আমি যদি বলি বাংলাদেশের মানুষের শরীরে এক ফোটা রক্ত থাকতেও তাদের কেউ এই অবস্থা মেনে নেবে না, তাহলে হয়তো বেশি বলা হয়ে যাবে। বাংলাদেশে কিছু বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক এবং গণবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক নেতা আছেন। যারা এই ক্যাটাগরীতে পরেন না, তারা ভারতীয় অন্ন এবং ক্ষুদ কুঁড়া খেয়ে বেঁচে থাকেন। সাম্প্রতিককালে এদের দৌরাত্ম্য কিছুটা বেড়েছে। এরা এদেশের মানুষের পিতৃ পরিচয় মুছে দিতেই শুধু চায় না, তাদের আদর্শকে ধ্বংস করে দিয়ে ভারতের স্বার্থরক্ষায়ও বদ্ধপরিকর। তারা আমাদের অস্তিত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জকে আমি এদেশের আলেম-ওলামা, জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামী শক্তির ঐক্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। অস্তিত্বের পথে থ্রেট না থাকলে ঐক্য হয় না এবং ঐক্য না থাকলে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যায় না। আবার এদেশের আদর্শিক বিভ্রান্তিও অব্যাহত থাকতে পারে না। ভাষাভিত্তিক কোনও অঞ্চলের নাম বাংলাদেশ নয়।

এটা যদি হতো, তাহলে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের বাঙালি অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত হতো অথবা আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। কিন্তু তা সম্ভবপর নয়। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশী জাতিসত্তা সৃষ্টিও অবাস্তব। বস্তুতঃ বাংলাদেশ হচ্ছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি রাষ্ট্রসত্তা, স্বাভাবকিভাবে যার আদর্শ ইসলাম এবং ইসলাম ছাড়া এই দেশ টিকে থাকতে পারে না। আজকে যারা দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধিতা করেন, এক সময় তারাই মুসলিম লীগের লাহোর প্রস্তাবের একাধিক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের কথা বলতনে। একাধিক মুসলিম রাষ্ট্র গঠন না করে আমাদের পূর্বপুরুষরা একটি রাষ্ট্র গঠন করেছিলেন এবং ২৫ বছর তার অংশ হিসেবে আমরা আমাদের অধিকার পায়নি বলেই আমরা আরকেটি রাষ্ট্র গঠন করেছি, ভারতে ফিরে যাইনি। কাজেই ইসলামী আদর্শকে এই রাষ্ট্রের বুনিয়াদ থেকে বাদ দেয়া যায় না, দিলে রাষ্ট্রের অস্তিত্বই থাকে না। এই কথাগুলো এই স্তম্ভে আমি আগেও একাধিকবার বলেছি এবং এখনো বলছি।

আরেকটা কথা বলা দরকার। যে কোন দেশের মুক্তি আন্দোলনে যৌবনের ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যুবকদের ভূমিকা ছিল মুখ্য। চীন, রাশিয়ার কমিউনস্টি আন্দোলন, ভারতের খিলাফত আন্দোলন, মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলন, গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন, আইরিশ মুক্তি আন্দোলন সর্বত্রই সামনের কাতারে ভূমিকা রেখেছে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ-তরুণীরা। মার্কিন বিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব, ইতালির মুক্তি আন্দোলনসহ দুনিয়ার সকল আন্দোলন বিপ্লবে সেনাবাহিনীতে যুবক তরুণদের ভিড়ই ছিল সবচেয়ে বেশি। তারুণ্যের শক্তিই একটি দেশে ও তার আদর্শকে টিকিয়ে রাখতে পারে। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম হতে পারে না।

একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের জাতীয় জীবনে বৃদ্ধরা গতায়ু, শিশুরা অনাগত, যুবক-তরুণরাই বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ। জাতির নেতৃত্ব তাদের হাতেই। এই দশেকে গড়ে তুলতে হলে তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। যে দেশের মানুষ ফজরের আযানের ধ্বনিতে ঘুম থেকে জেগে উঠে এবং এশার নামায পড়ে ঘুমুতে যায় সে দেশে তাদের দায়িত্ব জেগে উঠা মানুষগুলোকে কাজে লাগিয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা অর্জনে জাতিকে সাহায্য করা। এজন্য আধুনকি জ্ঞান-বজ্ঞিান এবং কোরআন সুন্নাহর শিক্ষায় সজ্জিত হওয়া তাদের জন্য অপরিহার্য। এই যুব সমাজ জাতি গঠনের পাশাপাশি শুধুমাত্র ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজই করবে না। তারা ইসলামবিরোধী সকল তৎপরতার বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধও গড়ে তুলবে। আর যেহেতু ইসলাম বাংলাদেশের স্বাধীনতার গ্যারান্টি সেহেতু স্বাধীনতা রক্ষার স্বার্থেই ইসলামকে লালন করতে হবে। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে কোন ইসলামী দল, ইসলামী নতেৃত্ব, পীর-দরবেশ, ওলামা-মাশায়েখের উপর কোনও আঘাত আসলে যুব সমাজকেই তার উপযুক্ত জবাব দিতে হবে। এটা করতে না পারলে আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক কোনও অস্তিত্বই টিকে থাকতে পারবে না। সময় থাকতেই এ ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সাবধান হতে হবে।

