জোবায়ের রাজু
জাহিদা বেগম যখন হার্ট অ্যাটাকে মারা যান, দুই পুত্র জয় আর উদয়কে নিয়ে ওহাব সাহেব দারুণ বিপাকে পড়েন। হাইস্কুলে অধ্যয়নরত দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ কিভাবে এগিয়ে যাবে মাকে ছাড়া, এই নিয়ে দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। তাই সৃষ্টিকর্তা যেহেতু সবকিছুর উত্তম পরিকল্পনাকারী, এজন্য ওহাব সাহেবের ভাঙা সংসারের ভবিষ্যতের চাকাটা আরেক দিকে ঘুরে গেল।দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে মাসুমা বেগম এলেন তার সংসারে। অকাল বিধবা মাসুমা বেগম দ্বিতীয় স্বামীর সংসারে এসে স্বস্তির দম ফেললেন। কারণ ওহাব সাহেব ধনী মানুষ। এখানে তিনি বাকিটা জীবন আয়েসে কাটানোর দিবা স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি তার একমাত্র পুত্র টুটুলেরও অনাগত ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করার সুযোগ পাবেন। যদিও এখানে বিয়ের সময় টুটুলের ভবিষ্যতের পথ ওহাব সাহেব সুগম করে দেবেন, এমন কোনো চুক্তি হয়নি। যেহেতু স্বামী তার প্রভাবশালী। অতএব একদিন না একদিন টুটুলের জন্য তিনিও সদয় হবেন। এমনই বাসনা জন্মে যায় মাসুমা বেগমের মনে।
মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের দিন টুটুল ঘরের কোণে বসে চুপি চুপি কেঁদেছে। বয়স তখন তার মাত্র তেরো। ছিনতাইকারীর হাতে বাবার মৃত্যুর সে ঘটনা টুটুলের ছোট্ট হৃদয়ে যন্ত্রণার প্রভাব ফেলেছে। মায়ের বুক ছিল তার শেষ আশ্রয়। সেই আশ্রয়টাকেও অন্যজনে নিয়ে গেল।
মায়ের দ্বিতীয় সংসারে যাতায়াত ছিল টুটুলের। কি অপরূপ বাড়ি। ভীষণ বড়লোকের সঙ্গে মায়ের বিয়ে হয়েছে। কত সুখে যে দিন কাটছে মায়ের। সেই সাথে নতুন দুই পুত্রও পেয়ে গেলেন মা। জয় আর উদয়। ওদেরকে আদর করতে দেখলে বুকটা কেমন জানি জ্বলে ওঠে। জয় আর উদয় টুটুলকে বন্ধু বানিয়ে ফেলল। ফলে মাকে যে আরেকজনে তার কাছ থেকে কেড়ে নিল, সেই বেদনা লাঘব হতে থাকে টুটুলের।
প্রতিমাসে দুই একবার মামার বাড়ি থেকে মায়ের দ্বিতীয় সংসারে চলে আসে টুটুল। এখানকার দামি দামি স্বাস্থ্যকর খাবারগুলোর প্রতি যথেষ্ট রুচি তার মুখে। ঝাড়বাতি ঝুলানো কি ঝলমলে ঘর। ঘরভর্তি দামি দামি আসবাব। লাখ টাকার সোফার ফোমে বসে টুটুল যখন নাচানাচি করে, আনন্দে তখন তার মরে যেতে ইচ্ছে করে। মা হাতে তুলে এনে দেন এক গেলাস মিষ্টি শরবত। এমন মিষ্টি শরবত সে জীবনে আর কোনদিন খায়নি। মা বলল এই শরবত জয়ের চাচা জার্মান থেকে পাঠিয়েছেন।
সুখের এই সংসারে একদিন মাকে কাঁদতে দেখে টুটুল অবাক। কান্নার রহস্য উদঘাটনে টুটুল গবেষণা করতে চেষ্টা করে। বারবার প্রশ্ন করে, ‘কাঁদছো কেন?’ মাসুমা বেগম সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চুপিচুপি বললেন, ‘তুই এখান থেকে এখনই চলে যা। আর আসিস না কোনদিন।’ কন তাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে! অনেক প্রশ্ন করেছে মাকে, জবাব পায়নি টুটুল। বিকেলের মলিন আলো গায়ে মেখে মামার বাড়ি ফিরে আসে সে। কোথায় আর যাবে! এখানেই যে তাকে আসতেই হয়। স্বল্প আয়ের চাকরিজীবী মামা কখনো এতিম টুটুলের প্রতি অমানবিক হন না।
