মুসফিকা আন্জুম নাবা
জাজিরাতুল আরবের এক ঘোর তমসাচ্ছন্ন যুগে ইসলামের আগমন ঘটেছিলো। ইসলাম অন্ধকারে নিমজ্জিত আরবজাহানসহ বিশ্বকেই আলোকিত করে তুলেছিলো। মূলত, শাশ্বত জীবনবিধান ইসলামের আগমনের মাধ্যমে নতুন ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়; সভ্যতার বিবর্তনে এক নব জাগরণ সৃষ্টি করে। এ ঐতিহাসিক বিপ্লব তথা ইসলামকে কেন্দ্র করেই জ্ঞান-বিজ্ঞানে সূচিত হয়েছে নতুন অধ্যায়ের। সে সময়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে মুসলমানদের অবদানের ইতিহাস খুবই সমৃদ্ধ ও বেশ চমকপদ্র। সে যুগ ইতিহাসে ইসলামের স্বর্ণযুগ বলে পরিচিত। ইসলামি স্বর্ণযুগ অষ্টম শতাব্দী থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত ইসলামের ইতিহাসে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং বেজ্ঞানিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার সময়কালকে বোঝায় যা ৬২২ সালে মদিনায় প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও ইসলামি শক্তির উত্থানের সময় থেকে শুর হয়। উমাইয়াদের পতনের পর আব্বাসীয়রা ক্ষমতায় আসে। আব্বাসীয়রা ক্ষমতায় আসলে দজলা নদীর তীরে বাগদাদ শহরকে কৌশলগত কারণে রাজধানী ঘোষণা করে। এই শহর তৈরীর জন্য খলিফা আবু জাফর আল মনসুর বিশ্বের নানা জায়গা থেকে প্রকৌশলীসহ বিখ্যাত বিখ্যাত স্থাপত্ববিদের মাধ্যমে শহরটি তৈরী করান। মসজিদ, মাদরাসাসহ নান্দনিক সব স্থাপত্যশৈলীর এক অপূর্ব নগরী বাগদাদ তৈরি হয়। বৃত্তাকার এ শহরের উচুঁ দেওয়াল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতো।
সে সময় মুসলমানরা শুধু ধর্মীয় সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না বরং জ্যোর্তিবিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত, জীববিদ্যা, চিকিৎসা, দর্শন ও অর্থনীতিসহ জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল অঙ্গনে তাঁদের একছত্র বিচরণ ছিল। ইসলামের স্বর্ণযুগ উত্থানের পিছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা ছিল পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর। ইসলামের স্বর্ণযুগ যেন তারই প্রতিচ্ছবি। আব্বাসীয় খলিফা হারুন অর রশিদের (৭৮৬-৮০৯) শাসনামলে বাগদাদে বাইতুল হিকমাহর প্রতিষ্ঠার ফলে জ্ঞানচর্চার সুযোগ সৃষ্টি হয়। বায়তুল হিকমা প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। এ যুগে মুসলিম বিশ্বের রাজধানী শহর বাগদাদ, কায়রো ও কর্ডোভা বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, বাণিজ্য ও শিক্ষার রাজধানীতে পরিণত হয়। আরবরা বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী ছিল। হারিয়ে যেতে থাকা অনেক ধ্রপদি রচনা আরবি ও ফারসিতে অনুবাদ হয়। আরও পরে এগুলো তুর্কি, হিব্রু ও ল্যাটিনে অনূদিত হয়েছিল। ইসলামি