॥ আলী আহমাদ মাবরুর ॥
রবিউল আউয়াল মাস আমাদের সামনে প্রতি বছরই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে হাজির হয় আর তাহলো মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা. এর জীবন ও আদর্শকে আমরা কতটা নিজেদের ব্যক্তি ও সমাজজীবনে ধারণ করতে পেরেছি? এ মাসে তাঁর জন্ম ও ওফাতের স্মরণে সীরাতুন্নবী (সা.) নিয়ে আলোচনা, সভা-সেমিনার, মাহফিল ও বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। নানাভাবেই তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়। এসব আয়োজন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সীরাতের প্রকৃত শিক্ষা কেবল আলোচনা, আবেগ কিংবা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে এর উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। বরং মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জীবনে ন্যায়, মানবিকতা, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও শান্তির চর্চা প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত সীরাতচর্চার মূল লক্ষ্য।
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি ছিলেন ‘রাহমাতুল্লিল আলামীন’। তাঁর আগমন কোনো নির্দিষ্ট ভূখ-, জাতি বা সময়ের মানুষের জন্য ছিল না; বরং তাঁর রিসালাত ও আদর্শের মধ্যে সমগ্র মানবজাতির জন্যই রয়েছে শান্তি, কল্যাণ ও মুক্তির পথনির্দেশনা। অশান্ত পৃথিবীতে স্থায়ীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন সফলতার জন্য তাঁর প্রদর্শিত আদর্শ অনুসরণের বিকল্প নেই। আজকের পৃথিবীতে এ কথাটি নতুন করে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। কারণ মানবসভ্যতা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা অতীতের কোনো যুগের সঙ্গে তুলনীয় নয়। মানুষের হাতে এমন সব প্রযুক্তি এসেছে, যা পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষকে অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে যুক্ত করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল যোগাযোগ, মহাকাশ গবেষণা, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি মানুষের জীবনযাত্রাকে আমূল বদলে দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সঙ্গে মানুষের নৈতিক ও আত্মিক উৎকর্ষ কি একই গতিতে এগিয়েছে? দুঃখজনকভাবে এর উত্তর খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়।
মানুষ আগের চেয়ে বেশি সংযুক্ত, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে হৃদয়ের দূরত্ব বেড়েছে। যোগাযোগের মাধ্যম বেড়েছে, কিন্তু পারস্পরিক বোঝাপড়া কমেছে। তথ্যের প্রবাহ বেড়েছে, কিন্তু সত্য ও বিবেকের সংকটও প্রকট হয়েছে। জীবনকে উপভোগ করার সামর্থ্য বেড়েছে, কিন্তু মানসিক শান্তি ও তৃপ্তি কমেছে। প্রযুক্তি মানুষকে পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে, অথচ মানুষ ক্রমাগতভাবে নিজের পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজ থেকেই বিছিন্ন হয়ে পড়ছে। এমনকি প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যস্ত জীবনে মহানবী (সা.)-এর স্মরণ ও তাঁর আদর্শচর্চাও অনেক ক্ষেত্রে গভীরতা হারাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর নাম, বাণী ও জীবনের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে অসংখ্য পোস্ট, ভিডিও ও আলোচনা দেখা যায়। কিন্তু ডিজিটাল উপস্থিতি আর প্রকৃত সীরাতচর্চা এক বিষয় নয়। আমরা হয়তো রাসূল (সা.) এর কোনো উক্তি শেয়ার করছি, কিন্তু তাঁর প্রদর্শিত সত্যবাদিতা কি আমাদের কথাবার্তায় এসেছে? তাঁর আমানতদারিতা কি আমাদের লেনদেনে প্রতিফলিত হচ্ছে? তাঁর ন্যায়বিচার কি আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক আচরণে স্থান পেয়েছে? তাঁর দয়া, ক্ষমাশীলতা ও সহমর্মিতা কি আমাদের চরিত্রের অংশ হয়েছে?
