তোফাজ্জল হোসাইন

কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলনের সূচনা ২০১৮ সালে হলেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে তখন চাকরিতে কোটা তুলে দিয়েছিল সরকার। ৫ জুন ২৪ হাইকোর্টের এক রায়ে কোটা পুনর্বহাল হলে ‘‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’’ ব্যানারে শুরু হয় নতুন আন্দোলন। শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে ২ জুলাই থেকে মিছিল-সমাবেশ শুরু করে। শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহবাগকে কেন্দ্র করেই চলছিল শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি। প্রায় প্রতিদিন শাহবাগে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছিল তারা। ধীরে ধীরে আন্দোলনের পরিসরও বাড়তে থাকে পুরো দেশজুড়ে। সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া অহিংস আন্দোলনটি পরবর্তীতে ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সরকার পতনের এক মহাবিপ্লবে পরিণত হয়।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রথম গর্জে ওঠা : প্রথম দিকে আন্দোলনটি ছিল মূলত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কোটা সংস্কারের দাবি। মেধাবীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার জন্য তরুণ প্রজন্ম রাজপথে নেমে আসে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে যখন সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নির্মম দমন-পীড়ন শুরু করে, তখন আন্দোলনটি এক নতুন রূপ নেয়। শিক্ষার্থীদের ওপর টিয়ারশেল, সাঁজোয়া যান ও সরাসরি গুলীবর্ষণ করা হয়। আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ শত শত সাহসী তরুণ রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দেন। এই আত্মত্যাগ পুরো দেশের মানুষকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করে।

৫ আগস্টের বিজয় : ৫ আগস্ট, ২০২৪ সালে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির মাধ্যমে হাজার হাজার জনতা সব ভয়ভীতি উপেক্ষা করে ঢাকার রাজপথে নেমে আসেন। ছাত্র-জনতার এই বাঁধভাঙা জোয়ারের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। চোখে দেখা এই জুলাই বিপ্লব শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন।

শহীদদের আত্মত্যাগের : ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থী ও আপামর জনতার অসীম আত্মত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। তাদের রক্তের বিনিময়ে জাতি দীর্ঘদিনের স্বৈরাচার ও বৈষম্য থেকে মুক্তি পেয়ে এক গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখার সুযোগ পেয়েছে।

এই গণঅভ্যুত্থানের বহু সাহসী বীরের মধ্যে কয়েকজন হলেন-

শহীদ আবু সাঈদ: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী ১৬ জুলাই ২০২৪ তারিখে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় পুলিশ ও সরকারি বাহিনীর সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়ে এক অনন্য সাহসের প্রতীক হয়ে ওঠেন। দুই হাত প্রসারিত করে তার এই নির্ভীক অবস্থান পুরো দেশের মানুষের মধ্যে ভয় ভেঙে দেয় এবং আন্দোলনকে একটি গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।

শহীদ ওয়াসিম আকরাম: চট্টগ্রাম কলেজের এই মেধাবী ছাত্র ও ছাত্রদল নেতা ১৬ জুলাই পুলিশের গুলীতে প্রাণ হারান। তার আত্মত্যাগ আন্দোলনরত তরুণদের আরও ঐক্যবদ্ধ ও সাহসী করে তোলে।

শহীদ জনি হোসেন : ঢাকার অদূরে সাভারের এই তরুণ পরিবারের একমাত্র ভরসা হয়ে ব্যবসার হাল ধরেছিলেন। কিন্তু ন্যায় ও সমতার লড়াইয়ে তিনিও রাজপথে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসনে সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানাবিধ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে, এই তরুণ ও সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ আমাদের দেশের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

নতুন বাংলাদেশ গড়ার তরুণদের ভাবনা : নতুন বাংলাদেশ গড়ায় তরুণদের ভাবনা হলো বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, ও আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে তোলা। তারা মেধার মূল্যায়ন, মানবাধিকারের সুরক্ষা এবং উদ্যোক্তা নির্ভর ডিজিটাল অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশকে বিশ্বের উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে।

কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা নির্ভর অর্থনীতি : মুখস্থ নির্ভর পড়াশোনার বদলে তারা বাস্তবমুখী ও কারিগরি শিক্ষার উপর জোর দেয়। চাকরির পেছনে না ছুটে তারা নিজেরা উদ্যোক্তা হতে এবং তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) ও ফ্রিল্যান্সিংয়ে ক্যারিয়ার গড়ে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে আগ্রহী।

দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতি: তরুণরা চায় ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং সেবা ও নীতি-ভিত্তিক রাজনীতি। তারা এমন একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রত্যাশা করে যেখানে তরুণ নেতৃত্ব সৎ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত হতে পারবে।

উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা: শিক্ষার মানোন্নয়ন তরুণদের বড় ভাবনা। তারা মুখস্থ বিদ্যার বদলে গবেষণা, উদ্ভাবন (Innovation) ও সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দেয়, যাতে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের তরুণরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

আজকের তরুণসমাজ তাদের মেধা, দেশপ্রেম ও কঠোর পরিশ্রম দিয়ে একটি সমৃদ্ধ, শান্তিপ্রিয় ও আধুনিক ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলতে পুরোপুরি প্রস্তুত।

লেখক : প্রাবন্ধিক।