রাতে মামী বললেন, ‘তুই ওই বাড়িতে জীবনে আর কোনদিন যাবি না। ওহাব সাহেব চান না তুই সেখানে যাস। উনার সন্তানদের সঙ্গে তোর মেলামেশাও উনি সহ্য করেন না। তোর মা প্রতিবাদ করতে গেলে ঝগড়া বাড়ে।’
মামীর কথায় আকাশ থেকে পড়ে টুটুল। ভিতরে ভিতরে এসব কাহিনী! বুক ভেঙে গেল টুটুলের। পৃথিবীকে বড় নিষ্ঠুর মনে হল। কেউ যেন আপন নয়। গম্ভীর প্রকৃতির ওহাব সাহেব টুটুলের ব্যাপারে এত হৃদয়হীন! চোখ যেন ঝাপসা হয়ে এল টুটুলের। সাথে সাথে পণ করে, জীবনে আর কোনদিন ওখানে যাবে না। টুটুলকে চুপ থাকতে দেখে মামী বললেন, ‘ওহাব সাহেবের ধারণা তুই বড় হয়ে তার সম্পত্তির ভাগ চাইবি। কিন্তু তিনি তার সম্পত্তির ভাগ সন্তানদের ছাড়া আর কাউকে দিবেন না। তাই আপাকে বললেন তুই যেন ওই বাড়ির পথ ভুলে যাস। তোর উচিত আপার সুখের জন্য ওহাব সাহেবের এমন হুকুম মেনে চলা।’
টুটুলের চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে। তারপর থেকে সে আর কোনদিন ওই বাড়িতে যায়নি। মাসুমা বেগম কয়েক মাস পর পর এখানে এলে টুটুল মাকে পেত আর জড়িয়ে ধরে কাঁদত। অসহায়ের মত মাসুমা বেগম পুত্রকে বলতেন, ‘আমি ওখানে সুখে আছি হয়তো, কিন্তু তোর জন্য আমার মন পোড়ে। ভদ্রলোক চান না তুই সেখানে যাস। মনে কষ্ট রাখিস না বাবা।’ মায়ের প্রলাপ শুনে জবাব দিতে পারে না টুটুল। দুনিয়াতে কখনো কখনো মানুষ কত কথা বলতে চাওয়ার পরেও বোবা হয়ে যায়।
২.
জীবনের রং বদলেছে আজ এত বছরে। সময় তো অনেকখানি পার হল। বড় হয়ে চাকরি করে টুটুল। প্রথম মাসের বেতন হাতে পেয়ে সে যখন মায়ের জন্য একখানা শাড়ি কেনার বাসনা করে, তার কিছুক্ষণ পর এল সেই খারাপ সংবাদ। মাসুমা বেগম মারা গেছেন। ডাক্তার জানান হার্ট অ্যাটাকে এই মৃত্যু।
তারপরের গল্পগুলো চলল নীরবে। বহু বছর পর ওহাব সাহেবের বাড়ি গিয়ে নিথর মাকে দেখে হাঁউমাঁউ করে টুটুল যখন কেঁদে বুক ভাসাল, ওহাব সাহেব তখন উঠোনের জামরুল তলায় চেয়ার পেতে বসে ছিলেন। মুখটা তার মলিন। জয় বন্ধুদের সঙ্গে ট্যুরে গেছে দূরের নেপালে৷ উদয় ইতিমধ্যে যাত্রাপালার এক মেয়েকে বিয়ে করে আলাদা সংসার করছে। মায়ের সমাধি পাশে নিরব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা টুটুলের কাঁধে হাত রেখে ওহাব সাহেব বললেন, ‘ঘরে এসো।’ টুটুল চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন ওহাব সাহেবকে জড়িয়ে ধরে। এই মানুষটা তাকে এই পরিবারের না চাইলেও তার মাকে তো সংসার জীবনে সুখের প্রহর দিয়েছেন। অতএব কোনো অভিযোগ রাখা যাবে না এই মানুষটার প্রতি।
৩.