এখানেই স্মরণ আর অনুসরণের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটি সামনে আসে। মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা একজন মুসলমানের ঈমানি জীবনের গভীরতম অনুভূতিগুলোর একটি। তাঁকে ভালোবাসা, সম্মান করা এবং তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পেশ করা মুসলমানের হৃদয়ের স্বাভাবিক দাবি। কিন্তু আমাদের সময়ের একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো, নানা ধরনের ফিরকাহ, মতপার্থক্য, দলীয় বিভাজন, রাজনৈতিক পরিচয় ও পারস্পরিক সন্দেহের কারণে অনেক সময় মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার স্বাভাবিক প্রকাশ নিয়েও সংশয় তৈরি হয়। কেউ নবীপ্রেমের কথা বললে তাকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কেউ সীরাত নিয়ে আলোচনা করলে তার সাংগঠনিক পরিচয় খোঁজা হয়। কেউ কোনোভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করলে সেটি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ফলে যে নবীপ্রেম মুসলিম উম্মাহর হৃদয়কে একত্রিত করার শক্তি হওয়ার কথা, কখনো কখনো তাই যেন বিভাজনের নতুন উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।
এখানে আমাদের ভারসাম্য করার প্রয়োজন ছিল। আকিদা, ফিকহ ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে মুসলিম সমাজে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর মর্যাদা, তাঁর চরিত্র ও তাঁর আদর্শ অনুসরণের জায়গাটি বিভাজনের ঊর্ধ্বে একটি বৃহত্তর ঐক্যের ক্ষেত্র হতে পারে। নবীপ্রেমকে কোনো সংকীর্ণ দলীয় পরিচয়ের মধ্যে বন্দী না করে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে পরিশুদ্ধ, জ্ঞানভিত্তিক ও দায়িত্বশীল চর্চায় পরিণত করা প্রয়োজন। মহানবী (সা.) তো মানুষকে বিভক্ত করার জন্য আসেন নি। বরং তিনি গোত্রীয় অহংকার, বর্ণভেদ, শ্রেণিবৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষকে আল্লাহর বান্দা হিসেবে একত্রিত করেছেন। বিদায় হজে¦র ভাষণে তিনি মানুষের মধ্যে বংশ, বর্ণ ও জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে তাকওয়া ও নৈতিকতাকে মর্যাদার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। অতএব নবীপ্রেম বিভাজনের কারণ নয়, বরং ঐক্যের শক্তি হওয়া উচিত।
এর চেয়েও কঠিন একটি প্রশ্ন আমাদের নিজেদের সামনে রাখতে হবে: যারা মহানবী (সা.)-কে ভালোবাসেন, তাঁর নাম শুনলে আবেগাপ্লুত হন, তাঁর জীবনের আলোচনা করেন, তাঁর প্রশংসায় নাত ও কবিতা পাঠ করেন, তাঁকে অনুসরণের দাবি করেন, তাঁদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাঁর আদর্শের প্রতিফলন কেন সবসময় দেখা যায় না? এই আত্মজিজ্ঞাসা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো অনুসরণ। মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগে সীমাবদ্ধ থাকলে তা পূর্ণতা পায় না; তাঁর চরিত্র, নীতি ও আদর্শকে জীবনের বাস্তব সিদ্ধান্তে প্রয়োগ করতে হয়। আমরা তাঁর সত্যবাদিতার কথা বলি, কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যে মিথ্যা বলি। তাঁর কর্মনিষ্ঠার কথা বলি, কিন্তু দায়িত্ব পালনে অবহেলা করি। তাঁর ন্যায়বিচারের কথা বলি, কিন্তু নিজের দল, পরিবার বা গোষ্ঠীর অন্যায়কে প্রশ্রয় দিই। স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণকে নিয়মিত অভ্যাসেই পরিণত করে ফেলেছি। আমরা তাঁর ক্ষমাশীলতার কথা বলি, অথচ সামান্য মতভিন্নতায় সম্পর্ক ছিন্ন করি। তাঁর প্রতিবেশীর অধিকারের কথা বলি, কিন্তু প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব ভুলে যাই। তাঁর দরিদ্রপ্রেমের কথা বলি, কিন্তু অসহায় মানুষের কষ্টে উদাসীন থাকি। এখানেই আমাদের সীরাতচর্চার বড় ঘাটতি।