কিন্তু আমরা এখন যা দেখেছি তা আমাদের হতবাক করছে। ভারত সরকার যে দলটিকে বন্ধু এবং আপন করে নিয়ে ‘বস্তাভর্তি’ টাকা, বুদ্ধি-পরামর্শ এবং কূটনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা’ দিয়ে ক্ষমতায় এনেছে সে দলটি গণবিচ্ছিন্ন দলে পরণিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ও দলীয় সন্ত্রাস, হত্যা, গুম, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ, দখল বাণিজ্য, প্রতিপক্ষের উপর হামলা, মামলা ও রিমান্ড-নির্যাতন-এর প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। তাদের অত্যাচার-নির্যাতন এবং আলেম-ওলামা ও ধর্ম বিরোধিতা এতই সীমা ছাড়িয়ে গেছে যে, ইসলামভিত্তিক কোন কর্মকাণ্ড এবং ইসলামী রাজনৈতিকক দলগুলোকে তারা চক্ষুশূল মনে করতে শুরু করেছে। তাদের যে কোন কর্মকাণ্ডকে তারা দেশে-বিদেশে জঙ্গিবাদ হিসেবে প্রচার করছে। তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি, মছিলি-মিটিং এমনকি ঘরোয়া কর্মসূচি পালনেও শুধু বাধা দিচ্ছে না বরং পুলিশ ও দলীয় সন্ত্রাসীদের দিয়ে কঠোরতা এবং সশস্ত্রভাবে তা প্রতিহত করছে। পুলিশের সামনে এবং তাদের ছত্রছায়ায় ধর্মীয় সমাবেশ এবং ধর্মীয় দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচির উপর ক্ষমতাসীন দল ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্য দিবালোকে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা করছে। তাদের এ হামলা এবং পাইকারীহারে আগ্নেয়াস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে না। কিন্তু যখনই তাদের প্রতিপক্ষ ধৈর্যচ্যুত হয়ে তা প্রতিহত করতে বাধ্য হচ্ছে তখনই তাদের উপর জঙ্গিবাদের অপবাদ চাপানো হচ্ছে। তাদের মতে এখন ইসলাম এবং জঙ্গিবাদের মধ্যে কোন তফাত নেই।

তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে দুঃখজনক যে বিষয়টি তা হচ্ছে সব বিষয়ে ভারতের সম্পৃক্তির তথ্য বা অভিযোগ। এদেশের বরেণ্য আলেম-ওলামা এবং ইসলামী চিন্তাবিদদের তথাকথিত মানবতাবিরোধী ৪০ বছর আগের বানোয়াট অপরাধের বিচারের যে নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে হিলারিকে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী ভারতীয় নির্দেশনায় তা করা হচ্ছে। আমরা এখন পুলিশ প্রহরায় জুমার নামায আদায় করি। এর সব দোষ দুঃখজনকভাবে ভারতের উপরই চাপছে। এর অবসান হওয়া দরকার। আমার দৃষ্টিতে ভারতের জনগণকে বাংলাদেশের মানুষ বরাবর বন্ধু বলেই মনে করে আসছে। কিন্তু ভারত সরকারের তরফ থেকে এই বন্ধুত্বের মর্যাদা শুরু থেকেই তাদের দেয়া হয়নি। ফলে তাদের মধ্যে একটি বিশ্বাস শুরু থেকইে দানা বেঁধে রয়েছে। এ ব্যাপারে স্বাভাবিকভাবেই মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির বিষয়টি এসে যায়। এই চুক্তি অনুযায়ী ভারত বাংলাদেশ থেকে তাদের পাওনা কড়ায়গন্ডায় আদায় করে নিয়েছে কিন্তু বাংলাদেশকে তার পাওনা দেয়নি। ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনী সীমান্ত এলাকায় পাখির মতো গুলি করে বাংলাদেশীদের হত্যা করছে। এর কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সরকার এর প্রতিবাদ করতেও না পারায় দেশের মানুষের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং ভারত উভয়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে। উভয় দেশের মধ্যে সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমানা নির্ধারণের কাজ গত চার দশকেও সম্পন্ন হয়নি। একইভাবে ছিটমহলগুলোর সমস্যাও ভারত ঝুলিয়ে রেখেছে। ফারাক্কা, টিপাইমুখ, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রসহ অভিন্ন আন্তজার্তিক নদীসমূহরে উপর বাঁধ নির্মাণ ও পানি প্রবাহ বন্ধকরণ এবং ভারত র্কতৃক আন্তঃনদী সংযোগের মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশের মানুষের ভবষ্যিৎ জীবিকা ও জীব-বৈচিত্র্যের বেলায় যে হুমকির সৃষ্টি হয়েছে তাতে আমরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না। এই সমস্যাগুলোকে জিইয়ে রেখে তারা ট্রানজিট, করিডোর ও বন্দর সুবিধা চাচ্ছে যা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে। এসব ব্যাপারে কথা বলাটা ভারত বিরোধিতা নয়। এটা হচ্ছে অস্তিত্ব রক্ষার উদ্বেগ, এই উদ্বেগ জাতিসত্তার উদ্বেগ, আমাদরে জাতিসত্তা ও ভারতের জাতিসত্তা এক না হওয়ায় কারোর গাত্রদাহ সৃষ্টি কিংবা তাকে এক করার প্রচেষ্টাও সর্মথনযোগ্য হতে পারে বলে আমি মনে করি না। আমাদের জাতিসত্তা এবং ভারতীয় জাতীয়তার স্বাতন্ত্র্যকে মেনে নিয়েই আমাদের বন্ধুত্বের কথা চিন্তা করা বাঞ্ছনীয়।

বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ উভয় দেশ ও জনগণের স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তেমনে যে সমস্যাগুলো উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে আছে সেগুলো হচ্ছে :

১। ফারাক্কা বাধের মাধ্যমে গঙ্গার পানি নিয়ন্ত্রণ ও হুগলী নদীর মধ্যদয়ের পানির গতিপথ পরিবর্তন করে সমুদ্র থেকে ১৩২ কিমি দূরে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষায় ভারতীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন। এর ফলে বাংলাদেশ তার পানির ন্যায্য হিস্সা পাচ্ছে না। এতে বাংলাদেশ অংশের গঙ্গা/পদ্মা অববাহিকার খাল বিল নদী-নালা শুকিয়ে গেছে, ভুউপরিস্থে পানির সংঙ্কট দেখা দেয়ায় কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে সার্বক্ষিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ভুগর্ভস্ত পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। পরিবেশ ভারসাম্য হারিয়েছে এবং বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ এলাকার মরুকরণ শুরু হয়েছে। ভুগর্ভস্ত পানিতে লবনাক্ততা দেখা দিয়েছে। গঙ্গা ছাড়াও আরও ৫৩টি আন্তর্জাতিক নদীর উপরে বাঁধ দিয়ে তারা পানির গতিপথ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের দিকে পরিবর্তন করে ভাটার দেশ বাংলাদেশকে পানিতে মারার ব্যবস্থা করেছে। তাদের এই তৎপরোটা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

২। ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত পৃথিবীর ৫ম দীর্ঘতম সীমান্ত- ৪০৯৬. ৭ কিমি। ভারত এই সীমান্ত বরাবর নোমান্স ল্যান্ডের ১৫০গজের ভিতর কাঁটা তারের বেরা এবং বেড়ার পাশাপাশি সেনা ও অস্ত্রবাহী গাড়ি চলালচলের উপযোগী সড়কও নির্মাণ করেছে। আবার সীমান্ত চৌকি ও তার মধ্যবর্তী এলাকার সমুহে কিছু দূর পর পর ১৫০০ ওয়াটের বাল্ব জ্বালিয়ে রাতের বেলা ফ্লাড লাইট সৃষ্টির মাধ্যমে সীমান্তে ফসল ও গাছ পালার ফলন ও সংরোক্ষণের বিরাট সংকট সৃষ্টি করেছে। বলা বাহুল্য ফসল উৎপাদনে তাপ ও শংবেদনশীলতা (photo sensitiveness and thermo sensitiveness) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতিরিক্ত আলো ও অতিরিক্ত তাপ ফসল হানি ঘটায়। ভারতীয় ফ্লাড লাইট এর কারণে আমাদের দেশে তাই হচ্ছে।

৩। সীমান্ত হত্যা ও ভারতীয় সীমান্ত রক্ষিদের সহায়তায় বাংলাদেশের অভ্যান্তরে ঢুকে চুরি ডাকাতি ও লুটপাট।

৪। সীমান্তে BSA এর সহযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে মূল্যবান ওষুধ-পত্র, সার, ডিজেল, সোনা, রুপা, নারী ও শিশু, এবং বৈদেশিক মিদ্রা ভারতে পাচার আর ভারত থেকে যুবসমাজকে ধ্বংস করার জন্য মাদক সামগ্রী, আগ্নেয় অস্ত্র প্রবৃত্তি বাংলাদেশে পাচার

৫। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতীয় হস্তক্ষেপ এবং গোয়েন্দা সংস্থার (RAW) কে দিয়েরাজনীতি, গণমাধ্যম, সিভিল ও মিলিটারি প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টা।

ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য উপরোক্ত বাধাগুলো দূর হওয়া আশা এবং পাশাপাশি পাকিস্তান, ইরান ও তুরষ্কসহ মুসলিম দেশ গুলোর সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্টতা আগে বাড়ানো দরকার। (সমাপ্ত)