জীবন চলছে জীবনের নিয়মে। মাকে হারানো, চাকরিতে পদোন্নতি, তামান্নাকে নিয়ে সংসার, দাম্পত্য জীবনের এক বছরের মাথায় সংসারে নতুন অতিথি আসার সুখবর, সবকিছু সঙ্গে নিয়ে চলমান টুটুলের জীবন যেন পূর্ণতায় ভরা। কিন্তু শূন্যতা তার একটাই, মাকে এক জীবনে আর কোনদিন পাবে না চাইলেও।
সন্ধ্যাবেলা। অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় রাস্তার পাশে একজন অসহায় লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে টুটুল তার পাশে এসে দেখে তিনি ওহাব সাহেব। জ্বরে তার গা পুড়ে যাচ্ছে। বেশভুষা দেখে মনে হচ্ছে শারীরিক সেবা যত্নের অভাবে ভুগছেন।
‘আপনি এখানে একা একা কি করছেন?’ টুটুলের এমন প্রশ্নের জবাবে ওহাব সাহেব বললেন, ‘আমার একদিন সব ছিল। এখন আমি রিক্ত। স্ত্রীর মৃত্যুর পর আমার সন্তান আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। নেশাগ্রস্ত ছেলে আমার বিপথে নেমে যন্ত্রণার আগুনে ফেলে দিল আমাকে। এখন পথই আমার ঠিকানা।’
টুটুলের মনে পড়ল তার অতীতকে, যে সম্পত্তির গৌরবে একদিন তিনি তাকে জয় এবং উভয়ের সঙ্গে মিশতে দেননি। আর ভুল ধারণা ছিল বড় হয়ে টুটুল তার সম্পত্তির ভাগ চাইবে। কিন্তু নিয়তি আজ তাকে তার সম্পত্তি থেকে বিতাড়িত করে পথে নামিয়ে দিয়েছে। আন্দোলিত হতে ইচ্ছে হলো টুটুলের, কিন্তু সে আন্দোলিত মনের ক্ষোভ প্রকাশ করবে না। এই মানুষটা তার মাকে তো অন্তত মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একটা সুনিশ্চিত জীবন দিয়েছেন।
আপনি চাইলে এখন থেকে আমার কাছে থাকতে পারেন। আমি আপনাকে বাকিটা জীবন আমার কাছে রেখে দিতে রাজি।’ অচেনা এই ছেলেটার এমন উদারতা দেখে ওহাব সাহেব বললেন, ‘তুমি কে বাবা? অচেনা আমাকে এত দরদ দেখাচ্ছ। আর তোমার গলাটা এত পরিচিত লাগছে। কে তুমি?’
টুটুল বলতে চেয়েও বলতে পারেনি যে আমি আপনার জমিনের একখণ্ড অতীত নামের আগাছা, যাকে আপনি নিষ্ঠুরের মতো দমন করেছেন। যদি জানতেন একদিন সন্তানেরা আপনাকে এরকম একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ দেবে, তবে সেদিন আমাকে আর আমার মাকে মানসিক কষ্ট দিয়ে নিজেকে নিকৃষ্ট প্রমাণ করতেন না।
মনে মনে টুটুল এসব ভাবছে আর ওহাব সাহেবের বিষণ্ন দুটি চোখ টুটুলের দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটাকে এত চেনা লাগছে, কিন্তু তিনি ঠিক চিনতে পারছেন না। স্মৃতিশক্তি আজকাল ভীষণ কমে যাচ্ছে তার।