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল পবিত্র কুরআনের শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন। তিনি ছিলেন মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক। তিনি কেবল মসজিদের ভেতরেই আদর্শ নন; তিনি পরিবারে আদর্শ, সামাজিক জীবনে আদর্শ, অর্থনৈতিক কর্মকা-ে আদর্শ, রাজনৈতিক নেতৃত্বে আদর্শ, বিচারব্যবস্থায় আদর্শ, যুদ্ধ ও শান্তির নীতিতেও আদর্শ। জীবনের এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নেই যেখানে তাঁর সুন্নাহ থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ নেই। তাই নবীপ্রেম যদি জীবনের একটি নির্দিষ্ট অংশে সীমাবদ্ধ থাকে এবং অন্য অংশগুলোতে তাঁর আদর্শের কোনো প্রভাব না থাকে, তাহলে সেই ভালোবাসাকে আরও গভীর ও অর্থবহ করার প্রয়োজন রয়েছে।
সীরাতচর্চার আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো এর মৌসুমীকরণ। রবিউল আউয়াল এলে আলোচনা বাড়ে, মাহফিল হয়, সেমিনার হয়, নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়। কিন্তু মাসটি শেষ হলে সীরাতের আলোচনা ও চর্চাও অনেক ক্ষেত্রে কমে যায়। অথচ মহানবী (সা.)-এর জীবন কোনো নির্দিষ্ট মাসের জন্য নয়। তাঁর আদর্শ মুসলমানের প্রতিদিনের জীবনযাপনের জন্য। তাই সীরাতচর্চাকে বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতার বাইরে নিয়ে যেতে হবে। পরিবারে নিয়মিত সীরাত পাঠের ব্যবস্থা হতে পারে। মসজিদ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাঁর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক শিক্ষার ওপর ধারাবাহিক আলোচনা হতে পারে। ডিজিটাল মাধ্যমেও গবেষণাভিত্তিক, নির্ভরযোগ্য ও প্রাসঙ্গিক সীরাতকেন্দ্রিক কনটেন্ট তৈরি করা প্রয়োজন।
মহানবী (সা.)-এর জীবনের অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলো ন্যায়বিচার। তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আত্মীয়তা, গোত্র বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে ন্যায়বিচারের মানদ- পরিবর্তন করেন নি। তাঁর সমাজে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের ভিত্তি ছিল নৈতিকতা ও তাকওয়া, বংশ বা সম্পদ নয়। আজকের সমাজে যখন ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারকে প্রভাবিত করে, তখন তাঁর এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্ত হলো ন্যায়বিচার ও আইনের সমান প্রয়োগ। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে কোনো সমাজে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। মহানবী (সা.)-এর জীবন মানবিক মর্যাদার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এতিম, দরিদ্র, মিসকিন, শ্রমজীবী, নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও সমাজের দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষায় তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বুঝিয়েছেন, সমাজের শক্তিশালী মানুষের উন্নতি দিয়ে একটি সমাজের প্রকৃত অগ্রগতি পরিমাপ করা যায় না; বরং সে সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করছে, সেটিই তার মানবিকতার প্রকৃত পরীক্ষা। আজকের পৃথিবীতে যখন অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে, কোটি কোটি মানুষ খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, তখন এই শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মানবিক উন্নয়ন ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন পূর্ণাঙ্গ নয়।
