জুলাই বিপ্লবের দু’বছর পূর্ণ হলো। কিন্তু যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে ছাত্র-জনতার এ ঐতিহাসিক বিপ্লব সাধিত হয়েছিলো তা আমাদের কাছে অনেকটা অধরাই রয়ে গেছে। রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই আবারও বিজয়ের চেতনা হাতছাড়া হতে বসেছে। মূলত, এ জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ও জাতি দীর্ঘদিনের আওয়ামী স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী অপশাসন-দুঃশাসন থেকে দেশবাসী মুক্তি পেয়েছে। প্রায় ১৬ বছরের শাসনামলে আওয়ামী-বাকশালীরা পরিকল্পিতভাবে দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে দিয়েছিলো। বিচারবিভাগ, গণপ্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও শিক্ষাপ্রশাসনসহ রাষ্ট্রের সকল অঙ্গপ্রতিষ্ঠানকে করা হয়েছিলো নির্লজ্জ দলীয়করণ। কখনো একদলীয় নির্বাচন, কখনো দিনের ভোট রাতে, আবার কখনো ‘আমি ও ডামি’ নির্বাচন করার গুরুতর অভিযোগ ছিলো তাদের বিরুদ্ধে। আওয়ামী শাসনামলে বিরোধীদলগুলো স্বাভাবিকভাবে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম বা কর্মসূচি পরিচালনা করার সুযোগ পায়নি বরং তাদের ওপর দীর্ঘ পরিসরে জুলুম-নির্যাতন চালানো হয়েছিলো।

মূলত, ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ১৬ বছরের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী স্বৈরশাসক হাসিনা শাসনের অবসান ঘটে। ৩৬ দিনের এ সর্বাত্মক গণআন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি যে হাসিনার পতন ডেকে আনবে তা ৫ আগস্টের আগের দিনও কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। এমনকি খোদ শেখ হাসিনা নিজেও বুঝতে পারেননি যে তাকে চরম বেইজ্জতির সাথে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়তে হবে। আমাদের দেশের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর আগে কোনো সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানকে এমন অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়নি। তবে একথাও ঠিক যে, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে হাসিনার মতো এত স্বেচ্ছাচারী, অত্যাচারী, স্বৈরাচারী, অপরিণামদর্শী ও অহংকারী শাসক আমরা কখনো প্রত্যক্ষ করিনি।

২০০৮ সালে সাজানো, পাতানো ও সমঝোতার নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি দ্বিতীয়বারের মত ক্ষমতাসীন হোন শেখ হাসিনা। নির্বাচনটি যে সমঝোতার ছিলো এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পরলোকগত আব্দুল জলিলের আত্মস্বীকৃতিও রয়েছে। সে সংসদে আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতাও ছিলো। কিন্তু এ সংখ্যাগরিষ্ঠতা শেখ হাসিনা জনগণের কল্যাণে ব্যবহার না করে রীতিমত স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠেন। অতীতে এ ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি ব্যবহার করেই সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একদলীয় বাকশালী শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো। ফ্যাসিবাদ আমলের প্রায় ১৬ বছরে জাতীয় সংসদের ৩টি তামাশা ও ভাঁওতাবাজির নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিচালনা করে দেশকে অপরাধ ও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিলো। অপশাসন-দুঃশাসন ও দুর্নীতিকে বলতে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছিলো।

শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচন করা হয়েছিলো। কথিত সে নির্বাচনে সংসদ বিনা ভোটেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলো। ২০১৮ সালের নৈশ্যকালীন নির্বাচন, ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচন-শেখ হাসিনাকে টানা চারবার প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসিয়েছে ঠিকই, কিন্তু দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে জনবিচ্ছিন্ন করে হাসিনাকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত করেছে। পরিণতিতে ২০২৪ সালে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে হাজার হাজার প্রাণের বিনিময়ে তাদের স্বৈরাচারের পতন ঘটে। যা ছিলো ইতিহাসের এক অনিবার্য বাস্তবতা।

তবে অতীব পরিতাপের বিষয় যে, ফ্যাসিবাদ পতনের দু’বছর অতিক্রান্ত হলেও আন্দোলনের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য এখনও অর্জিত হয়নি। যে বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট নোবেলবিজয়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও আমাদের স্বপ্নগুলো অধরাই রয়ে গেেছ। তবে একথা সত্য, প্রত্যাশা পূরণে ইউনূস সরকারের অনেক ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতা থাকলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে সফলতাও রয়েছে। কিন্তু নতুন সরকার সে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি বা করছে না। তারা জুলাই চেতনা বাস্তবানকে অস্বীকার করে পুরো দেশকেই এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে।