স্বর্ণযুগে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার উৎকর্ষে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে, বায়তুল হিকমাহ। বায়তুল হিকমা ছিল একাধারে গ্রন্থাগার, শিক্ষায়তন ও অনুবাদ কার্যালয়। যা আবিষ্কার ও গবেষণার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। মুসলিমরা এমন একটি পরিবেশ তেরি করেছিল-যেখানে শুধুমাত্র মুসলিমরাই নয়, সব মতের, সব ধর্মের, সব বিশ্বাসের, সব যুক্তির আলেম, পণ্ডিতরা নিশ্চিন্তে, নিরাপদে ও নির্ভয়ে জ্ঞানচর্চা করেছেন বিনাবাধায় ও নির্বিঘ্নে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উটের পিঠে বোঝাই করে এনে বাইতুল হিকমায় জমা হয়েছিল বিভিন্ন দেশের বই। বাগদাদের খলিফা জাষ্টিনিয়ান এর কাছে বিনীতভাবে লিখেছিলেন প্লেটোর লাইব্রেরীর বইগুলো ধার দেবার জন্য। শুধু বই ধার নেবার জন্য উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন মনি মুক্তার উপহার। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, মুসলিমরা জ্ঞানের প্রতি কতটা অনুরাগী ছিল। বাগদাদকে শান্তির শহর বলা হতো।
চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরীরা যখন বিশ্বজয়ের স্বপ্নে বিভোর। উন্মাদের মতো শত শত জনপদ বিলীন করে দিচ্ছিলেন। তখন মুসলিম উম্মাহর খলিফারা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দে মশগুল। এমনকি সে সময় হজ নিয়েও নোংরা রাজনীতি নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এ দ্বন্দের প্রথম মাসুল দিতে হয়েছিলো খোয়ারিজম সাম্রাজকে। এর নেপথ্যে ছিল বাগদাদের খলিফা আন নাসির। যে কিনা অমুসলিম অসভ্য যাযাবরদের কাছে জোট গড়ার চিঠি দেন। ফলশ্রুতি কী হয়েছিল তা কারও অজানা নয়। সমকন্দ, বুখারার শহরের পতন হয়। লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এভাবে ত্রাসের দুনিয়া কায়েম করতে থাকে চেঙ্গিসের বংশধররা।
এবার মঙ্গোলরা নজর দিলো বাগদাদের দিকে। তখন বাগদাদ সমাজ ব্যবস্থা হাজারো সমস্যায় জর্জরিত। বিশেষ করে আশশরী আর ইসমাইলী মতবাদ, যেকোনো ফতোয়ায় হাজারো মত, এভাবে একাধিক ফেরকায় বাগদাদ শতচ্ছিন। আর রাজ দরবারে কবি, গল্পকথক, ভাঁড়দের বিচরণের পাশাপাশি দরবারি আলেমের অভাব ছিল না। আলেমদের প্রধান কাজই খলিফার মতি বুঝে ফতোয়া দেওয়া কুরআন, হাদিসের ব্যাখ্যা দেয়া, হোক তা মনগড়া। অনেক আগে থেকেই মঙ্গোলরা বাগদাদ খলিফাকে বশ্যতা স্বীকারের কথা বলে আসলেও কখনোই বাগদাদ শাসকগোষ্ঠী গুরুত্ব দিতো না। কিন্তু মোঙ্কি খান এবার খলিফাকে জানালেন অবশ্যই তাকে ব্যশতা স্বীকার করে মঙ্গোল দরবারে আসতে হবে, নাহলে হালাকুকে পাঠিয়ে তোমাদের ধ্বংস করবো বলে খবর পাঠালেন।
