আসিফ আরসালান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেশ কয়েক জায়গায় বলেছেন যে, তিনি প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। তিনি সহিংস পথ অবলম্বন করবেন না। তিনি ক্ষমা প্রদর্শনে বিশ্বাসী। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে বিএনপির মধ্যম বা পরবর্তী স্তর তাদের চেয়ারম্যান এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐ সমস্ত কথায় কর্ণপাত করছেন না। এ লেভেলের নেতাকর্মীদের সাম্প্রতিক পেশীশক্তির আস্ফালন দেখে মনে হচ্ছে, তারা তাদের সুপ্রিম লিডারের ঐসব কথাকে নেহায়েত নীতি কথা বলেই মনে করেন।

না হলে সিলেটের হবিগঞ্জে এসব কী হচ্ছে? হিংসার উন্মত্ততা কোন পর্যায়ে গেলে এনসিপি নেতা সারজিস আলমের গাড়িবহরে দুইদিনে দুইবার হামলা হয় কিভাবে? হবিগঞ্জে পুলিশ যে আচরণ করলো তাতে মনে হলো যে, শেখ হাসিনার আমলের আচরণ অনেক পুলিশই পরিহার করতে পারেননি। এনসিপি নেতাদের হবিগঞ্জে ঢুকতেই দেয়া হয়নি। তখন এনসিপি নেতারা পুলিশি বাধার মুখে মাটিতে বসে পড়েন। তারপরেও পুলিশ তাদের হবিগঞ্জে ঢুকতে দেয়নি। অথচ এনসিপি নেতাদের মধ্যে ছিলেন দুইজন জাতীয় সংসদ সদস্য। এরা হলেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এবং এনসিপির প্রেসিডেন্ট নাহিদ ইসলাম এবং কুমিল্লার এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহ। এছাড়াও ছিলেন মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী এবং উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম। এ সম্পর্কে মন্তব্য করার আগে ঘটনার বিবরণ সংক্ষেপে বর্ণনা করছি।

জুলাই মাসে জুলাই বিপ্লব উপলক্ষে হবিগঞ্জে পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করছিলো এনসিপি। এ উপলক্ষে ২৯ জুলাই হবিগঞ্জে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারীসহ অন্যেরা বক্তব্য রাখেন। এনসিপি নেতাদের বক্তব্য বিএনপির বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক, এই অভিযোগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমের গাড়িবহরে হামলা হয়েছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে শহরের স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা এ হামলা চালান। হামলার মুখে সারজিস আলম সোনালী ব্যাংকের কার্যালয়ে আশ্রয় নেন। তখন প্রায় এক ঘণ্টা সেখানে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখেন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। পরে পুলিশ গিয়ে সারজিস আলমকে উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে নিয়ে আসে। যখন তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন তখন বাইরে বিক্ষোভ করেছেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার মুখে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে সার্কিট হাউসে আসেন। একপর্যায়ে সেখান থেকে তিনি ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন। দুই নেতার গাড়িতে হামলার খবর পেয়ে প্রতিরোধ করতে যাওয়া এনসিপি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। তাতে প্রায় ১৫ জন আহত হয়েছেন।

সারজিস আলম সোনালী ব্যাংকে অবস্থান করছেন, এ খবর পেয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে এসে ব্যাংকটি ঘেরাও করে রাখেন। পরে পুলিশ এসে রাত আটটার দিকে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের সরিয়ে দিয়ে সারজিস আলমকে উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়। প্রথম আলোর খবর মোতাবেক হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান বলেছেন, এনসিপি নেতারা উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে এ পরিবেশ তৈরি করেছেন।

একবার হামলা করেই বিএনপি ও ছাত্রদল ক্ষান্ত হয়নি। তারা সারজিস আলমের গাড়ি বহরে গত ৩০ জুলাই দ্বিতীয় দফা হামলা করেছে। বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া তিনটার দিকে এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এক ফেসবুক পোস্টে এ তথ্য জানান। তিনি লিখেছেন, সিলেটের গোলাপগঞ্জ থেকে সিলেট শহরে ফেরার পথে এ ঘটনা ঘটেছে। তিনি লেখেন, ‘সিলেটের গোলাপগঞ্জে শহীদ পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সিলেট শহরে ফেরার পথে এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের গাড়িতে আবারও বর্বরোচিত হামলা চালায় বিএনপির সন্ত্রাসী বাহিনী।’ সারজিস আলমও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘দ্বিতীয় দফায় বিএনপির সন্ত্রাসীরা আমাদের ওপর আক্রমণ করেছে সিলেটের পাঁচ মাইল বাজারে। তারেক রহমান কি শেখ হাসিনা হতে চায়?’

