পৃথিবীর আলো-বাতাসের সাথে প্রথম মুখোমুখি হয়েছিলাম জয়পুরহাট সদর উপজেলা ‘কেন্দুলী’ গ্রামের নানা বাড়ীতে; ১৯৭১ সালের ১ মার্চ আমার নানা; প্রখ্যাত বাগ্মী মরহুম মাওলানা ফজের আলীর ছোট্ট ঘরে। সেখানেই আমার নাড়ী পোতা আছে। যে ঘরে ভুমিষ্ঠ হয়েছিলাম সে ঘরে এখনো বসবাস করেন আমার মামা নজরুল ইসলাম আজাদ। পৈত্রিক ভিটা সদর উপজেলার পূর্ব সুন্দরপুর গ্রামে।
নানাবাড়ি হলেও আমার শৈবব-কৈশোরের একটা উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে কেন্দুলীতে। ছোট মেয়ে হওয়ায় মা নানার কাছে খুবই প্রিয় ছিলেন। যদিও সব বাবার কাছেই মেয়েরা রাজকন্যা। আমি বেশ ঘনঘনই মা’র সাথে নানা বাড়িতে যেতাম। এতো বেশি যাওয়া হতো যে, সে গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন পড়াশোনাও করতে হয়েছিলো আমাকে।
যাহোক কেন্দুলী গ্রামের আলো-বাতাসেই আমি বেড়ে উঠেছি এবং নিজেকে পরিপুষ্টও করেছি। মামা-মামীদের কাছে আদর-যত্নের প্রাপ্তিটাও ছিলো বেশ সমৃদ্ধ। বিশেষ করে গান্ধী মামী আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। গান্ধী মামী ছিলেন আমার মা’র জেঠাতো ভাইয়ের স্ত্রী। মামার নাম মুজিবুর রহমান মোল্লা। ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী আর বাংলাদেশের মরহুম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সখ্যতার বিবেচনায় স্থানীয় রসিক শ্রেণির মানুষ মামীকে রহস্য করে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী হিসাবে সম্বোধন করতেন। যার যার সম্পর্কের সাথে ‘গান্ধী’ যোগ করে সম্বোধন করা হতো তাকে। আমি বলতাম গান্ধী মামী; মা বলতেন গান্ধী ভাবী। এমন অভিনব সম্বোধনে তাকে কখনো বিরক্ত, বিব্রত বা উষ্মা প্রকাশ করতে দেখিনি বরং তিনি তা স্বাভাবিকভাবে মেনেই নিয়েছিলেন। এভাবেই তার পিতৃপ্রদত্ত নাম চাপা পড়েছিলো। বছর দুই আগে মা’র কাছে জানতে চেয়েছিলাম মামীর প্রকৃত নাম। মা হেসে ওঠে জবাব দিয়েছিলেন ‘আসমা খাতুন’। তার কোলপিঠের স্পর্শ ও সান্নিধ্য আজও আমাকে আন্দোলিত, পুলকিত ও কৃতার্থ করে।
মামাতো ভাইবোন সহ সমবয়সী প্রতিবেশীদের সাথে বন্ধুত্ব ও সখ্যতা ছিলো উল্লেখ করার মত। আমার ঘনিষ্ঠ খেলার সাথী ছিলো বড় মামার মেঝো মেয়ে মেহের নিগার। আমার চেয়ে ৮ মাসের ছোট। এখন ভালো চাকরি, প্রকৌশলী স্বামী; শিক্ষাদিক্ষা, উন্নত জীবন ও পেশা, সামাজিক মর্যাদা, অর্থবিত্তে সে এখন আমার চেয়ে অনেক এগিয়ে। এক ছেলে ব্যুরোক্রেসীতে আছে বলে খোঁজ নিয়ে জেনেছি। যেহেতু তার সাথে আমার সম্পর্ক কৃত্রিম নয়; নয় লাগানো, বানানো আত্মীয়তাও বরং রয়েছে রক্তের এক পবিত্র বন্ধন। তাই দূর থেকে হলেও তার খোঁজ-খবর নেওয়ার সাধ্যমত চেষ্টা করি। অতীতের স্মৃতি রমন্থনে অনুভব করি। দেখা-স্বাক্ষাৎ নেই প্রায় ৩ দশক। তবে আশির্বাদ ও শুভকামনা থাকে সব সময়। আমি পেশা, কর্মে, সামাজিক মর্যাদায় ও শিক্ষায় কারো গৌরবের অনুসঙ্গ না হলেও আমার রক্তধারার সকলেই আমার জন্য অহংকার ও গৌরবের; যদিও সে হয় একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের।
