২০২৪ সালের ১ আগস্টের কথা মনে পড়ে। এর দুদিন আগেই অর্থাৎ ২৯ জুলাই ১৪ দলীয় জোটের সভা শেষে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার একটি ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। তাই এমন কিছু একটা হবে তা অপ্রত্যাশিত ছিল না। কিন্তু যখন নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়ে গেজেটটি ফাইনালি পেলাম, তখন নিজেকে সংবরণ করা কঠিন মনে হচ্ছিল। এতো মানুষের শাহাদাত, এত মানুষের রক্তদান, এত মানুষের অঙ্গহানির ওপর যে সংগঠনটি দাঁড়িয়ে আছে, সে সংগঠনটি এভাবেই শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যাবে তা সহ্য করার মতো কোনো বিষয় ছিল না। যদিও আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে মিশরের ইখওয়ান নিষিদ্ধ, কিংবা তুরস্কের রেফাহ পার্টির নিষিদ্ধ হওয়া, আলজেরিয়ায় ইসলামিক সালভেশন ফ্রন্ট কিংবা বিগত কয়েক বছরে তিউনিশিয়ায় আন নাহদা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইখওয়ানের নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে আমরা অবগত ছিলাম; তারপরও নিজ দেশে এ পরিস্থিতি কখনো হবে- তা মেনে নেয়ার জন্য আমরা কেউই বোধহয় প্রস্তুত ছিলাম না।
তাই স্বাভাবিকভাবেই সরকারের নির্বাহী আদেশে যখন নিষিদ্ধ করার ঘোষণাটি চলেই আসলো, তখন একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেল যে, ফ্যাসিবাদী সরকার জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রশিবিরকেই তারা সবচেয়ে বড়ো হুমকি বলে মনে করছে। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এ দেশের ছাত্রজনতার যে জাগরণ ঘটেছিল তার নেপথ্যে সবচেয়ে বড়ো কুশীলব হিসেবে ছাত্রশিবিরকেই তারা সন্দেহ করেছিল। কারণ নিষিদ্ধ হওয়ার এ খড়গ জামায়াত-শিবির ছাড়া আর কারো ওপর নেমে আসেনি। আওয়ামী সরকার ও ১৪ দলীয় জোটের বামপন্থী নেতৃবৃন্দের সে সময়ের সাক্ষাৎকারগুলো শুনলেও বোঝা যায়, তাদের মূল আক্রোশটি ছিল জামায়াত শিবিরের বিরুদ্ধে। সে সময়ে আন্দোলন যত তীব্র হচ্ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ নেতারা ততই এর পেছনে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলছিলেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের একাধিক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, “আন্দোলনের আড়ালে ‘জামায়াত-শিবির ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি’ দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে।” আবার দু’বছর পর এসে বর্তমান বাস্তবতায় বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী নেতৃত্বের বক্তব্যগুলো যদি আমরা মনোযোগ দিয়ে শুনি তাহলেও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে ফিরে আসার ক্ষেত্রে এখনো সবচেয়ে বড়ো প্রতিবন্ধকতা মনে করছে জামায়াত আর ছাত্রশিবিরকেই। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও বিএনপিকে তারা কখনোই মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে গন্য করছে না।
পাঠকদের জ্ঞাতার্থে আমি জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নিষিদ্ধ হওয়া থেকে পুনরায় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের টাইমলাইনটি একটু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। মূলত ২০২৪ সালের ১ আগস্ট তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এবং তাদের সকল অঙ্গসংগঠনকে রাজনৈতিক দল ও সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ধারা ১৮ অনুযায়ী তাদের “নিষিদ্ধ সংগঠন” হিসেবে তফসিল-২-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রজ্ঞাপনে দাবি করা হয় যে সরকার বিশ্বাস করে জামায়াত ও শিবির সাম্প্রতিক সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল এবং এ সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ সরকারের কাছে রয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলার ফায়সালা ছিল ভিন্ন। ১ আগস্টের প্রজ্ঞাপনের মাত্র চারদিন পর, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং পূর্ববর্তী সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সবচেয়ে বড়ো কথা, শেখ হাসিনা যখন একদিকে পালিয়ে যাচ্ছেন, অন্যদিকে সেনাপ্রধান তখন ক্যান্টনমেন্টে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বৈঠক করছেন। আর অবাক করা বিষয় হলো, বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে সেনাপ্রধান সাংবাদিকদের সামনে বৈঠকে উপস্থিত দলদের কথা বলতে গিয়ে সবার আগে জামায়াতে ইসলামীর নাম বলেছিলেন। যদিও পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে নানা পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ হয়েছে। তবে একথা নি:সন্দেহে বলা যায় যে, নিষিদ্ধ ঘোষণা হওয়ার পর থেকে জামায়াতের বিশাল জনশক্তির মধ্যে যে বুকভাঙা প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা অনেকটাই পাল্টে যায় সেনাপ্রধানের এ ঘোষণায়। এর কিছু সময় পরে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির দপ্তরে যখন জামায়াতের আমীরকে দৃশ্যমান উপস্থিত দেখা যায়, সেখানেই জামায়াতের পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক গতিপথ অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যায়।
অনেকেই মনে করেছিলেন, ৫ আগস্টে বঙ্গভবনের সে বৈঠকেই কিংবা তার পরপরই জামায়াতের নিষিদ্ধকরণের আদেশটি প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। তবে সরকার তখন নিজেকে গুছিয়ে নিতে কিছুটা সময় নেয় বলেই অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মাণ হয়। অন্তর্বর্তী সরকার ২৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে ১ আগস্টের নিষিদ্ধকরণ আদেশ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে। নতুন প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোর সন্ত্রাসী কার্যকলাপে সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং সরকার বিশ্বাস করে তারা সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত নয়। ফলে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর তফসিল-২ থেকেও সংগঠনদুটোর নাম প্রত্যাহার করা হয়। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করে। দীর্ঘদিন পর তারা দেশজুড়ে সমাবেশ, কর্মসূচি, সাংগঠনিক সফর এবং রাজনৈতিক সংলাপে অংশগ্রহণ শুরু করে। বিশেষ করে জেলায় জেলায় সমাবেশ ও কর্মী সম্মেলন দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে কাজ করতে না পারা জনশক্তিকে নতুনভাবে উজ্জীবিত করে।
এর মাঝে আইনী প্রক্রিয়াতেও জামায়াত তাদের লড়াই অব্যাহত রাখে। উল্লেখ্য ২০১৩ সালে হাইকোর্ট জামায়াতের বিরুদ্ধে একটি রায় দিয়েছিল যার ফলশ্রুতিতে নির্বাচন কমিশন থেকে এর আগে প্রাপ্ত জামায়াতের নিবন্ধন লাইসেন্সটা বাতিল হয়ে যায়। জামায়াত সে সময়ে হুটহাট কিছু না করে উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করছিল। আওয়ামী লীগ বিদায় নেয়ার পর জামায়াত আবারও আইনি লড়াই শুরু করে। অবশেষে ২০২৫ সালের ১ জুন সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগ ২০১৩ সালের হাইকোর্টের রায় বাতিল করে জামায়াতের নিবন্ধন পুনর্বহালের পথ খুলে দেয় এবং নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। এর প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৪ জুন নির্বাচন কমিশন নীতিগতভাবে জামায়াতের নিবন্ধন ও “দাঁড়িপাল্লা” প্রতীক ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ২৪ জুন নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন ও দলীয় প্রতীক “দাঁড়িপাল্লা” পুনর্বহাল করে। ফলত, এই দিনটিই জামায়াতের নিবন্ধন ফিরে তারিখ হিসেবে বিবেচিত হয়। আর সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩ জুলাই নির্বাচন কমিশন পুনর্বহাল-সংক্রান্ত আরেকটি গেজেট প্রকাশ করে, যাতে নিবন্ধন ও প্রতীক পুনর্বহালের বিষয়টি সরকারি গেজেটে প্রতিফলিত হয়।