এ বিষয়ে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া পৃথক এক ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন, স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা পুলিশের উপস্থিতিতেই এ হামলা চালিয়েছেন। তিনি বলেন, সার্কিট হাউসের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঢুকে মাইক্রোবাস ভাঙচুর এবং সাংবাদিকদের সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা রাজনৈতিক সহিংসতার উদ্বেগজনক নজির। বিএনপি ও ছাত্রদলের এ দুই দিনের হামলায় এনসিপির সমর্থক এক যুবক চোখে এমনভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেনে যে, তার দৃষ্টি শক্তি ফেরা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া দু’জনের হাতের হাড় ভেঙে গেছে। এনসিপির তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে এবং স্থানীয় সংবাদদাতারাও রিপোর্ট করেছেন যে, এভাবে একের পর এক হামলা চালানোর পরেও পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।

এনসিপির অপরাধ কী ছিলো? অপরাধ ছিলো, হবিগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি দলীয় এমপি জি কে গউছের বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রদান। জি কে গউছের পেশী শক্তি প্রবল। তবে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ শুধুমাত্র এনসিপিই করেনি। বিশিষ্ট সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরও করেছেন। এক ফেসবুক পোস্টে জুলকারনাইন সায়ের লিখেছেন, গউছের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা বিভাগ তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি রিপোর্ট পেশ করেছেন। জুলকারনাইন সায়ের তার ফেসবুক পোস্টে ঐ গোয়েন্দা রিপোর্ট হুবহু তুলে দিয়েছেন। ঐ গোয়েন্দা রিপোর্টে জি কে গউছের বিরুদ্ধে ৮ দফা অভিযোগ করা হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে গউছের বহুমুখী ভয়াবহ দুর্নীতি। সায়েরের ঐ পোস্টটির কপি আমার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। গোয়েন্দা রিপোর্ট হুবহু তুলে দিলে এই কলামে স্থান সঙ্কুলান হবে না। এখন প্রশ্ন হলো, বিএনপি কোন দিকে যাচ্ছে? তাদের নেতা বা এমপির বিরুদ্ধে সাংবাদিক সন্মেলন বা জনসভায় অভিযোগ তুললেই ছাত্রদল ও যুবদল আওয়ামী লীগ জামানার ছাত্রলীগ ও যুবলীগের স্টাইলে হামলা চালাচ্ছে। গউছের বিরুদ্ধে কথা তো শুধুমাত্র এনসিপিই বলেনি, জুলকারনাইন সায়েরও লিখেছেন। তাহলে কি এখন সায়েরকেও মার খেতে হবে?

রক্তঝরা জুলাই মাসে যদি সরকারি দলের নেতাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়ার জন্য পুলিশের ছত্রছায়ায় ছাত্রদল ও যুবদলের লাঠিয়ালরা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাহলে জুলাই বিপ্লব হলো কেনো? কেনো ১৪০০ মানুষ প্রাণ দিলেন? কেনো ২৬ হাজার মানুষ আহত হলেন?

শুধুমাত্র এনসিপি নয়, বিএনপি এখন মসজিদে নামাজের ইমামতি নিয়েও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। গত ২৪ জুলাই পাবনার সাঁথিয়ার আফতাব নগর জামে মসজিদে জামায়াত এমপি নজিবুর রহমানের (মোমেন) ইমামতি নিয়ে বিএনপি বিতর্কের সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে বিতর্কের পরিণতিতে জামায়াতের সমর্থক মুসল্লিদের ওপর বিএনপি সমর্থক মুসল্লিরা হামলা করলে দুইপক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়। তখন পুলিশ মসজিদে প্রবেশ করে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বিএনপি আজ কোন পর্যায়ে গেছে যে ধর্মীয় বিষয়েও তারা হস্তক্ষেপ করে এবং তার পরিণতিতে পুলিশ মসজিদের মতো পবিত্র স্থানে ঢুকে পড়ে?