খলিফা ভাবলেন কিছু উপহার পাঠিয়ে সমাধান করবেন নিজেকে রক্ষা করবেন। খলিফা রাজনীতি, কূটনীতি কিংবা বহির্বিশ্ব সম্পর্কে তেমন খবর রাখতেন না বরং প্রতিনিধি পাঠিয়ে সমাধান করতেন। সিদ্ধান্তের জন্য তার উজিরে আজম আলকেমীর উপর নির্ভর করতেন। তিনি মূলত হেরেম কিংবা বাহাস শোনা নিয়ে ডুবে থাকতেন। আর এই ফাঁকে প্রাসাদের গুপ্তচর, শিয়া অবস্থান শক্তিশালী হয়ে উঠে। মধ্যপ্রাচ্যে মঙ্গোল সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল ইরাক পর্যন্ত । ইরাকের উত্তরে মসুল আর দক্ষিণে বাগদাদ। খলিফা মঙ্গোলদের নিয়ে তার উজিরে আজমের পরামর্শ চাইলে বলেন আপনার কোনো দুশ্চিন্তার কারণ নেই। বাগদাদ খলিফার শহর তাই, মঙ্গোলরা আক্রমণ চালালে বিশ্বের সকল মুসলিমরা বাগদাদ রক্ষা করতে অগ্রসর হবে। প্রকৃতপক্ষে বাস্তবতা ছিলো উল্টো; কারণ ছিল আইয়ুবি ও সেলজুক রুমের নাজুক অবস্থা। দিল্লি সালনাত থেকে সাহায্য আসার একমাত্র পথও মঙ্গোলদের অধীনে। আলকেমী উদ্দেশ্যই ছিল বাগদাদ মঙ্গোলদের তুলে দিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে শিয়াদের রক্ষা করা।
অবশেষে ১২৫৮ ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে এলো হালাকু খান তার বাহিনী নিয়ে। তার সাথে মঙ্গল, উইঘুর, কিরগিজ, ক্রুসেডার সহ মোট ৩ লাখ সৈন্য ছিলো। এছাড়াও হালাকু খানের সাথে চীনা প্রকৌশলী, উন্নত অস্ত্র, কামান। বিপরীতে খলিফা আল মুতাসিমের শক্ত কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছিলো না। মঙ্গোলরা ক্রমশ অগ্রসর হতে থাকলে, খলিফার দরবার দু’ভাগে বিভক্ত। উজিরে আজম সন্ধি করার পক্ষে আর সেনাপতি ফতেহ উদ্দিন প্রতিরোধ গড়তে চাইলে বিবাদ বেঁধে যায়। পরে উলামাদের লড়াইয়ের পক্ষে মত দিলে, ফতেহ উদ্দিন কয়েক হাজার ভাড়াটে সেন্য নিয়ে যুদ্ধ করেন। সাময়িক ভাবে মঙ্গোল ঠেকিয়ে দিলেও শেষ রক্ষা হয়নি। যে চরের সেন্যরা ঘাটি তৈরী করেছিলেন। মঙ্গোরা একরাতেই পরীখা খনন করে ডুবিয়ে দেন। সেনাপতি ছাড়া কেউ ফেরত আসতে পারেনি। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, আলকেমী কৌশলে এক লাখ সৈন্য থেকে বিশ হাজারে নিয়ে আসে। খলিফা আইয়ুবির কাছে সাহায্য চাইলেও লাভ হয়নি।
২৯ জানুয়ারী হালাকু বাগদাদ অবরোধ শুরু করলেন। তাদের কাছে থাকা উন্নত মানের প্রযুক্তি দিয়ে দেওয়াল ভাঙার চেষ্টা শুরু হলো। অন্যদিকে শহরের কিছু তরুণ লড়াই শুরু করলে প্রথম তিনদিন মঙ্গোলরা পেরে উঠতে পারেনি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তীব্র আক্রমণের ফলে দেওয়ালে ফাটল তেরি হতে থাকলো। বাগদাদবাসী লড়াইয়ের পরিবর্তে সন্ধি করতে আলকেমীর নেতৃত্বে তিন হাজার সেন্য নিয়ে শান্তি প্রস্তাব দেয়। কিন্তু হালাকু সবাইকে মেরে বস্তা করে বাগদাদে পাঠিয়ে দেয়।