কিন্তু এখানে আরেকটি বিষয়ে দৃষ্টি প্রতিফলিত না করলেই নয়। তাহলো ১ আগস্ট ২০২৪ তারিখে জামায়াত শিবিরের নিষিদ্ধ ঘোষণার পর এ সংগঠনদুটোর ইতিবাচক ও দূরদর্শী ভূমিকা। জামায়াত-শিবির সে সময়ে মাথা ঠাণ্ডা রাখার এবং সবরের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা আসলে প্রশংসার দাবি রাখে। আমার মতে, এমন পরিপক্ক সিদ্ধান্তটি না নিতে পারলে হয়তো আওয়ামী লীগের পতনটাই হতো না। ভায়োলেন্সের দিকে গেলে জামায়াত বা শিবির আওয়ামী লীগের পাতানো ফাঁদে পড়ে যেত; এবং আওয়ামী লীগ ওয়াকওভার পেয়ে যেত। জামায়াতের নীতি নির্ধারকেরা তখন সত্যিকারার্থেই অনুধাবন করেছিলেন তৎকালীন সরকার মূলত আন্দোলনকে রাজনৈতিক তকমা দিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার ফাঁদ পেতেছিল। কিন্তু সে ফাঁদে পা দেয়নি জামায়াত ও শিবির। দলটি কোনো দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি না দিয়ে বরং নেতা-কর্মীসহ দেশবাসীকে চলমান আন্দোলন সফল করতে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছিল।
এমনকি নিষিদ্ধ ঘোষণার পর জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে কোনো দলীয় কর্মসূচিও ঘোষণা করেনি। ২৯ জুলাইয়ের ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে বেআইনি উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান। ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে জামায়াত আমীর বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। একটি রাজনৈতিক দল বা জোট অন্য একটি রাজনৈতিক দলের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। বাংলাদেশের আইন ও সংবিধান কাউকে এ এখতিয়ার দেয়নি। কোনো দল বা জোটের অন্য কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার ধারা চালু হলে এক দল অন্য দলকে নিষিদ্ধ করতে থাকবে। তখন রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বলে কিছু থাকবে না। জামায়াতে ইসলামী একটি প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠন, যা বাংলাদেশের সব গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছে এবং প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে বসে অতীতে অনেক আন্দোলন করেছে। দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থার ফর্মুলা জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে এবং তার ভিত্তিতে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরকম একটি গণতান্ত্রিক সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার দাবি বেআইনি, এখতিয়ারবহির্ভূত ও সংবিধানপরিপন্থি। জনগণ ১৪ দলের এই দাবি গ্রহণ করবে না।”
সে সময়কার সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রিপোর্ট দিয়েছিল যে আন্দোলনের পেছনে জামায়াত-শিবিরই মূল শক্তি এবং তাদের নিষিদ্ধ করলে আন্দোলন থেমে যাবে। কিন্তু জামায়াত কৌশলী হয়ে আলাদা কোনো ইস্যু তৈরি না করায় সরকারের সে পরিকল্পনা সফল হয়নি। সরকার যখন জামায়াত ও শিবিরকে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে এবং সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে, তখন জামায়াত ও শিবির নীরব থাকাকেই প্রতিবাদ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। আইন ভঙ্গ করার দায় নিতে