আগেই উল্লেখ করেছি যে, কেন্দুলী গ্রামে আমার সমৃদ্ধ শৈশব-কৈশোর কেটেছে। মহাকবি জয়দেব গোস্বামীর জন্ম এ গ্রামেই বলে জনশ্রুতি রয়েছে। যদিও এ নিয়ে রয়েছে মতান্তর। একটি সূত্র এবং স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে যে, মহাকবি জয়দেবের দ্বাদশ শতকে জন্ম হয়েছিলো জয়পুরহাট জেলার সদর উপজেলার কেন্দুলী গ্রামে। তিনি ছিলেন সংস্কৃত সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং রাজা লক্ষèণসেনের সভাকবি। তবে আরেকটি সূত্রমতে, তিনি ভারতের পশ্চিম বঙ্গের বীরভূম জেলার কেন্দুবিল্ব (কেঁদুলী/কেন্দুলী) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার অমর সৃষ্টি ‘গীতগোবিন্দম্’, যা রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা অবলম্বনে রচিত বারো সর্গের একটি ভক্তি প্রধান কাব্য। যাহোক স্থানীয়রা মনে করেন মহাকবি জয়দেবের জন্ম হয়েছিলো জয়পুরহাট সদর উপজেলার কেন্দুলী গ্রামে। তার স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে জয়দেবের পুকুর, ভিটা বা জয়দেবের পাড় আজও রয়েছে। মনে করা হয় যে, এ ভিটা বা পাড়েই জন্ম নিয়েছিলেন মহাকবি জয়দেব। সেখানে রয়েছে আদিবাসী তথা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস।
জয়দেব ভিটায় বসবাসকারীদের আদিবাসী বলা হলেও এরা সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। এরা মূলত, সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা, মহাতো, পাহান, সরেণ ও হেমব্রম বর্ণভূক্ত। এদের নিজস্ব সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম ও ধর্মীয় মূল্যবোধ, নিজস্ব ভাষা ও স্বাতন্ত্র রয়েছে। তারা নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান করে নিজস্ব ভাষায়। অন্যদের সাথে কথা বলে স্থানীয় বাংলায়। তবে তাদের কথার মধ্যে নিজস্ব উচ্চারণ ভঙ্গীমা ও স্বকীয়তা রয়েছে যা স্থানীয় বাংলা ভাষাভাষীর চেয়ে অনেকটাই আলাদা।
শৈশবে কেন্দুলীতে বেশি বেশি যাতায়াতের কারণে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিষয়ে বেশ জানাশোনার সুযোগ হয়েছিলো। সে সময় তারা ছিলো অনগ্রসর জনগোষ্ঠী। মূল ধারার সাথে তাদের তেমন কোন সম্পর্ক ছিলো না। পুরুষদের প্রধান পেশা ছিলো শিকার করা। তারা ধীর, ধনুক, খুন্তি সহ নানাবিধ দেশীয় ও সেকেলে অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে দল বেধে শিকার করতো। ইঁদুর, শেয়াল, বেজি সহ নানাবিধ বনজ ইতর প্রাণী শিকার করেই তাদের জীবন চলতো। নারীরা সাধারণত অন্যের বাড়িতে দিনমজুর হিসাবে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে। তারা পুরুষদের চেয়ে অধিক পরিশ্রমী।
শৈশবে এসব আদিবাসীদের বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। শিশুরা দলবেধে জয়দেব ভিটায় যেতাম তাদের এসব অনুষ্ঠান উপভোগ করার জন্য। বেশ উপভোগ্য ছিলো তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান। বিয়ের দিন বর বা পাত্র ঘরের চালে উঠে আত্মহুতি দেওয়ার হুমকী দিতো। কনে তাকে আশ্বস্ত করতো যে, সে তাকে বিয়ে করলেও নিজেই সে তার ভরণ-পোষণ করবে। আর এভাবেই এ জটিল সমস্যার সমাধান করা হতো; গড়ে উঠতো যুগলজীবন।