১০ ফেব্রুয়ারি তারা বাগদাদে প্রবেশ করলো। শুরু হলো নারকীয় গণ্যহত্যা। হালাকু খান থেকে ঘোষণা এলো, ‘যারা আত্মসর্মণ করে দজলার তীরে সমবেত হবে তাদের হত্যা করা হবে না’। লাখ লাখ মানুষ দ্রুত ময়দানের দিকে রওনা হলো। পূর্বেও মোঙ্গলরা এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিনা প্রতিরোধে হত্যা করেছে। বাগদাদবাসী অতীত থেকে শিক্ষা নেয়নি। আত্মসমর্পন ছিল একটা ফাঁদ মাত্র। তবুও লড়াইয়ের বদলে আত্মসমর্পণ শ্রেয় মনে করলো। ময়দানে উপস্থিত থাকার পর সবাইকে বেঁধে সবার শীরচ্ছেদ করা হলো। রক্তে রঞ্জিত হলো দজলার পানি। যারা লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিলো তারা ঘন্টা প্রতিরোধ ধরে রাখতে পেরেছিলো। যখন কেরাসিন দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলো তখন অগ্নিদগ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় ছিলো না। পুরুষদের মাথা কর্তন আর শিশু ও বৃদ্ধদের শরীরের মাঝখান থেকে দু’টুকরো করে ফেলছিলো। নারীদের যে নির্মম পরিণত হয়েছিল তা কারো অবোধ্যগম্য নয়। তাদের পরিণতি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ।
আল মুতাসিম ও তার হেরেম থেকে স্ত্রী, কন্যা, মা দাসীদের নিয়ে আসা হলো। হালাকুর নির্দেশে খলিফাকে নাকি প্রচুর ধন সম্পদ সহ সোনার খাচায় ঢুকিয়ে তালা মেরে রাখা হয়েছিলো। তার সামনেই পরিবারের চরম লাঞ্চনা ও মেয়েদের করুণ পরিণতি দেখে হাত পা ছোড়াছুড়ি করছিলেন। শাহাজাদাদের ও হত্যা করা হয়। কিন্তু তার সবকিছু বুঝতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। পূর্বে বহু জন মঙ্গোদের সম্পর্কে বললেও ফেরকায় আচ্ছন্ন থাকা নগরবাসী পাত্তা দেননি।
বন্দী করার ৩ দিন পর মুতাসিমকে হালাকু জিজ্ঞেস করেন: কী ক্ষুধা পেয়েছে? উত্তরে খলিফা বলেন, হ্যাঁ পেয়েছে। হালাকু পুনরায় বলে: তাহলে খাও।
খলিফা: কী খাব? এখানে তো খাবার নেই !
হালাকু বললেন, এ যে বছরের পর বছর যে সম্পদ জমিয়েছো, তা খাও । সোনাদানা জমিয়ে না রেখে যদি নিজেদের সেনাবাহিনীর পেছনে খরচ করতে, যদি শহরের দেয়াল মেরামত করতে তাহলে আজ আমার দয়ার ভিখারি হয়ে তোমাকে মরতে হতো না। খাও, আজ তোমার সম্পদ তুমিই খাও। মুতাসিম হা করে চেয়ে রইলেন। তাকে টেনে হিচড়ে এনে গালিচায় মুড়িয়ে ঘোড়ার পায়ে নিচে পিষে হত্যা করা হলো। এভাবে আব্বাসীদের কফিনের শেষ পেরেক হালাকু খান দিয়ে দেন। শুরু হয় লুটতরাজ, বাইতুল হিকমাহর বিশাল ভাণ্ডার ধ্বংস করে দেয়া হয়। সেদিন দজলা লালই হয়নি বরং পুড়ে যাওয়া বইয়ের ছাইয়ে কালোও হয়েছিল। ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয় ‘ঘোড়সওয়াররা বইয়ের স্তূপের ওপর দিয়ে নদী পার হতে পারত।’
প্রাক ইসলামী যুগে যখন শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত ছিলো না তখন বায়তুল হিকমাহ মাধ্যমে শিক্ষা বিপ্লব হয়। যা পরবর্তীতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সাত দিন ধরে লুট করার পর লাশের গন্ধে টিকতে না পেরে হালাকুৃ বন্দীদের নিয়ে বাগদাদ ছেড়ে যান। বন্দীরা পরবর্তীতে দাস-দাসী হিসেবেই জীবন কাটিয়ে দেন। বাগদাদে পড়ে থাকলো মানুষের মাথার খুলি, পচা লাশ, পোড়া লাশ, পোড়াবাড়ি।