চায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত তখন যথার্থই মনে করেছিল যে, সে মুহূর্তে নিষিদ্ধ হওয়ার বিরুদ্ধে আলাদাভাবে বিক্ষোভ করা নিরর্থক। রাজনীতির ভেতরের গেইম উপলব্ধি করেই জামায়াত তখন চলমান এক দফার আন্দোলনকে জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয় কেননা এর মাধ্যমেই ‘ফ্যাসিবাদের পতন’ অনিবার্য বলে তারা বিশ্বাসও করেছিলেন। তাছাড়া দল নিষিদ্ধের প্রতিবাদে কর্মীদের মাঠে নামালে ঝুঁকিও ছিল। যেহেতু সরকারও তখন সহিংস কৌশলে ছিল তাই মাঠে এই ইস্যুতে জনশক্তি নামলে তাদেরও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতো। আর ফ্যাসিবাদ পতনের আন্দোলন চলমানরত অবস্থায় একটি দল যদি আবার তার নিষিদ্ধ হওয়ার প্রতিবাদে আলাদা আন্দোলন করে তাহলে মূল আন্দোলনের ফোকাসও সরে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। যদিও জামায়াত ও শিবিরের অনেক নেতৃবৃন্দই তখন কারা অন্তরীণ, তারপরও বাইরে থাকা নেতৃত্বই নিজেদের মতো করে মাঠ পরিস্থিতি যাচাই করেও হয়তো উপলব্ধি করেছিলেন যে, পরিস্থিতি যেদিকে চলে গেছে তাতে আওয়ামী লীগের পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
আমি একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সাথে পরবর্তীতে এ বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেছি। তারাও একমত হয়েছেন যে, ১ আগস্ট পরবর্তী সময়ে জামায়াতের সিদ্ধান্তগুলো কৌশলগতভাবে ছিল অত্যন্ত পরিনামদর্শী। জামায়াতের নিয়ন্ত্রিত আচরণের কারণেই সরকার তৎকালীন ছাত্র আন্দোলনকে কোনো দলের মদদপুষ্ট বা জালাও পোড়াও বা আগুন সন্ত্রাসীদের আন্দোলনের তকমা দিতে পারেনি। একইসাথে, আন্দোলনটি একক কোনো দলের হিসেবে চিত্রায়িত না হওয়ায় এতে সর্বসাধারণের অংশগ্রহণও ঘটেছিল যা ফ্যাসিবাদের পতন ত্বরান্বিত করেছিল। বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরির একটি মতামত সেদিন পড়লাম যেখানে তিনিও জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টিকে ‘আওয়ামী লীগ সরকারের মিসক্যালকুলেশন’ হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেন যে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানটা ছিল অর্গানিক অভ্যুত্থান, যেখানে আপামর জনসাধারণের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। সরকার এ আন্দোলনকে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ হিসেবে না দেখে বরং একটি ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে বিবেচনা করেছিল এবং আন্দোলনের প্রকৃত গতিপ্রকৃতি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল। শেখ হাসিনা সরকার মনে করেছিল বিএনপি যেহেতু আন্দোলনে সরাসরি নেই, তাই নিশ্চয়ই জামায়াত এর পেছনে কাজ করছে। এ ভুল ধারণা থেকেই ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা হাসিনার একটি বড় ‘মিসক্যালকুলেশন’।
ইতিহাসের সকল স্বৈরাচারী শাসকের জন্য জামায়াত শিবিরের নিষিদ্ধ করার এ ঘটনাটি একটি শিক্ষনীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এ জন্য যে, ১ আগস্ট জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করে আওয়ামী লীগ প্রকারান্তরে নিজেদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল। জামায়াত শিবির তার মতোই কাজ করে গেছে, আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। কিন্তু মাত্র ৪ দিনের মাথায় খোদ আওয়ামী লীগেরই বিদায় ঘন্টা বেজে যায়। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাসহ দলটির অধিকাংশ নেতানেত্রী। এমন প্রেক্ষাপটে, নিষিদ্ধ ঘোষণার সেদিন থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ে জামায়াতের প্রধান বিরোধীদল হিসেবে আবির্ভুত হওয়ার এই যাত্রাপথ বিশেষভাবে মুল্যায়ন ও পর্যালোচনার দাবি রাখে।