জুলাই বিপ্লবের মূল সুর কী? ছিলো বাক স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মৌলিক মানবাধিকার সংরক্ষণ ইত্যাদি। হবিগঞ্জের জনসভায় এনসিপি নেতারা যদি বিএনপির এক বা একাধিক নেতার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করে থাকেন আর যদি সে অভিযোগ সত্যি নয় বলে ছাত্রদল ও যুবদল মনে করে তাহলে তার প্রতিকারের জন্য তারা আইনের আশ্রয় নিলো না কেনো? তারা তো এনসিপি নেতাদের বক্তব্য ভিডিওতে ধারন করেছে। আমি সে ভিডিও দেখেছি এবং আমার কম্পিউটারে সেভ করেছি। বিএনপি তো ঐ ভিডিও ক্লিপ নিয়ে পরদিনই আদালতে যেতে পারতো। অতঃপর এনসিপি সঠিক না বেঠিক কাজ করেছে সেসম্পর্কে আদালতই রায় দিতো। সেটি না করে তারা একেবারে মানুষের হাত ভেঙে দেয়া, গাড়ি ভাঙচুর প্রভৃতি ভায়োলেন্ট এ্যাকশনে গেলো কেনো?

আফসোস হয়, এনসিপি ছোট পার্টি হওয়ায় বিএনপি তাদের গায়ে হাত তুলছে। কোথায় ছিলো তাদের এ বাহাদুরি, যখন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ বিএনপিকে বিভিন্ন সময় মেরে তক্তা বানিয়েছিলো?

জামায়াতের আমীর বিরোধীদলীয় এমপি ড. শফিকুর রহমান এবং সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পারওয়ার বিভিন্ন সভা সমাবেশে বলে যাচ্ছেন যে, বিএনপি স্বৈরাচারের পথে হাঁটছে। এগুলো কোনো মেঠো বক্তৃতা নয়। মাত্র সাড়ে ৫ মাসে বিএনপি সরকার এমন সব কাজ করেছে যা স্বৈরাচারের পথে অগ্রসর হওয়ার প্রমাণ দেয়। ইতোমধ্যেই বিএনপি ১১টি সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ করেছে। ১১ জন প্রশাসকই বিএনপির কট্টর নেতা। এছাড়া ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। এ ৪২ জন জেলা প্রশাসকই বিএনপির হার্ডকোর কর্মী এবং নেতা। এছাড়া ১২টি আধা-সরকারি সংস্থায় ১২ জন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ ১২ জনই বিএনপির দ্বিতীয় স্তরের নেতা।

প্রথমে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল বলেছিলেন যে, অক্টোবর-নভেম্বর মাসের দিকে স্থানীয় সরকারসমূহের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এখন আবার বলছেন যে, জানুয়ারির আগে নির্বাচন করা হয়তো সম্ভব হবে না। এখন দেখা যাচ্ছে যে, যারা প্রশাসক হিসাবে ক্ষমতাসীন রয়েছেন তারা ইতোমধ্যেই আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এবং তাদেরকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পোস্টার মেরেছেন। কোনো সিটিং প্রশাসক নৈতিকভাবে নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন না। নির্বাচনের আগে তিনি তার ক্ষমতা এমনভাবে ব্যবহার করবেন যাতে করে তিনি নির্বাচনে পাস করতে পারেন।

সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো, ১২টি আধা-সরকারি কর্পোরেশনে বিএনপির নেতাকর্মীকে সংস্থা প্রধান হিসাবে নিয়োগ দান। ক্ষুদ্র শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক), জুট মিলস কর্পোরেশন ইত্যাদি এই ১২টি সংস্থার অন্তর্ভুক্ত। ব্রিটিশ আমল থেকে আজ পর্যন্ত এসব আধা-সরকারি সংস্থায় জয়েন্ট সেক্রেটারি বা এ্যাডিশনাল সেক্রেটারিকে এসব সংস্থার প্রধান হিসাবে বসানো হতো। শত বছরের রেকর্ড ভাঙলো বিএনপি সরকার। পত্রপত্রিকায় লেখা হয়েছে যে, বিএনপির যেসব নেতাকর্মী সংসদ সদস্য পদের নমিনেশন পায়নি অথবা অন্যান্য পদ-পদবী পায়নি তাদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে এসব স্থানে পদায়ন করা হয়েছে। শেখ মুজিব বাকশাল করেছিলেন। আর এখনকার ১২টি সিটি কর্পোরেশন, ৪২টি জেলা পরিষদ এবং ১২টি আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়োগ বাকশাল না হলেও সমগ্র প্রশাসনের দলীয় করণের পথে প্রথম ও দ্বিতীয় সোপান।