর কখনো আমার এমন ভুল হবে না। উত্তর পাড়ার কৌশিক তো অনেক সুন্দর দেখতে। ওর বাবা-মায়েরও অনেক টাকা-পয়সা, জায়গা-জমি আছে। কিন্তু, কালো ন্যালসন ম্যান্ডেলা, ব্রাজিলের ফুটবলার পেলে, ফ্রান্সের এমপবাপ্পে, পল পগবার মতো তো বিখ্যাত হয়ে উঠতে পারেনি। এমন অনেক প্রতিভাবান মানুষ আছে। যাদের গায়ের রঙ কালো। কিন্তু, তাকে সারা দুনিয়ার মানুষ চেনে। ভালোবাসে।

: এবার তাহলে বুঝতে পেরেছো?

: জ্বী আন্টি। আর কখনো দুষ্টুমি করেও এমন কথা বলবো না।

খাদিজা মনে মনে ভাবে, ছেলেটা কত সহজে তার ভুল বুঝতে পেরেছে! অথচ, ওর নিজের পরিবারেই, গায়ের রঙ কালো হওয়ার কারণে, ভাই- বোন এমনকি বাবাও তাকে কম আদর করেছে। শুধু মা তাকে আদর ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখতো। শিখিয়ে দিত, “কেউ যদি তোমাকে কালো বলে, তখন উত্তরে বলবে, নদীর পানি ঘোলাও ভালো, জাতের মেয়ে কালোও ভালো।” যারা নিজেদের গায়ের রঙ নিয়ে, নিজের সৌন্দর্য নিয়ে অনেক অহংকার করতো, তাদের দাম্পত্য জীবন কাছে থেকে দেখে বুঝেছে খাদিজা। কেউ স্বামীর অতি প্রশ্রয়ে নিজের বিলাসিতার জীবন কাটাতে গিয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে গেছে। কেউ কেউ, তাদের অতি আত্মবিশ্বাসকে ভেঙে টুকরো টুকরো হতে দেখে মানসিক অশান্তিতে ভুগছে। কারণ, নিজের মা-বাবা, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের কাছে আদরণীয় হলেই, শ্বশুরবাড়িতে মেয়েটি একইরকম ব্যবহার পাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশে এখনও, অধিকাংশ শ্বশুরবাড়িতে মেয়েদের মূল্যায়ন সেভাবে হয় না। তাই, নিজেদের মেধা আর সৌন্দর্য নিয়ে অহমিকায় থাকা মেয়েগুলোকে খাদিজা, কিছুটা হতাশায় ভুগতে দেখেছে। বাস্তবতা আসলেই কঠিন। মজার ব্যাপার হলো, খাদিজার গায়ের রঙ বড় হয়ে উঠার সাথে সাথে কিছুটা বাদামি হয়ে গেছে। ওর শ্বশুরবাড়ির বেশিরভাগ লোকজনের গায়ের রঙই কালো। তাই, এ ব্যাপারে খাদিজাকে কখনও কিছু শুনতে হয় না। সত্যি! সময় কখন কাকে কোথায় নিয়ে যায়, কেউ বলতে পারে না।