শাহীন সুলতানা

গ্রীষ্মকাল আসতে না আসতেই প্রচণ্ড খরা শুরু হয়েছে। চারপাশে গরম হাওয়ার ঝাপটা। একটু পরপরই পিপাসা লাগে। সেজন্য মা প্রতিদিন তুলতুলের স্কুল-ব্যাগে দুটো করে পানির বোতল দিয়ে দেন, যাতে তার সোনামণিটার কষ্ট না হয়।

সেদিন বৃহস্পতিবার। স্কুলে এসে ভীষণ তেষ্টা পেল তুলতুলের।

অল্প সময়ের মধ্যে পানির বোতল দুটোই শেষ হয়ে গেল। যত পানি পান করছিল ততই পিপাসা বেড়ে যেতে লাগল। তার বন্ধুদের অবস্থাও প্রায় একই। এত তীব্র পিপাসা আগে তারা কখনো অনুভব করেনি।

প্রচণ্ড গরমের কারণে স্কুল ছুটি হলো তাড়াতাড়ি। বাড়িতে এসে তুলতুল দেখল- পেছনের বারান্দায় একটা ছোট্ট চড়ুই মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। তুলতুল তাড়াতাড়ি মাকে ডাকল। মা দ্রুত এসে ছানাটিকে ধরতেই সেটি দুর্বলভাবে উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। চাপা স্বরে কিচিরমিচির করে ডাকছিল।

মা বললেন- ছানাটির হয়তো প্রচণ্ড গরম লেগেছে। একটু সেবা দিতে হবে। তুলতুল দৌড়ে গিয়ে একটি বাটিতে পানি আর কিছু আধভাঙা চাল এনে দিল মায়ের কাছে। মা ছানাটির মুখে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি দিলেন। তারপর একটু ঠোঁট ফাঁক করে তুলতুলকে বললেন সামান্য চাল মুখে দিয়ে দিতে।

তুলতুল খুব যত্ন করে ছানাটির মুখে কয়েকবার চাল তুলে দিল ও পানি খাওয়াল। বিকেলের দিকে ছানাটি একটু একটু করে ডানা ঝাপটাতে চেষ্টা করল কিন্তু বারবারই ব্যর্থ হল।

মা বললেন- হয়তো মা পাখিটা খাবারের খোঁজে উড়ে দূরে কোথাও গিয়েছে। তাই সময়মতো ছানাটিকে খাওয়াতে পারেনি। ফলে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাছাড়া খরায় পশুপাখিদেরও কষ্ট হয়। ওরাও আমাদের মতো তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে এবং অসুস্থ হয়ে পড়ে।

মায়ের কথা শুনে তুলতুলের মনটা খারাপ হয়ে গেল। সারা বিকাল তুলতুল ছানাটিকে সেবা করল। বারবার পানি খাওয়াল। মুখে খাবার গুঁজে দিল। সন্ধ্যার দিকে একটি মা পাখি বেলকনির পাশে কাঁঠাল গাছে বসে বারবার কিচিরমিচির করে ডাকছিল আর ছানাটি মাথা উঁচু করে ডানা ঝাপটে কিছু বলার চেষ্টা করছিল। তুলতুল বুঝতে পারল- এটাই মা পাখি। ছানাকে বাসায় না পেয়ে খুঁজতে এসেছে। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল ছানাটি ফুড়ুৎ করে উড়ে মায়ের পাশে গিয়ে মায়ের সাথে গান গাইছে। এ দৃশ্যে তুলতুলের মন খুশিতে ভরে গেল।

পরদিন ভোরবেলা মায়ের সাথে ছাদবাগানে পানি দেওয়ার সময় একটা আলাদা গামলায় পানি ভরে রাখল তুলতুল। কয়েকটি খালি দইয়ের হাঁড়ি ও ছোট পাত্রেও পানি রাখল তারা, যাতে পাখিরা উড়ে এসে পানি খেয়ে পিপাসা মেটাতে পারে।

পরদিন শুক্রবার ছুটির দিন। তুলতুল ছাতা নিয়ে মাঝে মাঝে ছাদে যাচ্ছিল কোনো পাখি এলো কি না তা দেখার জন্য। দুপুরে কড়া রোদ পড়তেই দেখা গেল পাখিদের আনাগোনা। শালিক, টুনটুনি, ঘুঘু ও চড়ুই প্রাণ ভরে পানি খেয়ে উড়ে যাচ্ছে আমগাছের ডালে।

আনন্দে চিরিকচিরিক করে লাফালাফি করছে ওরা। কোনোটা গামলার কার্নিশে বসে গোসল করছে। কোনোটা কিচিরমিচির করে গান গাইছে। এমন চমৎকার দৃশ্য তুলতুল আগে কখনো দেখেনি। মন তাই আনন্দে নেচে উঠল। একটু পরে কয়েকটি ঘুঘু এসে গামলা থেকে চৈচৈ করে পানি খেতে লাগল। তুলতুল ভাবল- প্রতিদিন যদি এভাবে পানি আর মায়ের বেঁচে যাওয়া খাবার ছাদে রেখে দেওয়া যায় তাহলে গরমে পাখিদের আর কষ্ট হবে না। ওরাও খুশি হবে। যেই কথা, সেই কাজ।

সারা বৈশাখ আর জ্যৈষ্ঠ মাসজুড়ে তুলতুল ছাদে পাখিদের জন্য পানি রাখল। পাখিরা সারাদিন আসে আর মনের আনন্দে পানি খেয়ে গান গায়।

দু’মাস পর যখন বর্ষা নামলো তখন দেখা গেল তুলতুলের এই ছাদ আর ছাদবাগান হয়ে উঠেছে পাখিদের অভয়ারণ্য, আর তুলতুল হয়ে উঠেছে ওদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।