মৃত্যুপুরিতে পরিণত হলো খলিফা মুনসুরের সাজানো শহরটি। ধারণা করা হয় হালাকু খান এই অভিযানে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ হত্যা করা হয়। যারা কোনোভাবে বেঁচে গিয়েছিলো তারাও পরবর্তীতে খাদ্যভাবে মারা যেতে থাকে। মঙ্গোলরা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা সেচ ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়। এদিকে ইসলামি সভ্যতার রাজনৈতিক, বুদ্ধিভিত্তিক শহরের পতন অন্যদিকে সমরকন্দ, বুখারা, কর্ডোবা, আলেপ্পো, গ্রানাডার পতনের মাধ্যমে স্বর্ণযুগের অবসান হয়। ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত মুসলামানরাই শিক্ষায় এগিয়ে ছিলো। কিন্তু যোগ্য নেতৃত্বের অভাব, অনৈক্য, ভোগবিলাসিতা, বিশ্বাসঘাতকতা এমন শোচনীয় পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেন। বাগদাদের সেই জৌলুসতা কোনোদিন ফিরে আসেনি। যে বাগদাদে একসময় বিশ্বখ্যাত দার্শনিক, কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানীরা ছুটে আসতেন, সেই বাগদাদ কালের গর্ভে হারিয়ে গেলো। বায়তুল হিকমাহ পৃথিবীর দুর্লভ বইয়ের ভাণ্ডার ছিলো তাও সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেল।
বাগদাদের মুসলিম বিজ্ঞানীদের রচিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে কিতাবুল মানাযির, কিতাবুল হাইয়ান, কিতাবুল জাবর। এমন শত শত কিতাব রয়েছে। এসব কিতাব জ্ঞানের ভান্ডার খুলে দিয়েছে। জন্ম দিয়েছে আধুনিক বিজ্ঞানের। অতীতে বিশ্বের কোন জাতিই এমন কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারেনি। কিন্তু আমরা আমাদের আত্মপরিচয় না জানার কারণে এসব অতীত ভুলে যেতে বসেছি। বর্তমান বিশ্বে মুসলিমদের দিকে তাকালে যে চিত্রটি আমরা দেখতে পাই, ঠিক তার উল্টো আলোকিত যুগ পার করে এসেছে মুসলিমরা। মুসলমানদের রয়েছে এক গৌরবোজ্জল অতীত; যা এক সময় গোটা বিশ্বেকেই আলোকিত করেছিলো। মুুসলিমদের মাধ্যমেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল কিছু উদ্ভাবিত হয় এবং তাঁরাই এগুলোর সূচনা করেন। তাদের জ্ঞানের ভাণ্ডার সমুদ্রের চেয়েও গভীর এবং আকাশের চেয়ে প্রশস্ত তা প্রমাণ করেছেন। কিন্তু ১২৫৮ সালে মঙ্গোলদের দ্বারা বাগদাদ অবরোধ এবং ১৪৯২ সালে গ্রানাডা আমিরাতের পতনের মাধ্যমে সোনালী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
উদাসীনতা ও আত্মবিস্মৃতির কারণে বিশ্বের মুসলমানরা আজ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অকল্পনীয় পিছিয়ে পড়েছে। এখনো যদি বাস্তবতা উপলব্ধি করে জ্ঞান-বিজ্ঞানে অবস্থা দৃঢ় না করা হয় তবে পশ্চাদপদতা আমাদের জাতি সত্তা ধ্বংস করে দিবে; এমনকি আমরা একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়ও সফল হতে পারব না।
লেখক : শিক্ষার্থী, জয়পুরহাট সরকারি মহিলা কলেজ, জয়পুরহাট।