পারিবারিক জীবনেও মহানবী (সা.) ছিলেন অনুকরণীয় আদর্শ। তিনি পরিবারকে ভালোবাসা, দায়িত্ব, কোমলতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে পরিচালনা করেছেন। স্ত্রীদের সঙ্গে তাঁর আচরণ, সন্তানদের প্রতি তাঁর মমতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং প্রতিবেশীর অধিকারের বিষয়ে তাঁর শিক্ষা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সীরাতচর্চার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে তরুণ প্রজন্ম। কারণ আগামী দিনের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও নেতৃত্ব তাদের হাতেই যাবে। তাদের কাছে মহানবী (সা.)-কে শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করলে চলবে না। তাদের জানতে হবে, তিনি কীভাবে একটি নৈতিক বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। কীভাবে তিনি মানুষের চরিত্র পরিবর্তন করেছিলেন। কীভাবে বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায়ের মানুষকে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজে একত্রিত করেছিলেন। কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও আশাবাদী ছিলেন। কীভাবে শত্রুর প্রতিও ন্যায়বিচার করেছেন। কীভাবে ক্ষমতা পেয়েও বিনয়ী থেকেছেন। তরুণদের কাছে সীরাতকে প্রশ্ন, যুক্তি, গবেষণা ও সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করতে হবে। তাহলে তারা বুঝতে পারবে, সীরাত অতীতের গল্প নয়; এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও একটি নৈতিক দিকনির্দেশনা। এরই অংশ হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর জীবন, নেতৃত্ব ও নৈতিকতা নিয়ে পাঠচর্চা হতে পারে। তরুণদের জন্য গবেষণা, পাঠচক্র, আলোচনা ও বিতর্কের আয়োজন হতে পারে।
নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও মহানবী (সা.)-এর সীরাত গভীর শিক্ষায় সমৃদ্ধ। তাঁর কাছে নেতৃত্ব ছিল আমানত, ভোগের বস্তু নয়। তিনি পরামর্শকে গুরুত্ব দিয়েছেন, মানুষের অধিকার রক্ষা করেছেন এবং বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মানুষের সঙ্গে দায়িত্ব ও অধিকারভিত্তিক সম্পর্ক স্থাপনের দৃষ্টান্ত রেখেছেন। মদিনার সমাজব্যবস্থায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণের যে প্রচেষ্টা দেখা যায়, তা বহুত্ববাদী সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। আজকের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যখন প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করার প্রবণতা বাড়ছে, মতভিন্নতা সহজেই বিদ্বেষে রূপ নিচ্ছে এবং ক্ষমতা অনেক সময় জনকল্যাণের পরিবর্তে দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন মহানবী (সা.)-এর নেতৃত্বের নৈতিকতা নতুন করে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন।
আজ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ চলছে। নিরপরাধ মানুষ নিহত হচ্ছে, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। জাতিগত, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভাজন মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়াচ্ছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, শরণার্থী সংকট, ক্ষুধা ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগ নতুন নতুন মানবিক সংকট তৈরি করছে। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন হলো, শুধু অস্ত্রের ভারসাম্য, কূটনৈতিক চুক্তি কিংবা আন্তর্জাতিক সম্মেলন কি পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে? এসব প্রয়োজনীয় হলেও যথেষ্ট নয়। কারণ যুদ্ধের পেছনে মানুষের লোভ, ক্ষমতার আকাক্সক্ষা, অন্যায়, প্রতিহিংসা ও আধিপত্যের মানসিকতা কাজ করে। তাই শান্তির জন্য শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, মানুষের নৈতিক পরিবর্তনও প্রয়োজন। এখানেই মহানবী (সা.)-এর আদর্শের অনিবার্যতা। আজকের বিশ্বে আমাদের এমন নেতৃত্ব দরকার, যে নেতৃত্ব ক্ষমতাকে সেবা হিসেবে দেখবে, বিরোধীকে শত্রু নয় মানুষ হিসেবে দেখবে, দুর্বলকে বোঝা নয় দায়িত্ব হিসেবে দেখবে এবং রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত সম্পদ নয় আমানত হিসেবে বিবেচনা করবে। আর এক্ষেত্রে রাসূল সা. হলেন একমাত্র অনুকরণীয় আদর্শ।