আদিবাসীরা প্রায় সময় থাকতো নেশাগ্রস্ত বা মাদকাসক্ত। তাদের বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও নিজস্ব ধারার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মাদকের ব্যবহার ছিলো অবারিত ও অপরিহার্য। এরা নেশাগ্রস্ত ও মাতাল হয়ে অনেক সময় অস্বাভাবিক আচরণও করতো। এক নেশাগ্রস্ত সাঁওতালকে সড়কের বাঁকে ঘাড় দিয়ে ঠেলতে দেখে লোকজন এর কারণ জানতে চাইলে ভাবলেশহীন জবাব ছিলো, ‘ছরকটা (সড়ক) বেঁকা (বাঁকা) হইছে মণ্ডল। ছোজা (সোজা) করা দরকার’। শৈশবের এ স্মৃতি আজও আমার মনে আছে।
আদিবাসী নারীদের পরিচ্ছদ ছিলো বেশ বৈচিত্রপূর্ণ। মেয়েরা হাঁটুর ওপর শাড়ী পড়লেও শরীরের উপরিভাগের বিশেষ অঙ্গ ছাড়া পুরোপুরি উম্মুক্তই থাকতো। আদিবাসী নারীরা বেশ আত্মমর্যাদাশীল। শুনেছি খোঁপা তাদের মূল সম্ভ্রম। কোন পর পুরুষের পক্ষে শরীরের অন্যকোন অংশ স্পর্শে শিথিলতা থাকলেও খোঁপার বিষয়ে তারা খুবই রক্ষণশীল। কারণ, তাদের বিবেচনায় খোঁপা নারীদের মান-মর্যাদা ও আত্মসম্মানের প্রতীক। একবার গৃহস্থ রসিকতা করে এক আদিবাসী তরুণীর খোঁপায় হাত দেওয়ার কারণে তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে শুনেছি।
এরা অন্য সম্প্রদায়ের লোকদের সাথে বেশ ব্যবধান রক্ষা করেই চলতো। খড়া মওসুমে মেয়েরা দলবেধে খোলা মাঠ কী যেন খুঁজতো। এসব মেয়েরা আসলে কী খুঁজতো তা আমার মানসপটে খুব এটা ভেসে না উঠলে আমি তাদেরকে শামুক সংগ্রহ করতে দেখেছি। গর্ত থেকে ইঁদুর ধরতেও দেখার স্মৃতিও আমার রয়েছে। এরা যখন দলবেধে মাঠে কাজ করতো আমি কৌতুহলবসত তাদের আশেপাশে ঘোরাফেরা করতাম। কারণ, শৈশব থেকেই অনুসন্ধিৎসা ছিলো আমার। কিন্তু আমাকে নিয়ে এরা সময় সময় খুনসুটিতে লিপ্ত হলেও কেউ আমাকে ধরার সাহস কখনো করেনি। তবে একদিন এক আদিবাসী কিশোরী আমাকে কোলে নিয়েছিলেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য। ঘটনাটা দৃষ্টি এড়াইনি আমার গান্ধী মামীর। এরপর তিনি আমাকে পুকুরে নিয়ে এমনভাবে ধোলাই করেছিলেন আমার মনে হয়েছিলো যে, তিনি আমাকে মলমূত্রের ভাগার থেকে তুলে এনেছেন। মূলত, মূল ধারার সাথে এসব আদিবাসীদের সম্প্রীতির বন্ধন বেশ মজবুত হলেও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব কাজ করতো।
আমার সাংবাদিকতার তিন দশক হয়ে গেছে বেশ আগেই। যখন শিক্ষকতা করতাম, তখন থেকে আমার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। এ কাজে আমাকে উৎসাহিত ও সার্বিক সহযোগিতা করেছেন জয়পুরহাট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বালিঘাটার সম্পাদক বন্ধুবর দিলদার হোসেন। তিনিও শিক্ষকতা করতেন এবং দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিনিধি ছিলেন। আমি তার পত্রিকায় গল্প ও কবিতা লেখা শুরু করি। তিনি একদিন আলাপচারিতার ফাঁকে আমাকে পরামর্শ দিয়ে বললেন, ‘এসব ছাই-ভস্ম লেখার দিন অনেক আগেই শেষ। কলাম লিখলে আপনি ভালো করবেন বলে আশা করি’। তিনি ঢাকা ও বগুড়ার কিছু দৈনিকের সাথে আমার যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন। শুরুটা আমি তখনই করেছিলাম। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সে লেখালেখির সুবাদেই বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে চাকরি করেছি; বিভিন্ন পদে। টানা দেড় দশক একটি জাতীয় দৈনিকে বিশেষ প্রতিনিধি ছিলাম। লেখাপড়ার সূচনা মাদরাসায়, উচ্চশিক্ষা বাংলায় হলেও এখন পুরোদস্তুর সাংবাদিক; যে বিষয়ে আমার কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই; একেবারে ব-কলম। তবুও সবার সাথে চলছি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এতেই আমি পরিতৃপ্ত ও প্রশান্ত।
গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। গণমাধ্যমকর্মীরা এ স্তম্ভের রক্ষক ও পরিচর্যাকারী। তাই গণমাধ্যম কর্মীদের সততা, দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, অধ্যবসায়, পেশাদারিত্ব, সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা রাষ্ট্রের এ স্তম্ভকে বিকশিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ মহতি পেশা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, একশ্রেণির গণমাধ্যমকর্মী অবক্ষয়ের গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে থাকেন। ফলে তারা বস্তুনিষ্ঠভাবে সাংবাদিকতা করতে পারেন না; হয়ে ওঠেন না পুরোপুরি পেশাদারী। ফলে এ শ্রেণির গণমাধ্যমকর্মীকে কেউ কেউ নানাবিধ অপবিশেষণেও বিশেষিত করেন। কখনো কখনো ‘সাংবাদিক’ শব্দের পরিবর্তে ‘সাংঘাতিক’ শব্দের ব্যবহার করতে দেখা যায়। যে কারণেই হোক, এমন অপবিশেষণ এ মহতি পেশার জন্য মোটেই কাক্সিক্ষত, কাম্য ও স্বস্তিদায়ক নয়।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে নানাবিধ তীর্ষক মন্তব্য শোনা একেবারে অস্বাভাবিক নয়। কারণ, কোন পেশার লোকজনই একেবারে ধোয়া তুলসী পাতা নয়। তাই অনেক সময় অন্যের মানবীয় ভুলত্রুটির কারণে সামষ্ঠিকভাবে আমিও সমালোচিত হয়েছি। তবে একথা গর্বের সাথেই বলতে পারি যে, আমার কারণে কেউ অহেতুক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা অকারণে কারো চরিত্র হনন বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছি অথবা পেশার প্রভাব খাটিয়ে কারোর কাছে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করেছি ব্যক্তিগতভাবে আমার বিরুদ্ধে এমন কোন অভিযোগ এখন পর্যন্ত নেই।
আমি পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখি। আমার অধিকাংশ লেখাই রাজনৈতিক বিশ্লেষণমূলক। নিজের একটা রাজনৈতিক দর্শনও আছে আমার। তাই সতীর্থরা আমার কোন কোন লেখার প্রশংসা, আবার কোন লেখার ভূয়সী প্রশংসা করেন। আবার ভিন্নমতের লোকেরা করেন কঠোর সমালোচনা। এটিই তো স্বাভাবিক। একবার জম্ম-কাশ্মীরের স্বাধীনতার পক্ষে দৈনিক নয়া দিগন্তে একটা কলাম লিখেছিলাম। অনেকের প্রশংসা পেয়েছিলাম এ জন্য। তবে ভারতের দিলীø থেকে এক রাজনীতিক লেখাটার কঠোর সমালোচনা করে উপসংহারে লিখেছিলেন, ‘ মি. কলামিস্ট ! পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন করে দিন, আমরা কাশ্মীর ছেড়ে দেবো’। আমার সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিলো সাপ্তাহিক যায়যায় দিনে খুলনার ‘অসতী দিদি’র চিঠির প্রশ্নত্তোর। এ চিঠির উত্তর প্রকাশের পর লন্ডন থেকে পত্রিকার সম্পাদক জনাব শফিক রহমান ভূয়সী প্রশংসা করে আমাকে টেলিফোন করেছিলেন। যা আমার জন্য প্রেরণার স্মারক হয়ে রয়েছে।