একথা কারো অজানা নয় যে, শেখ হাসিনা তার শাসন আমলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে চেতনা ব্যবসা করে গেছেন। প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন, সাম্য ও মানবিক মর্যাদার বাংলাদেশ গড়ে তোলাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা। এদিক থেকে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানও বৈষম্যবিরোধী চেতনায় সাম্য ও মানবিক মর্যাদার বাংলাদেশের গণআকাক্সক্ষাকেই তুলে ধরে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে মহান স্বপ্নকে সামনে রেখে আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ হাজার হাজার ছাত্র-জনতা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অকাতরে জীবন দিলেন; অনেকেই চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেলেন, সে স্বপ্নই এখন উপেক্ষার মুখে। স্বাধীনতা ও জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে গণতন্ত্র ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে প্রথমত, জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করা দরকার হলেও এ বিষয়ে বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি। দেশে নির্বাচনী সহিংসতা, পেশীশক্তির মহড়া এবং চর দখলের নির্বাচন বন্ধ করতে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচনও সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হলেও এ দাবির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যমতে পৌঁছতে পারেনি। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পুরনো পদ্ধতিতেই হয়েছে। সঙ্গত কারণেই নির্বাচন হয়েছে রীতিমত প্রশ্নবিদ্ধ। এমতাবস্থায় জুলাই বিপ্লবের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এখন হুমকির মুখে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই মতৈক্যের ভিত্তিতে এমন কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা দরকার যা ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনরা অতীত বৃত্ত থেকে কোনভাবেই বেরিয়ে আসতে পারেনি বা পারছে না। আমাদের মনে রাখা দরকার অন্যায়ের জবাব অন্যায় দিয়ে নয় বরং বাংলাদেশের মতো বহুত্ববাদী সমাজে সকলের সমান ও ন্যায় অধিকার নিশ্চিত করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। কথায় কথায় নানাবিধ চটকদার রাজনৈতিক ট্যাগ লাগিয়ে নির্দোষ ও নিরীহ কাউকে হয়রানি বা সম্মানহানী করা কোন ভাবেই কাম্য হতে পারে না। মূলত, জুলাই গণঅভ্যুত্থান তখনই অর্থবহ ও সফল হয়ে উঠবে যখন আমরা এমন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবো যেখানে সবার জন্য থাকবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, মত প্রকাশের অধিকার এবং অন্যান্য সর্ব ন্যায়সঙ্গত অধিকার। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আমাদের আহামরি কোন অর্জন নেই।

মূলত, জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভূ-চিত্রই পাল্টে দেয়। দেশ ও জাতির এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে প্রফেসর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার সংকট নিরসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সংস্কারের পথে যাত্রা শুরু করে। বলা যায়, এ সরকার কিছু মৌলিক ভিত্তি স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলো। কিন্তু রাজনৈতিক অনৈক্যের কারণে তাও ভেস্তে যেতে বসেছে।

অবশ্য একথা সত্য যে, অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন অর্জনের তালিকার পাশাপাশি কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও ছিলো। তারপরও এ স্বল্প মেয়াদের সরকার জাতিকে জুলাই ঘোষণা ও জুলাই সনদ উপহার দিয়ে গেছে। নীতির প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের কোন আপস করার সুযোগ ছিলো না। তাই দেশ ও জাতির স্বার্থে তাদেরকে কিছু অপ্রিয় কাজও করতে হয়েছিলো। দেশ ও জাতির জন্য যা কল্যাণকর তা-ই করতে হয়েছিলো তাদেরকে। বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জনও ছিলো এ সরকারের।

শান্তি ও স্থিতিশীলতা: আওয়ামী সরকারের বিদায়ের সময় দেশের রাজনীতি ছিল অস্থিরতার মধ্যে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে নেমে এসেছিলো। সরকার পরিবর্তনের পর সহিংসতা ও দমন-পীড়নের বদলে শান্তিপূর্ণ সংলাপ ও সংযমের পথে হাঁটায় দেশে রাজনৈতিক সহাবস্থানের পরিবেশ খানিকটা সৃষ্টি হয়েছিলো। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টাও ছিলো তাদের। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর নেতিবাচক মানসিকতার কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের এসব উদ্যোগ পুরোপুরি সফল হয় নি। ভাঙা সম্ভব হয়নি অতীত বৃত্ত।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও বাজারস্থিতি: অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছিলো। রফতানি বেড়েছিলো ৯ শতাংশ, রেমিট্যান্স ছাড়িয়েছে ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একই সাথে টাকার মান ডলারের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে। সরকার ঘোষণা করেছিলো, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে ধীরে ধীরে কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। যা স্বল্পকালীন সরকারের একট উল্লেখযোগ্য অর্জন।

বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রবাসীবান্ধব ও বিনিয়োগসহায়ক নীতির ফলে বিদেশী বিনিয়োগে (এফডিআই) বড় অগ্রগতি হয়েছিলো। চীনা প্রতিষ্ঠান হান্ডা গ্রুপ বাংলাদেশে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্পে ২৫ হাজার কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সাথে বাণিজ্যনীতি ও ট্যারিফ আলোচনায়ও অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিলো।

‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ ও সংস্কার কমিশন: ২০২৪ সালের আন্দোলনের মূল দাবিগুলোকে ভিত্তি করে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ পাঠ করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস। এতে ১১টি গণতান্ত্রিক সংস্কার কমিশনের কথা বলা হয়েছে, যা সাংবিধানিক সংস্কার, নির্বাচন, বিচারিক স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন, কোটা সংস্কার ইত্যাদি ক্ষেত্রে সুপারিশ প্রণয়ন করছে। নতুন সমাজচুক্তির ভিত্তি স্থাপনে এ কমিশনগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই ঘোষণার আলোকেই জুলাই সনদ প্রণয়ন, জুলাই অধ্যাদেশ জারি এবং এ বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। যা জাতিকে নতুন করে আশান্বিত করে।

জবাবদিহিমূলক ও নিরপেক্ষ শাসন: প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও মিতব্যয়িতার নীতি গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি নয়, বরং জনগণের ম্যান্ডেটের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে সরকার পরিচালনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হয়েছে সে সময়। যা ছিলো সত্যিই প্রশংসনীয়।

পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সহায়তা: ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সাথে গঠনমূলক সম্পর্ক রক্ষা করছে অন্তর্বর্তী সরকার। একই সাথে সার্ক, বিমসটেক ও আসিয়ানের মতো আঞ্চলিক সংগঠনে সক্রিয় অবস্থান নিয়েছে। ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের রূপান্তরে অর্থায়ন বৃদ্ধি করেছে।

আন্তর্জাতিক মহলে অধ্যাপক ইউনূসের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সফট পাওয়ার হিসেবে কাজ করেছে। ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক রক্ষায় সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা ও পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে জটিল আলোচনা চললেও, পাকিস্তান ও চীনের সাথে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মেরুকরণ পরিলক্ষিত হয়েছে। জাতিসংঘ, ওআইসি, আইএলওসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে সতর্ক আশাবাদ নিয়ে।

রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু নীতি: অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো হয়। জলবায়ু অভিযোজন ও কার্বন নিরপেক্ষ উন্নয়ন কৌশলে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সহায়তার আওতায় নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা এ সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।

সাংস্কৃতিক জাগরণ ও মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণ: অন্তর্বর্তী সরকার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ফিরিয়ে আনার ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জুলাই বিপ্লবের শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, শহীদ পরিবারকে রাষ্ট্রীয় সম্মান এবং পথশিশু, শ্রমজীবী মানুষ, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মানবিক কল্যাণে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকারের পতনের পর আমরা যেভাবে আশান্বিত হয়ে উঠেছিলাম, অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের সে আস্থা পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। এমনকি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও বিতর্কমুক্ত করতে পারেনি ড. ইউনুস নেতৃত্বাধীন সরকার। মূলত, সরকারের মধ্যে লুকিয়ে থাকা পতিত স্বৈরাচারের দোসরদের কারণেই এ সরকার পুরোপুরি সফল হয়নি। যার প্রমাণ মেলে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রেজওয়ানা হাসানের আত্মস্বীকৃতি থেকে। তিনি দাবি করেছেন, বিশেষ গোষ্ঠীকে তারা ক্ষমতায় আসতে দেয়নি।

তবে একথা ঠিক যে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই সনদ প্রণয়ন ও গণভোটের মাধ্যমে দেশ, জাতি ও রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে আগামী দিনের জন্য দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছে। তারা জুলাই সনদ ও জুলাই অধ্যাদেশ বিষয়ে গণভোট আয়োজন করে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে। এটি আমাদের জাতীয় জীবনের অনেক বড় অর্জন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমান ক্ষমতাসীনদের নেতিবাচক মনোভাবের কারণেই জুলাইয়ের পুরো অর্জন এখন ব্যর্থ হতে চলেছে। এখন পর্যন্ত জুলাই সনদকে সাংবিধানিক ভিত্তি দেয়া হয়নি। ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশাও পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শত-সহস্র শহীদের রক্ত এখন বিফলে যেতে চলেছে। বিষয়টি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল এখন মুখোমুখি অবস্থানে। ফলে জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আবারো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিপ্লবের দু’বছরের মধ্যেই আবার রাজনৈতিক সংকটের প্রতিধ্বনিতে দেশের আত্মসচেতন মানুষ উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না।

www.syedmasud.com