পেশাগত কারণে আমাকে খুব একটা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় নি। তবে একটা ছোট ঘটনা আমার কাছে বেশ স্মরণীয় হয়ে আছে। ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনে কার্ফু চলাকালে ফার্ম গেইটে পুলিশ আমার গাড়ী আটকালে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়েছিলাম। যদিও আমাকে বহনকারী গাড়ীর সামনে ‘প্রেস’ স্টিকার লাগানো ছিলো। অফিসার আমার কথা মেনে নিলেও একজন কন্সটেবল উচ্চস্বরে বললেন, ‘কীসের...সাংবাদিক ! গলায় কোন কার্ডও নেই; কোন ক্যামেরাও তো দেখি না। স্যার, ভূয়া সাংবাদিক। ধইরা লন’। আমার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে কখনো গলায় কার্ড ঝুলিয়েছি বা ক্যামেরা ছুঁয়ে দেখেছি এমনটা কখনো স্মরণ হয় না।
প্রায় ৩ বছর আগের কথা। কয়েক দিনের ছুটিতে গ্রামের বাড়ী জয়পুরহাটের পূর্ব সুন্দরপুর যেতে হয়েছিলো। সেদিন অনেকটা বাধ্য হয়েই রিক্সাভ্যানে উঠেছিলাম। কারণ, আমার ব্যবহার করা বাইকটা সাত-সকালেই নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলো ৩ পুত্রের কনিষ্ঠ জন। আমি বাড়ি গেলে এর ব্যস্ততা বাড়ে। অত্যন্ত চঞ্চল প্রকৃতির। স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘লটখটা। যাহোক ভ্যানে এক কিশোরীর মুখোমুখি বসতে হয়েছিলো আমাকে। লালপেড়ে এক রঙা জমীনের শাড়ী-ব্লাউজ পরিহিত ১২/১৩ বছরের কিশোরী। বেশভূষায় বেশ কেতা দুরস্তই মনে হলো আমার কাছে। সিঁথিতে সিঁদুর দেখে যুগলবন্দীর প্রমাণ মিললেও নারীত্বের পুরোপুরি বিকাশ লক্ষ্য করলাম না।
কৌতুলহল বশ্যতই তার সাথে আমার আলাপচারিতা শুরু হয়েছিলো। জানতে পারলাম তার বাড়ি কেন্দুলী গ্রামে। আদিবাসী (ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী) কিশোরী। কিন্তু তার সাজসজ্জাটা পুরোপুরি আদিবাসীর মতো মনে হলো না। কারণ, শৈশবে দেখেছি আদিবাসী নারীরা শরীরের উপরিভাগের একটা বড় অংশ উম্মুক্তই রাখতো; কোন ব্লাউজের ব্যবহার করতো না। হয়তো দীর্ঘকালের পরিক্রমায় তাদের জীবন ধারায় অনেকটা পরিবর্তন এসেছে; খানিকটা এগিয়েছে শিক্ষা-দিক্ষায়। কৌতুলহলটা আমাকে বেশি বেশি চেপে ধরেছিলো। জানতে চাইলাম বললাম, ‘বান্দে ওঁরাওকে চেনো’। সে সহাস্যে জবাব দিয়ে বললো, ‘উনি আমার দাদু; তার ছেলে সুমন ওঁরাও-এর মেয়ে মৌমিতা ওঁরাও আমি’। তাদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বেশকিছু সময় আলোচনা চললো এ আদিবাসী কিশোরীর সাথে। এক সময় পথে পাঁচালী শেষ হলো। বিদায় বেলা সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কী করেন ? অবলীলায় জবাব দিয়ে বললাম, ‘সাংবাদিকতা করি; থাকি ঢাকায়’।
এবার ওঁরাও দুহিতা গাল ভরে হেসে নিলো কিছুক্ষণ। এরপর কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বললো, ‘ওহ সাংবাদিক! গলায় কার্ড ঝুলিয়ে চাঁদা আদায় যাদের কাজ’!
বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লাম আমি। এ কথার জবাব দেওয়ার শক্তি ও সাহস আমি কোনটাই পেলাম না। চেয়ে রইলাম হাস্যময় ওঁরাও দুহিতার মুখের দিকে!
www.syedmasud.com